Image description
রাউজানে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা যেন সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত হয়েছে। অস্ত্রধারীরা কখনো খুন করছে প্রকাশ্যে গুলি করে, কখনো আবার ছুরিকাঘাত বা পিটিয়ে। একের পর এক খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। এসব ঘটনায় অস্ত্রধারী বা প্রকৃত খুনিরা ধরা পড়ছে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এই উপজেলায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্যের জেরে খুনের শিকার হয়েছেন ১১ জন। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও এই ১১টি হত্যা মামলার মধ্যে কোনোটির তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ। চার্জশিট না দেওয়ায় এসব মামলার বিচার কাজও শুরু হচ্ছে না। তবে পুলিশের দাবি, পলাতক আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়ে দিলে তাকে গ্রেফতার করতে আদালতের অনুমতি বা ওয়ারেন্টের প্রয়োজন হবে। তাই প্রকৃত খুনিকে গ্রেফতারের পরই চার্জশিট দিতে চাইছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

পুলিশ সূত্র জানায়, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্যের জেরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাউজান থানায় ২৪টি হত্যা মামলার মধ্যে একটি হত্যাকাণ্ড ৫ আগস্টের আগে সংঘটিত হয়েছে। পরে থানায় মামলা হয়েছে। বাকি ২৩টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রাজনৈতিক ও স্থানীয় আধিপত্যকে কেন্দ্র করে ১১টি ছাড়া পারিবারিক কলহ নিয়ে ৩টি ও অন্যান্য কারণে ৯টি খুনের ঘটনা ঘটে। এসব মামলায় এ পর্যন্ত ৬৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়া আদালতে আত্মসমর্পণ করেছে ১১ জন। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে ৫ জন। এর মধ্যে ১১ হত্যা মামলায় এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাত মিলে ১৮৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। যার মধ্যে এজাহারনামীয় ১৭ জনসহ ৫৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার রাজনৈতিক নেতারা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী টার্গেট ব্যক্তিদের খুন করা হচ্ছে। এছাড়া খুনের শিকার কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য। বিশেষ করে বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, পাহাড় কাটা, ইট ও মাটির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় বাজার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরেই রাউজানে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে।

সহকারী পুলিশ সুপার (রাউজান সার্কেল) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে অন্তর্কোন্দলের কারণেই রাউজানে খুনের ঘটনা বেশি ঘটছে। এসব মামলার অধিকাংশ আসামি পলাতক থাকায় এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় চার্জশিট দেওয়া যাচ্ছে না।’

রাউজানে বোরকা পরে এসে যুবদল নেতা মো. সেলিমকে গুলি করে পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হলে আলোচনায় উঠে আসে সন্ত্রাসী রায়হানের নাম। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলের বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশে যোগ দিতেন রায়হান। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিএনপির সভায় যোগ দিতে শুরু করেন। সবশেষ মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্যার ঘটনায় রায়হানকে প্রধান আসামি করে থানায় মামলা হয়েছে। সন্ত্রাসী রায়হানের বিরুদ্ধে নগরী, জেলায় খুনসহ নানা অভিযোগে ১৫টির বেশি মামলা রয়েছে। অবস্থান শনাক্ত করতে না পারায় তাকে গ্রেফতার করতে পারছে না পুলিশ।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রাউজান-রাঙ্গুনিয়ায় যারা হত্যাকাণ্ড করছে তারা জঙ্গলের ভেতর শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। তারা শুধু কিলিং মিশনের সময় বাইরে আসছে। এরপর আবার তারা ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। সমতলে তাদের যাতে প্রতিরোধ করা যায়, এজন্য রাউজান-রাঙ্গুনিয়ার কদলপুর অংশের ৫টি পয়েন্টে পুলিশ নিয়মিত থাকে। কিন্তু পাহাড় থেকে নেমে আসার জন্য অন্তত ২৫টি গলি রয়েছে। জনবল সংকটের কারণে সব জায়গায় ডিউটি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘রাউজান-রাঙ্গুনিয়ার ভৌগোলিক সুবিধার অপব্যবহার করছে অপরাধীরা। তারা গহিন পাহাড় থেকে এসে হত্যাকাণ্ডের পরপরই আবার চলে যায়। এটি আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য সামাজিক প্রতিরোধের বিকল্প নেই।’