Image description

‘আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগায়ে দেবেন। এখন যদি এটা জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে, তাহলে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল– এগুলোর সব পতাকা নামাতে হবে। এগুলো যেখানে থাকবে, কালেমার পতাকাও থাকবে আমাদের।’ ভিডিও বক্তব্যে সম্প্রতি এই আহ্বান জানান মুফতি হারুন ইজহার।

‘আল কুরআনের দারস’ নামের ফেসবুক পেজে গত ১৩ জুন ‘বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিদেশি পতাকার পরিবর্তে কালেমার পতাকা টানানোর আহ্বান’ ক্যাপশনে পোস্ট করা ভিডিওতে হারুন ইজহারকে বলতে শোনা যায়, ‘এই যে আর্জেন্টিনা, তারপরে... এই যে আপনার বদমায়েশি শুরু হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের তরুণরা কালেমার পতাকা শুরু করেছে।’

ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনার মধ্যে মুফতি হারুন ইজহারের এই বক্তব্যের পর কাকতালীয় হলেও, সারা দেশে উড়ছে সাদা এবং কালো পতাকা। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়, স্থাপনা, অলিগলি ছেয়ে গেছে। এমনকি প্রকাশ্যে শোডাউন ও মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা হচ্ছে পতাকা হাতে।

পতাকা নিয়ে শোভাযাত্রা এবং বিভিন্ন স্থানে টানানো ছবি দেওয়ার পর নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা স্ট্রিমকে এগুলোর সঙ্গে আল কায়েদা, আইএসআইএস, তালেবান, হিজবুত তাহরীরের মতো সংগঠনের পতাকার নকশার মিলের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁরা সংগঠিত এই পতাকা কর্মসূচিকে নিজেদের অবস্থান পোক্ত এবং দেশের সরকারব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর পেছনে গোয়েন্দা ব্যর্থতাকেও দায়ী করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

গত ১৩ জুন ‘বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিদেশি পতাকার পরিবর্তে কালেমার পতাকা টানানোর আহ্বান’ ক্যাপশনে ফেসবুকে মুফতি হারুন ইজহারের ভিডিও দেওয়া হয়।
গত ১৩ জুন ‘বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিদেশি পতাকার পরিবর্তে কালেমার পতাকা টানানোর আহ্বান’ ক্যাপশনে ফেসবুকে মুফতি হারুন ইজহারের ভিডিও দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) একেএম শামসুদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে চিহ্নিত গোষ্ঠী কোমর সোজা করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সাদা-কালো পতাকার মাধ্যমে তারা নিজেদের ব্র্যান্ডিং করছে। গোয়েন্দারা সক্রিয় থাকলে এসব সম্ভব হতো না। এখনো সময় আছে। বিষয়টি খুব শক্তভাবে না দেখলে দেশের সর্বনাশ হবে।

এই বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা সুমন সুবহান স্ট্রিমকে বলেন, পতাকা ওড়ানো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর সঙ্গে সীমান্তের পুশইন, গাইবান্ধায় রাম বিগ্রহ স্থাপন, ভারতে এসে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের বাংলাদেশে হামাসের তৎপরতা নিয়ে মন্তব্য– সব একসূত্রে গাঁথা। আমার মনে হয়, সংগঠিতভাবে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি ও সরকারকে বেকায়দায় ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, উগ্রবাদী সংগঠনের অপতৎপরতা নিয়ে আমাদের বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসি ও এটিইউ কাজ করে। বিষয়টি তারা ভালো বলতে পারবে। কেবল কোনো ঘটনা ঘটলে, মামলার তদন্তভার এলে আমরা কাজ করি।

ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শামসুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে, চীন সফরে থাকায় মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সিটিটিসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, যাত্রাবাড়ীতে ফুটবল সমর্থকদের মিছিলে আইএসের মতো কালো পতাকা উড়ানোর দৃশ্য তাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি বিব্রতকর। ভিনদেশি কূটনীতিকদের মাধমে খারাপ বার্তা যাচ্ছে।

এই ব্যাপারে মুফতি হারুন ইজহারের সঙ্গে একাধিক দিন যোগাযোগ করেও মন্তব্য পায়নি স্ট্রিম।

