বাংলাদেশ কি বড় কোনো দুর্যোগের কবলে পড়তে যাচ্ছে? সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন মৃদু ভূকম্পন উসকে দিচ্ছে এ প্রশ্ন। সর্বশেষ গত সোমবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুভূত হয়েছে মৃদু ভূমিকম্প। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। ৪ মাত্রার এ ভূমিকম্পে ধসে পড়েছে বুয়েট আবাসিক এলাকার একটি পুরনো ভবনের ছাদ।
এ নিয়ে চলতি বছরে ১৩টি মৃদু থেকে মাঝারি আকারের ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে দেশে। এসব ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল দেশের ভেতরে, মিয়ানমার, ভারত ও ভুটানে।
চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার আটঘরিয়া এলাকায় ৩ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এরপর ফেব্রুয়ারি জুড়ে সাত দিন কেঁপে উঠেছে সিলেট, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এর মধ্যে ৩ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমার থেকে উৎপন্ন ৫ দশমিক ৯ ও ৫ দশমিক ২ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প এবং ২৫ ফেব্রুয়ারির ৫ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প ছিল মাঝারি মাত্রার।
এরপর ২১ এপ্রিল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুভূত হয় ভূমিকম্প। ৫ মাত্রার সেই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের মণিপুর। এরপর ৭ জুন ৫ দশমিক ৬ মাত্রার কম্পনে কেঁপে ওঠে সারা দেশ। এর উৎপত্তি ছিল ভুটানে। সর্বশেষ ২২ জুন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে উৎপন্ন ৪ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয় ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায়।
ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বারবার ভূকম্পন হচ্ছে এ অঞ্চলে। ফলে ছোট ছোট ভূমিকম্প নিয়মিত ঘটলেও বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরে দেশে অনুভূত ১৩টি ভূমিকম্পের মধ্যে ৭টির উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। বাকি ৬টির উৎস ছিল প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার, ভারত ও ভুটান। মাত্রার হিসাবে ১০টি ভূমিকম্প ছিল মৃদু (৩ থেকে ৪ দশমিক ৯ মাত্রা) এবং ৩টি ছিল মাঝারি (৫ থেকে ৫ দশমিক ৯ মাত্রা)।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বারবার ভূকম্পন হচ্ছে এ অঞ্চলে। ফলে ছোট ছোট ভূমিকম্প নিয়মিত ঘটলেও বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয় গত বছরের ২১ নভেম্বরের ঘটনা। সেদিন নরসিংদীর মাধবদী উপজেলায় ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকা ও আশপাশের এলাকা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় শতাধিক মানুষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির ভূমিকম্পগুলোর একটি।
বাংলাদেশে ভূমিকম্প নতুন কিছু নয়। দেশে ৭ মাত্রার ওপর ভূমিকম্প হয়েছে কয়েকটি। এর মধ্যে ১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প, ১৮৮৫ সালের বেঙ্গল ভূমিকম্প, ১৮৮৭ সালের শিলং ভূমিকম্প আর ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প উল্লেখযোগ্য।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প সেন্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯০০ সাল থেকে ২০২৫ এই সময়কালে বাংলাদেশ ও সংলগ্ন অঞ্চলে প্রায় ১৭ হাজার ৪৪৪টি ভূমিকম্প হয়েছে। এই ভূকম্পনের তীব্রতা ছিল ২ থেকে ৮ দশমিক ৯ মাত্রার।
ভূমিকম্প কখন কোথায় হবে তার ////আপূর্বাভাস দেওয়ার প্রযুক্তি এখনো নেই। তবে ঘন ঘন মৃদু ও মাঝারি মাত্রার কম্পন দেশের ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা, ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং জরুরি প্রস্তুতিই হতে পারে সম্ভাব্য বড় বিপর্যয় মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
১৯০০ সাল থেকে ২০২৫ এই সময়কালে বাংলাদেশ ও সংলগ্ন অঞ্চলে প্রায় ১৭ হাজার ৪৪৪টি ভূমিকম্প হয়েছে। এই ভূকম্পনের তীব্রতা ছিল ২ থেকে ৮ দশমিক ৯ মাত্রার।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ভূমিকম্পের উৎস বা ফল্টের বিষয়টি আমাদের আরও গভীরভাবে গবেষণা করতে হবে। বাংলাদেশের ভেতরে এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ছোট-বড় অনেক উৎস বা ফল্ট আগে থেকেই রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের কোনো ফল্ট সক্রিয় হয়নি। সেটি কবে সক্রিয় হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।’
সম্প্রতি যেসব ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে, সেগুলোকে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি। বলেছেন, ‘কোনো এলাকায় ভূমিকম্প হলে সেখানে একটি সক্রিয় উৎস বা ফল্ট রয়েছে, সেটি নিশ্চিত। এখন প্রশ্ন হলো, এই উৎসটির সঙ্গে আরও বড় কোনো ফল্টের সংযোগ আছে কি না, সেটি খুঁজে বের করতে হবে। বর্তমানে যে এলাকাগুলোতে বারবার ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে, বিশেষ করে নরসিংদী-গাজীপুর-ঢাকার আশপাশের অঞ্চল, সেগুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। কারণ এখনো ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে এসব এলাকা।
