ঘুষ, দুর্নীতি ও কর ফাঁকি ঠেকাতে নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে আনা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় দুটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রথমত, গ্রাহকের একটি ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিক্রেতাকে ব্যাংক বা এমএফএসের মাধ্যমে বাংলা কিউআর এজেন্ট হতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, মুদি দোকান, সবজি বাজার থেকে শুরু করে বড় শপিং মল পর্যন্ত এই সেবা চালু করা গেলে ধীরে ধীরে ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
জানা যায়, নগদ টাকার লেনদেন বন্ধ হলে সরকারের অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। কারণ লেনদেনের জন্য কাগুজে নোট ছাপতেই সরকারের ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। যখন সব লেনদেন ক্যাশলেস হয়ে যাবে, তখন কাগুজে নোটের আর প্রয়োজন হবে না। এদিক থেকে সব লেনদেন ক্যাশলেস করার এ উদ্যোগ দেশের জন্য ইতিবাচক বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে বড় সংকট হলো দেশে এখনো ৮০ শতাংশ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই।
এদিকে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো, নগদের ব্যবহার কমানো এবং প্রান্তিক পর্যায়ে আধুনিক পেমেন্ট সুবিধা পৌঁছে দিতে দেশজুড়ে বাংলা কিউআর কার্যক্রম সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটির প্রথম বৈঠক গত সোমবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে গভর্নর বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এবং নগদের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সেবাকে জনপ্রিয় করার আহবান জানান এবং সরকারি বিভিন্ন ফি ও চার্জও বাংলা কিউআরের মাধ্যমে নেওয়ার প্রস্তাব দেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র জানায়, আগামী সপ্তাহে গভর্নর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করবেন এবং ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাংলা কিউআর ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা চালাবেন।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলা কিউআর একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। বর্তমানে বিভিন্ন সেবার জন্য আলাদা এজেন্টের কাছে যেতে হয়, তবে এ ব্যবস্থায় এক এজেন্ট থেকেই সব সেবা পাওয়া যাবে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আসবে এবং এজেন্টদের ব্যবসাও বাড়বে। আবার যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএসের গ্রাহক একই কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকা পরিশোধ করতে পারবে।
তিনি আরো জানান, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ৪২ কোটির বেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ওয়ালেট অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তবে জমা, উত্তোলন ও অর্থ স্থানান্তরের সীমিত সুবিধার কারণে এর বড় একটি অংশ এখনো নিষ্ক্রিয়। বর্তমানে প্রতিটি ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠান আলাদা এজেন্ট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করায় গ্রাহকদের নির্দিষ্ট সেবা পেতে আলাদা এজেন্টের ওপর নির্ভর করতে হয়। নতুন ডব্লিউএলএএন ব্যবস্থায় এই সীমাবদ্ধতা দূর হবে। একটি এজেন্টই সব প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের সেবা দিতে পারবে। ফলে সেবার বিস্তৃতি বাড়বে এবং গ্রাহকের ভোগান্তি কমবে।
তবে নীতিগত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে বাংলা কিউআরের ব্যবহার এখনো সীমিত। রাজধানীর বড় শপিং মলগুলোতে বিকাশ, নগদ বা রকেটের কিউআর কোড থাকলেও বাংলা কিউআর খুব একটা দেখা যায় না। এমনকি আগে যেসব ছোট দোকানে বাংলা কিউআর ছিল, সেখান থেকেও তা হারিয়ে যাচ্ছে। মতিঝিলের এক দোকানি জানান, আগে কিছু গ্রাহক কিউআর ব্যবহার করলেও এখন সেই প্রবণতা কমে গেছে। একইভাবে এক হোটেল মালিক বলেন, কম শিক্ষিত গ্রাহকদের মধ্যে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের আগ্রহ কম।
অন্যদিকে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, তারা বাংলা কিউআর বাস্তবায়নে কাজ করছে। বিকাশের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন করে আর আলাদা কিউআর দেওয়া হচ্ছে না, বরং পুরনোগুলো দ্রুত বাংলা কিউআরে রূপান্তর করা হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে যখন প্রথম এই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছিল, তখন রাজধানীর কিছু কিছু চায়ের দোকানেও বাংলা কিউআরের উপস্থিতি দেখা গিয়েছিল। এখন সেসব দোকানে বাংলা কিউআরের পোস্টার আর নেই। যেমন মাতিঝিলের নূরুন্নবী স্টোরে গত বছরও বাংলা কিউআরের পোস্টার ছিল, কিন্তু এখন আর নেই। জানতে চাইলে নূরুন্নবী জানান, ‘আগে অনেক মানুষ কিউআর দিয়া চায়ের বিল দিত। এখন আর দেয় না। খুবই কম লোক আছে, যারা কিউআরের কথা জিগায়। তা ছাড়া দোকানের সঙ্গে আঠা দিয়া লাগানো পোস্টারটা ছিঁড়া গেছে। নতুন করে আর লাগানো হয়নি। তাই এখন এটা দিয়ে কেউ বিল দেয় না।’
পাশেই রয়েছে ছোট একটি হোটেল, যার কোনো নাম নেই। কিন্তু সেখানে শ্রমিক ও দিনমজুর শ্রেণির মানুষ প্রতিদিন ভাত খায়। সেখানেও বাংলা কিউআর ছিল। এখন তিনি ড্রয়ারের মধ্যে বন্ধ করে রাখেন। হোটেলটির মালিক রঞ্জু মিয়ার দাবি, ‘অল্প শিক্ষিত মানুষেরা এত কিছু বোঝে না। একটা কম্পানি আসছিল। একটা কিউআর বোর্ড বানায়া দিছে। তাই টেবিলের ওপর রাখি। এটাতে আমার দোকোনে বিল খুব কম লোকেই দেয়। যারা এখানে আসে, তাদের তো ব্যাংক অ্যাকাউন্টই নাই।’
এদিকে ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে তারা বাংলা কিউআর প্রচারে জোরেশোরে কাজ করে যাচ্ছে। এদের মধ্যে বিকাশের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, ‘আমরা নতুন করে কোনো এজেন্টকে আর বিকাশের কিউআর দিচ্ছি না। আর পুরনো কিউআরগুলো দ্রুত পরিবর্তনের কাজ করে যাচ্ছি। আমরা আশা করছি, এ মাসের মধ্যেই দেশের সব বিকাশ কিউআর বাংলা কিউআরে রূপান্তর করতে পারব। আমরা চাই দেশে ক্যাশলেস লেনদেন বাড়ুক। প্রথম থেকেই আমরা সে উদ্দেশ্যে কাজ করে আসছি। এখনো আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বিকাশ সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারবে।