প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্পের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে নেই। তবে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে ইস্যুটি আলোচনায় আসতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, কৌশলগত কারণে চীনের মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন চাইছে না ভারত। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় তিস্তা প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই বাংলাদেশ এও বলে রেখেছে যে, তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে করবে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কী আলোচনা হয়, তা দেখার অপেক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবাই। ভারতের পাশাপাশি কূটনৈতিক মহল এবং বাংলাদেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এ নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বলা হচ্ছে-সবার নজর এখন তিস্তায়।
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরের প্রথম দিনে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের আন্তর্জাতিক আয়োজনে অংশ নিয়েছেন। চারদিনের এই সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা, দ্বিতীয় মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ, মুক্তবাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, বাংলাদেশ থেকে চীনে উচ্চমানের পণ্য রপ্তানিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হবে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের আগ্রহ অনেকদিনের। যদিও বিষয়টিকে শুরু থেকেই নেতিবাচকভাবে দেখছে ভারত। তিস্তা এলাকা সংবেদনশীল ‘চিকেন নেক’-এর কাছাকাছি হওয়ায় প্রকল্পে চীনের আগ্রহকে ভারত ভবিষ্যতে তাদের নিরাপত্তাজনিত হুমকি হিসাবে দেখতে পারে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো-ভারত থেকে প্রবাহিত তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আজও পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়টি এখন শুধু বাংলাদেশের ন্যায্য পানির চাওয়ার মধ্যে আটকে নেই। কারণ, তিস্তার ওপারে ভারত। তিস্তার উজানের অংশ আবার চীনের নিয়ন্ত্রণে। সেখানেও চীনের একটি প্রকল্প পরিকল্পনা আছে। মনে করা হয়, তিস্তা প্রকল্পে চীনের আগ্রহের বড় কারণ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প। যার মাধ্যমে চীন এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশকে একীভূত করতে চায়। তাই তিস্তা প্রকল্প ঘিরে ভূরাজনৈতিক নানা হিসাবনিকাশের বিষয় রয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, প্রথমত, নদীশাসন নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের অনেকে নিশ্চিত নন তিস্তা অববাহিকায় ঠিক কী ধরনের প্রকল্প করলে তা বাংলাদেশের উপকারে আসবে। তাই এ মহাপরিকল্পনার বিষয়ে আমাদের দিক থেকে আরও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বিদেশি অর্থায়ন হলে তা আসবে ঋণ আকারে। প্রকল্প থেকে যদি সরাসরি কোনো আয় না হয়, তাহলে এই ঋণ আমাদের জন্য বোঝা হতে পারে। বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর চাপ পড়তে পারে। তৃতীয়ত, পরিবেশের ওপর এর প্রভাব কী পড়তে পারে, সেটিও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। কারণ, তিস্তা প্রকল্প মানেই পানির প্রাকৃতিক প্রবাহে কৃত্রিম কিছু করা। চতুর্থত, ভাবতে হবে এটি মেইনটেইন করার মতো ট্যাকনিক্যাল ক্যাপাসিটি আমাদের আছে কি না।
তিনি আরও বলেন, তিস্তা নদীর সঙ্গে ভারত, চীনসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশের নদীপ্রবাহ জড়িত। আমরা কতটুকু পানি পাব, তা নিশ্চিত হওয়া না গেলে প্রকল্প জটিল হয়ে যাবে। তাই ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি হতে হবে। নদীর উজানে চীনের নিয়ন্ত্রণ। তাই ভারতও পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। সবচেয়ে ভালো হয় যদি এ বিষয়ে বহুপাক্ষিকভাবে আলোচনা করা যায়।
