দেশের ব্যবসাবাণিজ্য সহজীকরণ এবং আমদানি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আমদানি পণ্য চালানের ক্ষেত্রে আমদানিকারকের ঘোষিত এবং প্রকৃত লেনদেন মূল্য গ্রহণ না করে শুল্ক কর্তৃপক্ষের খেয়ালখুশিমতো চালানের মূল্য নির্ধারণ প্রথার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
এখন থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট, বৈশ্বিক জার্নাল ও ডেটাবেসকে ভিত্তি ধরে পণ্যের শুল্কায়ন মূল্য নির্ধারণ করা হবে। এনবিআরের এই ব্যবসায়ীবান্ধব পদক্ষেপের ফলে কাস্টমস পয়েন্টে ব্যবসায়ীদের হয়রানি যেমন কমবে, তেমনই আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত মূল্যে শুল্কায়ন হবে। এর ফলে ভোক্তারাও বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের হাত থেকে রেহাই পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এর ফলে দেশের ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কাস্টমসের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দূরত্ব কমিয়ে একটি আস্থার পরিবেশ তৈরিতে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে আমদানি পণ্যের শুল্কায়নে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কাস্টমস কর্মকর্তাদের মর্জিমতো মূল্য চাপানোর সংস্কৃতির অবসান ঘটবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিবিএ) উপদেষ্টা মোহাম্মদ মফিজ উল্লাহ বাবলু বলেন, ‘এটি এনবিআরের একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় সংস্কার। শুল্ক মূল্যায়নের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল্য নির্ধারণী ডেটাবেস এবং নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক উৎস গ্রহণ করা হলে স্বচ্ছতা বাড়বে, স্বেচ্ছাচারী কার্যকলাপ কমবে ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। এ ধরনের পদক্ষেপ ব?্যবসাবাণিজ্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে সহজ করতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা জোরদার করতে এবং ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয়ের জন্য অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে সাহায্য করবে। এ সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে এ নীতিটি বাংলাদেশে ব্যবসা করার পরিবেশ উন্নত করতে এবং প্রতিযোগিতামূলক ও দক্ষ অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।
সম্প্রতি এনবিআর এ-সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করেছে। এনবিআরের নতুন আদেশ অনুযায়ী, আমদানিকারকের দাখিল করা মূল্যসংক্রান্ত তথ্যাদি যদি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ও নিরপেক্ষ প্রকাশনা, জার্নাল বা ওয়েবসাইটের তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে সেটিকে প্রকৃত লেনদেন মূল্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে। শুল্কায়নের মাপকাঠি হিসেবে যেসব বৈশ্বিক মাধ্যমকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটস, ইনডিপেনডেন্ট কমোডিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেস, লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জ, সাংহাই মেটালস মার্কেট, ব্লুমবার্গ এবং ইন্টারন্যাশনাল সুগার অর্গানাইজেশন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ জার্নালগুলোর মাধ্যমে দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি পণ্যের বৈশ্বিক বাজারমূল্য কাভার করা সম্ভব হবে।
এতদিন বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের দাম একবার বাড়লে সেই বর্ধিত মূল্যকে রেফারেন্স ধরে দীর্ঘদিন শুল্কায়ন করা হতো। পরে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে গেলেও কাস্টমস তাদের রেফারেন্স মূল্য কমাত না। ফলে আমদানিকারকদের বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত শুল্ক ও কর দিতে হতো, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিত এবং বাজারে সাধারণ ভোক্তাকে ভুগতে হতো। কর সংস্কারসংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানিকারকদের ঘোষিত মূল্যের চেয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য বাড়িয়ে ধরেছিল। এর ফলে ব্যবসায়ীদের বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা করে দুই বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত শুল্ক গুনতে হয়েছে।