গত বছরের নরসিংদীর ভূমিকম্পের কাছাকাছি এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ের ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তি হওয়ায় দুটির মধ্যে সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলছিলেন, একটি ফল্টে ভূমিকম্প হওয়ার পর সেটি আবার স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরতে গেলে অনেক সময় ছোট ছোট আফটারশক বা ক্ষুদ্র কম্পন হতে পারে। এখনো যে কম্পনগুলো হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে ওই উৎসের সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্তত এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সেখানে একটি সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক উৎস রয়েছে।
‘আমাদের দেশে ফল্ট বা ভূমিকম্পের উৎস চিহ্নিত করার মতো পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। উন্নত দেশগুলোও এখনো সব উৎস পুরোপুরি শনাক্ত করতে পারেনি। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, ভুটান, সিকিম কিংবা মিয়ানমারে নিয়মিত ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়। এসব ছোট ভূমিকম্প অনেক ক্ষেত্রেই বড় ভূতাত্ত্বিক উৎসের ইঙ্গিত বহন করে। বিশ্বের অনেক দেশ এ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছে, কিন্তু বাংলাদেশে অর্থায়নের অভাব এবং আগ্রহের ঘাটতির কারণে কাজ খুব সীমিত’, যোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশে যদি শক্তিশালী কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কেমন হবে জানতে চাইলে ড. জিল্লুর রহামন জানান, ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পাশাপাশি ভবনধস, অবকাঠামোগত বিপর্যয়, বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হতে পারে।
জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, ভুটান, সিকিম কিংবা মিয়ানমারে নিয়মিত ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়। এসব ছোট ভূমিকম্প অনেক ক্ষেত্রেই বড় ভূতাত্ত্বিক উৎসের ইঙ্গিত বহন করে।
তার ভাষ্য, ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য শুধু যন্ত্রপাতি কিনে রাখলেই হবে না। নিয়মিত মহড়া, প্রশিক্ষণ এবং প্রস্তুতির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। স্কুল, কলেজ, আবাসিক এলাকা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর নিয়মিত ড্রিল পরিচালনা করতে হবে। জাপান আজ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটি কয়েক দশকের ধারাবাহিক প্রস্তুতি ও অনুশীলনের ফল।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ টি এম শাখাওয়াত হোসেন জানান, আমাদের চারপাশের টেকটোনিক প্লেটগুলো ক্রমেই নড়াচড়া করছে এবং বিভিন্ন স্থানে প্লেটের সংঘর্ষ ঘটছে। তার ভাষায়, ভূমিকম্প ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশকে সাধারণত তিনটি প্রধান অঞ্চলে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলীয় ফল্ট বেল্ট, অর্থাৎ সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চল, দীর্ঘদিন ধরেই অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
তবে কেন্দ্রীয় অঞ্চল, বিশেষ করে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকাগুলোকে আগে তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হলেও বর্তমানে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, ঢাকা, নরসিংদী, মধুপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য মাইক্রো-ফল্ট বা ক্ষুদ্র ভূতাত্ত্বিক ফাটলের অস্তিত্ব রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব ফল্টের কিছু সক্রিয়তারও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের মাত্রা ও স্থায়িত্ব এখনো বড় ধরনের নয়, তবুও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেছেন, ঢাকার মাটির প্রকৃতি চট্টগ্রামের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে সুবিধাজনক। চট্টগ্রামের অনেক স্থানে বালুময় বা দানাদার মাটি থাকলেও ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকায় শক্ত কাদামাটি এবং তার ওপর লৌহসমৃদ্ধ শক্ত স্তর বিদ্যমান। ফলে ভূমিকম্পজনিত কম্পন কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। তবে ঢাকার সব এলাকা সমানভাবে নিরাপদ নয়। বিশেষ করে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল এবং বিভিন্ন ভরাটকৃত এলাকায় ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কারণ এসব স্থানে অনেক ক্ষেত্রে নদী, খাল বা জলাভূমি ভরাট করে নগরায়ণ করা হয়েছে।