শুরু যাত্রাবাড়ীতে, ছড়াল সারা দেশ

হিজরি বর্ষের প্রথম দিন ছিল গত বুধবার (১৭ জুন)। ওইদিন দুপুরে রাজধানীর শনিরআখড়ায় ১৫ থেকে ২০ তরুণ ‘নতুন হিজরি বছর ১৪৪৮-কে ঘোষণা’ দিতে শোডাউন করে। সেখানে একটি ব্যানার ও বেশ কিছু সাদা-কালো পতাকা প্রদর্শন করা হয়।

যাত্রাবাড়ীর হানিফ ফ্লাইওভারে পতাকা দেখতে আসার আহ্বানের ফেসবুক স্ক্রিনশট।
যাত্রাবাড়ীর হানিফ ফ্লাইওভারে পতাকা দেখতে আসার আহ্বানের ফেসবুক স্ক্রিনশট।

পরে গভীর রাতে শোডাউনের তরুণরা যাত্রাবাড়ীর হানিফ ফ্লাইওভারের লোহার রেলিংয়ে সাদা-কালো পতাকা সারিবদ্ধভাবে টাঙিয়ে দেন। যদিও পরদিন সন্ধ্যায় সেগুলো কারা নিয়ে যায়। পরে ফ্লাইওভারে আরও বেশি সাদা-কালো পতাকা টানানো হয়।

শোডাউনের আয়োজক এবং পরে ফ্লাইওভারে পতাকা টাঙানো কয়েকজনের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে স্ট্রিম। ওই দলে ছিলেন তামীম আল আদনান, ফেসবুকে যিনি ‘টক অব ইনসান’ পেজ পরিচালনা করেন। একইভাবে জাহিদুল ইসলাম মিরাজের ‘আস সিদক’ নামে প্রায় ২ লাখ অনুসারীর পেজ রয়েছে। আর এনামুল হাসান ফেসবুকে ‘ইবারাহ’ নামে পেজ পরিচালনা করেন।

শোডাউন ও পতাকা টাঙানোর কাজে নেতৃত্ব দেন রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের শরিয়াহ গ্রাজুয়েশন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মাওলানা বায়েজিদ খান। এই ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আবার মুফতি হারুন ইজহার।

ফেসবুক পেজ শাইখুনা মিডিয়া থেকে পতাকা লাগানোর বিষয়ে হারুন ইজহারের বক্তব্য প্রচারের স্ক্রিনশট
ফেসবুক পেজ শাইখুনা মিডিয়া থেকে পতাকা লাগানোর বিষয়ে হারুন ইজহারের বক্তব্য প্রচারের স্ক্রিনশট

ইবারাহ এবং আস সিদক পেজ থেকে নিয়মিত সাদা-কালো পতাকা বিক্রি করা হচ্ছে। শোডাউনের দিন সকালে নিজের ফেসবুক আইডিতে শেয়ার করা ভিডিওতে এনামুলকে বেশ কিছু সাদা-কালো পতাকা প্যাকেট করতে দেখা যায়। পতাকা অর্ডার করতে তিনি ইবারাহ পেজের লিংক দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেন।

শুধু তাই নয়, ১৭ জুন রাত ১২টা ৫৮ মিনিটে এনামুল হাসান যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে লাইভ করেন, এসব পতাকা কেউ খুললে ‘কঠিন পদক্ষেপ’ নিতে বাধ্য হবেন তাঁরা। পতাকা লাগানো তাঁর অধিকার জানিয়ে এনামুল হাসান বলেন, রাষ্ট্রে যদি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা নির্দ্বিধায় উড়ানোর অধিকার থাকে, তাহলে আমাদের কালেমা খচিত পতাকা উড়ানোরও অধিকার রয়েছে। সেটাতে রাষ্ট্র বা কোনো পক্ষ যদি বাধা দেয়, আমরাও কঠিন পদক্ষেপে যেতে বাধ্য হব, ইনশাআল্লাহ।

লাইভে তিনি সঙ্গে থাকা তামীম আল আদনান, বায়েজিদ খান, শাফায়াত হোছাইন রিহাব ও জাহিদুল ইসলাম মিরাজের দিকে ক্যামেরা ধরেন। এ সময় ফ্লাইওভারের দুই পাশে লাগানো পতাকা দেখিয়ে এনামুল বলেন, ‘ঢাকাসহ বিভিন্ন অলিগলিতে আমরা পতাকাগুলো লাগিয়েই যাব।’ এই কাজে ‘দাওয়াহ ফাউন্ডেশন’ তাদের সহযোগিতা করেছে বলে লাইভে উল্লেখ করেন।

২০২৫ সালের নভেম্বরে চালু ফাউন্ডেশনের ফেসবুক পেজ ঘেঁটে অর্থায়নের সত্যতা পাওয়া গেছে। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো ক্যাম্পেইনের অর্থ জোগান দেওয়া হয়েছে বলে এক পোস্টেই উল্লেখ রয়েছে।

চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে পতাকা নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে পতাকা নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

ফ্লাইওভার থেকে পতাকা খুলে নেওয়ার পরদিন শুক্রবার (১৯ জুন) জুমার নামাজের পরে হাটহাজারীতে বিক্ষোভ হয়। সেখানেও ছিল সাদা-কালো পতাকা। এই ঘটনার পর হাটহাজারীসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় একই পতাকা দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর, মিরপুর, সাভারেও পতাকা নিয়ে শোডাউন, মিছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ওড়ানো হয়েছে।

এনামুল হাসান ও তাঁর বন্ধুদের ফেসবুকে এসব এলাকার বাইরে পাবনা এবং ফরিদপুরে পতাকা ওড়ানো, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার খবর প্রচার করা হয়েছে। ইবারাহ, আস সিদক ছাড়াও নুসাইবা শপ, আত তিজারাহ, মুসলিমবঙ্গ, শাইখুনা মিডিয়ার ফেসবুক পেজ থেকে পতাকা বিক্রি এবং প্রচারের কাজ করা হচ্ছে।

পাবনায় সাদা-কালো পতাকা নিয়ে মিছিল। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
পাবনায় সাদা-কালো পতাকা নিয়ে মিছিল। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

পতাকার ধরন মেলে উগ্রবাদীদের সঙ্গে

সারা দেশে সাটিয়ে সেগুলোকে ‘কালেমার পতাকা’ প্রচার করা হচ্ছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে পতাকাগুলোর উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। পতাকাগুলো দুই ধরনের। এর একটিতে সাদার মাঝে কালো রঙে আরবি হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা। অন্যটি কালো রঙের ওপর সাদা আরবি হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা।

সাদার ওপর কালো রঙে লেখা পতাকার সঙ্গে মিল আফগানিস্তানের তালেবানের দাপ্তরিক পতাকার। তালেবানের পতাকায় আরবিতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ যে ক্যালিগ্রাফিতে লেখা, একই ক্যালিগ্রাফি ও নকশায় বানানো পতাকা ওড়াচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার কালোর ওপর সাদা রঙে আরবি হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা পতাকা আল কায়েদার। আন্তর্জাতিক এই সংগঠনের বিভিন্ন শাখা সংগঠনও পতাকাটি ব্যবহার করে। আর দুটি পতাকা ব্যবহার করে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীর। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তারা রাজধানীর বায়তুল মোকাররম থেকে ‘মার্চ ফর খিলাফত’ কর্মসূচি পালনে দুই ধরনের পতাকা ব্যবহার করে।

রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে পতাকা টানানো হয়। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে পতাকা টানানো হয়। ছবি: সংগৃহীত

সাদা-কালো পতাকার প্রসঙ্গ টেনে তরুণ আলেম ফারুক ফেরদৌস ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কালিমা নিয়ে প্রশ্ন নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও কালিমা/আয়াত খচিত পতাকা ব্যবহার করে। প্রশ্ন কালিমাসহ পতাকার নির্দিষ্ট ডিজাইন নিয়ে, যা বাইরের কোনো কোনো গোষ্ঠীর পতাকার সাথে মিলে যায় এবং এটা নিয়ে বিপজ্জনক অপপ্রচারের আশঙ্কা তৈরি হয়।’

আরেক আলেম মনযূরুল হক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কালেমার পতাকা’ একটি রাজনৈতিক সিম্বল মাত্র, তাতে ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার চেয়ে পতাকাধারীদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার আহ্বানই বেশি।

গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও নেতিবাচক ব্র্যান্ডিং

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাফী মো. মোস্তফা পতাকা কর্মসূচিকে দুই ভাগে ব্যাখ্যা করছেন। তিনি বলেন, পতাকাটির কোনো কোনোটি সুনির্দিষ্টভাবে আইসিসের সঙ্গে মেলে। সাদাটি তো তালেবানের দাপ্তরিক পতাকার আদলে তৈরি। কোনো জিনিস যতদিন গোপন ও পবিত্র (সেক্রেড এবং সিক্রেট) থাকে, ততদিন তাতে বিস্ফোরণের আশঙ্কা থাকে। খিলাফত এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে গোপন ও পবিত্র ইস্যু হিসেবেই বিবেচিত।

অধ্যাপক শাফীর মতে, পতাকার মাধ্যমে তারা গোপন ও পবিত্র না থেকে দৃশ্যমান এবং অহিংস রূপ ধারণ করেছে, এটি ইতিবাচক। কিন্তু এটি বাংলাদেশের জন্য পুরোপুরি নেতিবাচক ব্র্যান্ডিং হবে। আমাদের দেশ এখনো যে ওয়ার্ল্ড অর্ডারে আছে, সেই জায়গায় এটি মোটেও ভালো জিনিস না।

উগ্রবাদী এই গোষ্ঠীকে কীভাবে ডিল করতে হবে, তাও বাতলে দিয়েছেন এই জঙ্গিবাদ বিশেষজ্ঞ, ‘এখন সরকারকেই ডিল করতে হবে। একটি পথ বের করতে হবে। আমরা জানি, সরকারের সঙ্গে হারুন ইজহারের ভালো সম্পর্ক। তাঁর সঙ্গে বিএনপির লোকজনেরও হৃদ্যতা রয়েছে।’

মুফতি হারুন ইজহারের নির্দেশনার ফটোকার্ড নিজের আইডিতে প্রচার করছেন অনুসারী জাহিদুল ইসলাম মিরাজ।
মুফতি হারুন ইজহারের নির্দেশনার ফটোকার্ড নিজের আইডিতে প্রচার করছেন অনুসারী জাহিদুল ইসলাম মিরাজ।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ধারণা, সরকার নিজস্ব উপায়ে তাদের সঙ্গে ডিলিং করছে। কিন্তু কোন পর্যন্ত তাদের যেতে দেওয়া উচিত, তা সরকারকেই ঠিক করতে হবে। জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা উদ্বেগ– সব মিলে সরকারের পলিসি থাকতে হবে। এডহক ভিত্তিতে ওয়ান টু ওয়ান ডিল করলাম, পলিসি থাকল না– এটি বাজে হবে। অতীতে এমন ডিল হিতে-বিপরীত হয়েছে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক একেএম শামসুদ্দিনের মতে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও স্থাপনায় পতাকা বসানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে এক ধরনের ‘ব্র্যান্ডিং’ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা বরাবরই ভুল করে থাকি বা খুব অবহেলা করি। খুব একটা আমলেও নিই না। এটি দুই কারণে হয়। বেশি ঘাঁটাঘাঁটিতে আরও বাড়বে এবং আমরা প্রচার করতে চাই না যে, ওরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। দুটিই আমাদের জন্য ক্ষতিকর।’

একেএম শামসুদ্দিন বলেন, ‘আমি নিজেও ভিডিও দেখেছি। যারা পতাকা নামিয়েছে, তাদের ওই লোকগুলো ধমকাচ্ছে। এখনই বিষয়টি স্ট্রিক্টলি না দেখলে সর্বনাশ হবে। এটা সত্যি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনেক ভাটা। যেমন প্রত্যাশা, তেমন হচ্ছে না। পতাকার ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতা রয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকলেও চলবে না।’

‘সাদাক্বাহ প্রজেক্টর’ ১০ হাজার পতাকা

সারা দেশে ১০ হাজার পতাকা উড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ‘সাদাক্বাহ প্রজেক্ট’। এরপর গত ২০ জুন রাতে রাজধানীর শাপলা চত্বরে বেশ কিছু পতাকা লাগায় সংগঠনটি। পরে রাতে শাপলা চত্বর থেকে ফেসবুকে একটি লাইভ করেন ‘সাদাক্বাহ প্রজেক্ট’– এর অ্যাডমিন আমিনুল হক। লাইভে তিনি জানান, শাপলা চত্বর থেকে পর্যায়ক্রমে বায়তুল মোকাররম হয়ে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত পতাকা লাগাবেন।

সোমবার (২২ জুন) রাতে পেজের পোস্টে ৫ হাজার বিনামূল্যে এবং ৫ হাজার পতাকা বিনালাভে বিতরণ করার তথ্য জানানো হয়।

সারা দেশে ১০ হাজার পতাকা উড়ানোর ঘোষণা দেওয়া ‘সাদাক্বাহ প্রজেক্ট’ পেজের স্ক্রিনশট।
সারা দেশে ১০ হাজার পতাকা উড়ানোর ঘোষণা দেওয়া ‘সাদাক্বাহ প্রজেক্ট’ পেজের স্ক্রিনশট।

একই সময়ে ‘দাওয়াহ ফাউন্ডেশন’– এর পেজ থেকে জানানো হয়, রাতে লাগানো পতাকাগুলো দুপুর ১২টার দিকে কেউ সরিয়ে নিয়েছে। পেজ থেকে এই কাজকে ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানানো হয়। নতুন করে দাওয়াহ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে শাপলা চত্বরে পতাকা লাগানোর ঘোষণা দেওয়া হয়।

ফেসবুকে আমিনুল হক নিজেকে ‘সাদাক্বাহ প্রজেক্ট’– এর অ্যাডমিন পরিচয় দিয়েছেন। পেজে দেওয়া নম্বরে কল দিয়ে আমিনুল হককে চাইলে বলা হয়– তিনি পেজের অ্যাডমিন। নিজের নাম বলতে চান না। পেজে ১০ হাজার পতাকা বিতরণের কথা বলা হলেও, ফোনে অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমরা আসলে বিক্রির টার্গেট নিয়েছি।’ শাপলা চত্বরে ‘সাদাক্বাহ প্রজেক্ট’ বা নিজের পক্ষ থেকে পতাকা লাগানোর কথা অস্বীকার করে অ্যাডমিন পরিচয়ধারী স্ট্রিমকে জানান, চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ‘ভাইদের’ পতাকা লাগাতে তিনি সাহায্য করেছেন। এরপরই কল কেটে দেন।

জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলনের প্রচার সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ স্ট্রিমকে বলেন, ‘শাপলা চত্বরে কোনো পতাকা লাগানোর সঙ্গে আমাদের কেউ জড়িত নই। কালেমার পতাকা এক জিনিস, আর সাদা-কালো পতাকা ভিন্ন বিষয়। এই ধরনের পতাকা আমরা দলীয়ভাবে কোথাও উত্তোলন করি না। আমাদের কোনো কর্মীও করে না। কেউ কোথাও করে থাকলে, দলের আদর্শের বাইরে গিয়ে করেন। আমরা জানতে পারলে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাদাক্বাহ প্রজেক্টের অ্যাডমিন আমিনুল হকের নামে একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি। একটি মোহাম্মদপুর থানায় (নং-৫২; ০৮/০৫/২০২১); অন্যটি ভাটারা থানায় (নং-৫২; ১৭/০৯/২০২০)।

২০২৪ সালের ১ এপ্রিল কাশিমপুর কারাগার থেকে আমিনুল হক জামিনে বের হন। এরপর থেকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কারাগারে থাকা অন্য বন্দিদের মুক্তির আন্দোলনে সক্রিয় রয়েছে।

বিশ্বকাপের সঙ্গে পতাকার সম্পর্ক নেই

পতাকা লাগানোর পরদিন ১৮ জুন বেলা ৫টা ১০ মিনিটে এনামুল হাসান ফেসবুকে পোস্ট দেন, পতাকাগুলো অজ্ঞাত কেউ খুলে নিয়ে গেছে। পৃথক আরেকটি ভিডিও পোস্টে তিনি বলেন, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে– পুলিশ তাদের গাড়িতে এসে পতাকাগুলো খুলে নিয়ে গেছে। পরে রাত সাড়ে ৯টার পরে দেওয়া আরেক পোস্টে এনামুল হাসান লেখেন, আমাদের ভাইয়েরা টিম নিয়ে যাঁরা পতাকা খুলেছে, তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। তাঁরা সুসংবাদ দিয়ে আমাদের আশ্বস্ত করেছে। কিন্তু সে সুসংবাদ আমরা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারছি না। এরপর ফ্লাইওভারে আবার পতাকা লাগানোর খবর ফেসবুকে দেন এনামুল এবং নতুন করে লাগানো পতাকার ভিডিও শেয়ার করেন।

বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে ভিন দেশের পতাকা ওড়ানোর প্রতিবাদে ‘কালেমার পতাকা’ টাঙানোর কথা বললেও, এনামুল হাসানের ফেসবুক ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে। তাঁর ফেসবুকে থাকা পুরোনো ভিডিওতে দেখা গেছে, আগেও তিনি বিভিন্ন জায়গায় সাদা ও কালো দুই ধরনের পতাকা প্রদর্শন করেছেন।

রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে পতাকা হাতে সাদাক্বাহ প্রজেক্টের অ্যাডমিন আমিনুল হক। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে পতাকা হাতে সাদাক্বাহ প্রজেক্টের অ্যাডমিন আমিনুল হক। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় সংসদ চত্বরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির জানাজাতেও একই পতাকা প্রদর্শন করেন এনামুল ও তাঁর সঙ্গীরা। ওই সময় তামীম আল আদনানের ‘টক অব ইনসান’ পেজ থেকে শেয়ার করা ভিডিওতে পতাকা দেখিয়ে এনামুল হাসানকে বলতে দেখা যায়, ‘আমরা ওসমান হাদি ভাইয়ের জানাজায় কালেমার পতাকা নিয়ে উপস্থিত হয়েছি। এই কালেমার পতাকা আজকে নিচে আছে, এটা ইনশাআল্লাহ আগামীতে কিছু দিনের মধ্যেই সংসদ ভবনের উপরে উঠবে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের এই আশা পূর্ণ হবে।’

যোগাযোগ করলে শুরুতে স্ট্রিমকে এনামুল হাসান যাত্রাবাড়ীর শোডাউন এবং ফ্লাইওভারে পতাকা লাগানোর কথা অস্বীকার করেন। তবে ফেসবুকে নিজের লাইভ এবং ইবারাহ পেজ থেকে পতাকা সরবরাহের কথা জানালে, তিনি বলেন, ‘পেজটি আমার নয়। মডারেটর হিসেবে রয়েছি মাত্র।’

হঠাৎ ঘোষণা দিয়ে সাদা-কালো পতাকা টাঙানোর বিষয়ে এনামুল হাসান বলেন, ‘এটিও আমি জানি না, ভাই। এটি উনারা করেছেন, আমি সঙ্গে ছিলাম, বায়েজিদ খানও ছিলেন।’

 

সংসদের সামনে পতাকা ওড়ানো এবং বক্তব্যের ভিডিওর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওই পতাকা আমার ছিল না। আমি জাস্ট সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মিডিয়া যখন সামনে মাইক ধরেছে, তখন আমি কথাটা বলেছি।’ সেই ‘মিডিয়া’ তাঁর বন্ধুর ফেসবুক পেজ কিনা– প্রশ্নে আর কথা বলতে চাননি এনামুল। এ সময় হাসপাতালে আছেন বলে কল কেটে দেন।

হারুন ইজহারের শরিয়াহ গ্রাজুয়েশন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মাওলানা বায়েজিদ খান স্ট্রিমকে বলেন, ‘পতাকার উদ্দেশ্য হলো– আরবি মাস শুরু হয়েছে, আরবি আরবি একটা ভাইব যেন সারা দেশে আসে, সেই চেষ্টা আমরা করেছি। অনেকে বলতে পারেন, এটা সনাতনীদের বিরুদ্ধে, এ রকম কিছু না।’

তিনি বলেন, ‘এই পতাকা কোন দেশ কীভাবে ব্যবহার করে, সেটি আমাদের কাছে ম্যাটার না আসলে।’ নিষিদ্ধ সংগঠনের পতাকা উত্তোলন বেআইনি জানার পরেও কেন তুলছেন– প্রশ্নে বায়েজিদ খান বলেন, ‘কোনো খারাপ সংগঠন এই পতাকাকে ব্যবহার করলে এটা তাদের দোষ। দাড়ি রেখে খারাপ কাজ করলে কী দাড়িকে দোষারোপ করব?’