Image description
জামালপুর ও ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী পদায়ন

দুর্নীতির অভিযোগে একজন মামলার আসামি, অন্যজনের বিরুদ্ধে কয়েকশ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ। অথচ জবাবদিহির আওতায় আনার বদলে তাদেরই পুরস্কৃত করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এই দুই বিতর্কিত কর্মকর্তার কাঁধে দেওয়া হয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ জেলার উন্নয়নের দায়িত্ব। তাদের ময়মনসিংহ ও জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে পদায়নের ঘটনায় প্রশাসনের ভেতর-বাইরে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এমন সিদ্ধান্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

সম্প্রতি এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে মো. ছাবের আলীকে ময়মনসিংহ এবং মো. রফিকুল ইসলামকে জামালপুর জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে পদায়ন করা হয়। এর মধ্যে ছাবের আলী এলজিইডির সদর দপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) এবং রফিকুল ইসলাম ময়মনসিংহের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলীর (চলতি দায়িত্ব) পদে ছিলেন।

সূত্র জানায়, মো. ছাবের আলী দীর্ঘদিন ঢাকা জেলা এলজিইডিতে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৪ জুন তাকে ময়মনসিংহ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসাবে পদায়ন করা হয়। তার স্থলে ময়মনসিংহের দায়িত্বে থাকা সালমান রহমান রাসেলকে সদর দপ্তরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়ার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসাবে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন ছাবের আলী। ২০২৫ সালের অক্টোবরে গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা দুদকের মামলায় বাচ্চু মিয়া, ছাবের আলী ও উপসহকারী প্রকৌশলী শামস জাভেদকে আসামি করা হয়।

অন্যদিকে জামালপুর জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে পদায়ন পাওয়া মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধেও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি প্রায় এক যুগ এলজিইডি সদর দপ্তরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত আরটিআইপি প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় প্রকল্প পরিচালক মোস্তফা কামালের সঙ্গে যোগসাজশে কয়েকশ কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মোস্তফা কামাল আমেরিকায় পাড়ি জমান। তাদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে রফিকুল ইসলামের অবসরে যাওয়ার কথা। মাত্র ৭ মাস আগে তাকে একটি জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে জনমনে নেতিবাচক বার্তা যায়। এতে সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবির) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ বা তদন্ত চলমান থাকলেই তাকে অপরাধী বলা যাবে না। অভিযোগ আদালতে বা যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দুর্নীতিবাজ বা অপরাধী হিসাবে আখ্যায়িত করা সমীচীন নয়। তবে সরকারি বিধি ও প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী, যাদের বিরুদ্ধে আমলযোগ্য দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এবং যাদের বিষয়ে তদন্ত চলছে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পদায়ন না করে বরখাস্ত করার কথা। কিন্তু সেটি অনুসরণ না করে এমন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হলে তা সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব না দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। তিনি বলেন, এ ধরনের পদায়নের মাধ্যমে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ে। জনগণের কাছে এমন বার্তা যায় যে, দুর্নীতির অভিযোগকে গুরুত্ব না দিয়ে, বরং অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরই পুরস্কৃত করা হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই এ ধরনের পদায়ন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এ বিষয়ে জানতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, দুদকে তাদের বিরুদ্ধে মামলা বা অনুসন্ধান চলমান রয়েছে, এমন কোনো তথ্য বা চিঠি আমরা পাইনি। মন্ত্রণালয়ের পরামর্শেই তাদের পদায়ন করা হয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগের যাচাই-বাছাই হতে পারে, কিন্তু আমাদের কাছে কোনো মামলার তথ্য না থাকায় তাদের পদায়নে বাধা ছিল না।

তিনি বলেন, যদি পরে কোনো মামলা বা অনুসন্ধানের বিষয়ে আমাদের জানানো হয়, তাহলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে তাদের প্রত্যাহার করা হবে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্তের মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।

রফিকুল ইসলামের অবসরের মাত্র ৭ মাস আগে গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অবসরের আগে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর জন্যই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব শহিদুল হাসানের কাছে এমন দুই ব্যক্তির পদায়নের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না।