তিস্তা প্রকল্প ঘিরে এক দশকে দেশের রাজনীতিতে এসেছে অসংখ্য প্রতিশ্রুতি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চীনের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের আলোচনা শুরু হয়। চীনের প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার চায়না প্রাইভেট লিমিটেড’-এর সঙ্গে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরও হয়। দুই বছর স্টাডি করার পর চীনা কোম্পানি ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকারকে একটি প্রাথমিক ধারণাপত্র দেয়। সেখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ স্টাডি ছিল না। এতে ব্যয় ধরা হয় তৎকালীন ডলারের মূল্যমান অনুসারে বাংলাদেশি টাকায় ৮ হাজার কোটি ২৪০ টাকা। শতকরা ৩ ভাগ সুদের বিপরীতে ওই ঋণের টাকায় উচ্চাভিলাষী এই প্রকল্প নিয়ে সেসময় সরকারের কারিগরি টিম আপত্তি জানায়। শুরু থেকেই চীন অর্থায়নে আগ্রহ দেখালেও পরবর্তী সময়ে ভারতের আপত্তির কারণে উদ্যোগে ভাটা পড়ে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে নিয়ে তিস্তা অববাহিকা পরিদর্শন করেন। পরে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে চীনের রাষ্ট্রদূত জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেইজিং প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে ১৯ জুন তিস্তা ব্রিজসংলগ্ন কাউনিয়া পয়েন্টে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবার তারেক রহমানের নেতৃত্বেই বাস্তবায়ন হবে। ১৯৭৯ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তিস্তায় সর্বপ্রথম ব্যারাজ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিস্তা মহাপরিকল্পনার চিন্তা গ্রহণ করেছিলেন।
মন্ত্রী বলেন, তিস্তা নদীতে ড্রেজিং, পানি সংরক্ষণ এবং নদী ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক নিয়ে বর্তমানে কারিগরি সমীক্ষা চলমান। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ইতোমধ্যে নয় সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা প্রকল্পের বিভিন্ন কারিগরি ও বাস্তবায়নযোগ্য বিষয় পর্যালোচনা করছেন।
এদিকে সম্প্রতি সরকারের দিক থেকে নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে বলেও বক্তব্য এসেছে। তবে চীনের অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ইস্যুটি এখনো আলোচনায় আছে।
চীন-বাংলাদেশ বৈদেশিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ আব্দুর রহিম যুগান্তরকে বলেন, চীন অনেক আগেই তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে বাংলাদেশকে প্রস্তাব দিয়েছিল। তারা তখন অনেক টাকা খরচ করে নাব্যবিষয়ক স্টাডিও করে। এই প্রকল্প নিয়ে তাদের ব্যাপক উৎসাহ ও আগ্রহ আছে। চীন অর্থায়ন করতে চায়। কিন্তু আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটি করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত নানাভাবে বিষয়টি কয়েকবার বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে চীন সফরে আছেন। মনে করি, চীনের সরকার বাংলাদেশকে প্রস্তাব দেবে যে, আমরা এ প্রকল্প তাদের দেওয়ার জন্য রাজি আছি কি না। প্রকল্পের বিষয়ে তারা নিশ্চয়তামূলক কোনো চুক্তির প্রসঙ্গ তুলতে পারে।
আব্দুর রহিম বলেন, চীন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করুক, ভারত সেটা চায় না। চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো নয়। আর তিস্তা এলাকা যেহেতু ‘চিকেন নেক’-এর খুব কাছে, তাই ভারত ভাবতে পারে এখানে চীন কোনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে চায় বা ঘাঁটি করতে চায়। বিষয়টি ভারতের নিরাপত্তা কনসার্নও। অন্যভাবে চিন্তা করলে এ প্রকল্প হলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে, দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হয়ে এগিয়ে যবে। এটি ভারত আন্তরিকভাবে নাও চাইতে পারে।
তবে তিস্তা প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের দাবিও আছে। নদী বিশেষজ্ঞ ও গবেষক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ যুগান্তরকে বলেন, তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভারত বা চীনের কাছে যেতে হবে কেন। যেহেতু বিষয়টি নিয়ে তাদের স্বার্থ আছে, তাই তাদের এত আগ্রহ। তিস্তা প্রকল্পের বাস্তবায়ন হতে হবে আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন আলোচনার পর তিস্তার পানিচুক্তিবিষয়ক একটি খসড়া চূড়ান্ত হয়। এ চুক্তি অনুসারে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানির ৩৭ দশমিক ৫ ভাগ বাংলাদেশের এবং ৪২ দশমিক ৫ ভাগ ভারতের পাওয়ার কথা ছিল। বাকি ২০ ভাগ থাকবে নদীর পরিবেশ রক্ষার জন্য। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তার পানি নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরোধিতার কারণে চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষরিত হয়নি। নরেন্দ্র মোদির সরকার তিস্তার পানিচুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কার্যকর হয়নি। যে কারণে আজও ভারত পানি আটকে রাখায় শুষ্ক মৌসুমে স্রোতঃস্বিনী তিস্তা হয়ে যায় মরুভূমির মতো। আর বর্ষায় ভারত থেকে অতিরিক্ত পানি ছাড়ার কারণে বন্যা ও নদীভাঙনে বিপর্যস্ত হয় তিস্তার দুই কূলের মানুষ।