Image description

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া হয়ে চীন সফর ভূরাজনৈতিক, কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর এই প্রথম বিদেশ সফরকে সফল হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সফরে দুদেশের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বাংলাদেশের পরীক্ষিত উন্নয়ন সহযোগী চীন দুদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সামরিক লেনদেন বৃদ্ধি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। দুদেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় সব ধরনের সমীক্ষা ও সহযোগিতা, কুনমিং থেকে বাংলাদেশের বন্দর পর্যায় পর্যন্ত পরিবহণ সংযোগ এবং চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের সম্ভাবনা যাচাইয়ের মতো নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে একমত হয়েছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে বিএনপি ঘোষিত ‘ফার্স্ট বাংলাদেশ’ নীতির বড় সাফল্য হিসাবে দেখা হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এতদিন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’ পর্যায়ে ছিল। এবার সেটিকে উন্নীত করে ‘চায়না-বাংলাদেশ কমিউনিটি উইথ শেয়ার্ড ফিউচার’-এ নেওয়া হয়েছে, যা চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সর্বোচ্চ ধাপ।

শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের অর্জন তুলে ধরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং বাংলাদেশ বিনিয়োাগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘ সময় একান্তে আলোচনা করেন। এমনকি অন্য একটি দেশের সরকারপ্রধান অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায়ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলোচনা চালিয়ে যান।

তিনি আরও বলেন, এখন থেকে দুদেশের মধ্যে নিয়মিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তাবিষয়ক সমন্বিত আলোচনার জন্য ‘টু প্লাস টু ডায়ালগ মেকানিজম’ চালুর বিষয়টিও দুদেশ বিবেচনা করবে।

তিনি বলেন, চীন ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি এবং সাড়ে তিন ট্রিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। এমন একটি দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশের প্রতি যে গুরুত্ব দেখিয়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন-চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়পক্ষকে দ্রুত সমস্যার সমাধানে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি। এ সংকট নিরসনে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সঙ্গে তেল ও গ্যাস অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি আলোচনা হয়েছে চীন থেকে ডিজেল ও এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়েও।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের বিষয়ে উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন যুগান্তরকে বলেন, চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং বর্তমানে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার জন্য অদম্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, সামনের দিনগুলোতে চীন অবশ্যই বাংলাদেশের পাশে থাকবে, বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে। বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করার জন্য দুদেশ ঐকমত্য পোষণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে বাংলাদেশ-চীন বহুমাত্রিক সম্পর্কে পরিণত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বে। সেজন্যই চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চীন সব সময় বেইজিং-ঢাকা সম্পর্কের উন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ নীতিতে অটল রয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি চীনের সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানান চীনের প্রেসিডেন্ট।

অর্থনৈতিক করিডর বিষয়ে চীনের প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, অবশ্যই আমরা চাই ব্যবসা ও বাণিজ্যের প্রসার হোক; তাহলে বাংলাদেশে শিল্পায়ন হবে। নতুন ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হবে, ট্রেড ভলিউম বাড়বে। এ নিয়ে এখনো একটা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হয়নি। পরে প্ল্যানিং স্টেজে যাবে এবং ফিজিবিলিটি অ্যানালাইসিস করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ ও বিস্তৃত সহযোগিতামূলক সম্পর্ক এই সফরের মাধ্যমে আরও জোরদার ও সম্প্রসারিত হবে। পাশাপাশি সম্পর্কে নতুন গতি দেওয়ারও সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটি দুদেশের জন্যই নতুন সম্ভাবনা ও ইতিবাচক বার্তা বয়ে এনেছে।

ভারত-চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য প্রসঙ্গে যুগান্তরকে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সবার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। কোনো দেশের সঙ্গে সহযোগিতা করার আগে অন্য কারও অনুমতির প্রয়োজন নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব কমে যাবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান চীনের আগ্রহের কথা সামনে নিয়ে এসে যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরটি অনেকটাই চীনের আগ্রহ ও উদ্যোগে সম্পন্ন হয়েছে। সফরটি দুদেশের সম্পর্ককে আরও সংহত ও সম্ভাবনাময় করার সুযোগ তৈরি করলেও বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিতও এতে স্পষ্ট হয়েছে।

তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের তিনজন ভিন্ন সরকার প্রধানের চীন সফর এবং ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের যৌথ ঘোষণাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের অবস্থান ধীরে ধীরে চীনের নীতির প্রতি আরও অনুকূল হয়েছে। তার মতে, এর পেছনে সরকার পরিবর্তনের কারণে পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার সুযোগ চীন নিয়েছে।

মাহফুজুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক যৌথ ঘোষণাগুলোতে অর্থনৈতিক সহযোগিতার তুলনায় রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আগের ঘোষণাগুলোতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রধান আলোচ্য বিষয় থাকলেও এবার প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা; অর্থাৎ ‘টু প্লাস টু’ (২+২) সংলাপের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি দুদেশের সম্পর্কের নতুন মাত্রার ইঙ্গিত বহন করে।

কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রি. জে. মো. বায়েজিদ সরোয়ারের (অব.) মতে, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত হবে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, বিশ্ব পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন-চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক থেকে চীন সরে আসবে না। চীন বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রচেষ্টাকে সমর্থন এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের পক্ষে রয়েছে। তিনি বলেন, এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয়ে চীনের গুরুত্ব প্রকাশিত হয়েছে। এটি বাংলাদেশকে শক্তি জোগাবে।