Image description

চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মীয়মাণ ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি এবং আরও দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক  কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে এক আসামিকে যাবজ্জীবন ও আরেক আসামিকে ২০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ গতকাল এ রায় দেন। এই ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান। এই তিন আসামিই পলাতক। রায়ে রামপুরা থানার সাবেক এসআই পলাতক তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছর জেল দেওয়া হয়েছে। রায়ের সময় তাকে হাজির করা হয়েছিল।

চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি পঞ্চম রায়। এর আগে চানখাঁরপুলের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

গতকাল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রায়ের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, শহীদ ও আহতদের পরিবার ন্যায়বিচার পেলেন। অন্যদিকে রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

 

মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়। প্রথম অভিযোগ হলো, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর রামপুরার বনশ্রী এলাকায় মো. নাদিম হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা। দ্বিতীয়টি, একই দিন বনশ্রী এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলি করে গুরুতর আহত করা। এবং তৃতীয় অভিযোগটি হলো, সেদিন (২০২৪ সালের ১৯ জুলাই) বিকালে বনশ্রী এলাকায় সাত বছর বয়সি বাসিত খান মুসার মাথা ভেদ করে গুলি। সেই গুলিতেই দাদি মায়া ইসলামকে হত্যা করা হয়।

গত বছরের ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। প্রতিবেদন যাচাইবাছাই করে গত ৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয় ২৩ অক্টোবর। আর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয় চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি।

এ মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ হয় গত ৩ ফেব্রুয়ারি। তার পর থেকে মামলাটি রায়ের অপেক্ষায় ছিল। এ মামলার রায় গত ৪ মার্চ ঘোষণার জন্য তারিখ ধার্য করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। তবে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন রায় ঘোষণা করা হয়নি। পরে ১৫ জুন এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য নতুন দিন (আজ) ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। সে অনুযায়ী গতকাল রায় ঘোষণা করা হলো।

সন্তোষ প্রকাশ চিফ প্রসিকিউটরের : রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, একটি বেতার বার্তার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঠেকানোর জন্য ছাত্র-জনতার পায়ে গুলি করতে অধীনদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান। তার মৌখিক নির্দেশনা এমন থাকলেও বাস্তবে বুকে ও মাথায় গুলি করা হয়েছে। অর্থাৎ ১৯ জুলাই রামপুরায় গুলি চালিয়ে এভাবে হত্যাকাণ্ড চালান মামলার আসামিরা। তিনি বলেন, এটি একটি যথার্থ রায় হয়েছে। আমরা এ রায়ে আপাতত সন্তোষ প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। এ রায়ের মধ্য দিয়ে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।

আসামিপক্ষের অসন্তোষ : রামপুরার মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় ২০ বছর কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারের আইনজীবী সারওয়ার হাজান নিপ্পন রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আপিলে যাওয়ার ঘোষণা দেন। রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, চঞ্চল চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে একটি এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কনফেশন এসেছে। আমরা বারবার ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করেছি, বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হোক। কিন্তু তা করা হয়নি। অতএব, আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। এ কারণেই উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে যাব।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী আরশাদুল হক বাবুসহ অন্য আইনজীবী। এ মামলায় পলাতক আসামিপদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন।