চব্বিশের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর আসে রাজনৈতিক কার্যক্রমে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা। সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে সেই নিষেধাজ্ঞা পায় আইনি রূপ। দলের শীর্ষ নেতারা পলাতক। বেশিরভাগই দেশের বাইরে। কেউ কেউ কারাগারে। রয়েছে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি।
এমন কোণঠাসা অবস্থায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি সীমাবদ্ধ ছিল স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। ফেসবুক পোস্ট, এক্সের বিবৃতি, লাইভ আলোচনা, ভিডিওকল, জুম মিটিং আর অলিগলিতে কয়েক সেকেন্ডের ঝটিকা মিছিলেই দলটির অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল তৃণমূল। এবার ভার্চুয়াল জগৎ থেকে সরাসরি মাঠে নামার চেষ্টায় মরিয়া দলটির বিভিন্ন স্তরের কর্মীরা। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিজেদের উপস্থিতি তুলে ধরার নানা তৎপরতা চালাচ্ছেন তারা।
২৩ জুন— অর্থাৎ আগামীকাল মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এর আগে কয়েক দিন ধরে দেশের অনেক এলাকায় ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে রাস্তায় নামতে দেখা গেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীদের। তাদের গতিবিধি নজরদারিতে রেখেছে প্রশাসনও। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে কেউ যাতে কোথাও মিটিং-মিছিল বা নাশকতা করতে না পারেন, সে ব্যাপারে সজাগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে র্যাব। গতকাল রবিবার সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-২-এর অধিনায়ক নয়মুল হাসান বলেছেন, আওয়ামী লীগের কেউ বিশৃঙ্খলা করলে নিজেরাই ঝুঁকিতে পড়বেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বা পোস্ট শেয়ার করে কর্মীদের সাময়িকভাবে চাঙ্গা রাখা গেলেও, তা দিয়ে জনমত গঠন বা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এ বাস্তবতা এখন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদেরও ভাবিয়ে তুলছে। সেজন্য তারা চেষ্টা করছেন প্রকাশ্যে মাঠে আসার। তবে নেতৃত্বশূন্যতার চরম বাস্তবতায় এটি তেমন একটি ফল দেবে না।
আওয়ামী লীগের তৃণমূল ও মধ্যম সারির একাধিক নেতার সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যোগাযোগ করে আভাস মিলেছে, তারা এবার কৌশলগত কিছু পরিবর্তনের দিকে জোর দিচ্ছেন। মাঠের রাজনীতি থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, যা দলের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে আত্মঘাতী হবে— এমনটাই মনে করছেন তারা। এ কারণেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে ‘ভার্চুয়াল রাজনীতি’র খোলস ভেঙে রাজপথে ফেরার একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।
এ ব্যাপারে বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে প্রতিবেশী দেশে অবস্থানরত দলের শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে। সারা দেশে আনন্দ র্যালি, শোভাযাত্রাসহ নানা আনুষ্ঠানিকতায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের কর্মসূচি রয়েছে এবার। দলের ভেতরে-বাইরে এখন একটাই আলোচনা— শুধু ‘ডিজিটাল উপস্থিতি’ দিয়ে আর নয়, ধীরে ধীরে ফিরতে চায় মাঠের রাজনীতিতে।
কেন্দ্রীয় নেতারা অবশ্য থাকছেন ভার্চুয়াল জগতেই। দলীয়প্রধান শেখ হাসিনা এবার ভার্চুয়ালি অংশ নেবেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায়। দলটির বিদেশে থাকা একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা বলছেন, আপাতত সরাসরি বড় কোনো রাজনৈতিক শোডাউন বা সংঘাতপূর্ণ কর্মসূচিতে না গিয়ে সামাজিক ও মানবিক কাজের মাধ্যমে মাঠে নামার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বড় সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট ‘পকেট মিটিং’ বা চা-চক্রের মাধ্যমে ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। ভোররাতের আন্ডারগ্রাউন্ড ঝটিকা মিছিলের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে দিনের আলোতে, জনবহুল স্থানে তুলনামূলক বড় জমায়েত করার ছক আঁকা হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষের চোখে তা দৃশ্যমান হয়। এর অংশ হিসেবে এরই মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মহড়া হয়েছে।
দলটির কেন্দ্রীয় দুজন নেতা জানাচ্ছেন, দলটির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘জনবিচ্ছিন্নতা’ কাটানো। শুধু ফেসবুকে অ্যাকটিভ থাকলে দল একসময় এনজিও বা প্রেস রিলিজনির্ভর সংগঠনে পরিণত হবে। তাদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ রাজপথের দল। আইনি বাধা ও ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও যদি আমরা মাঠে না নামি, তবে কর্মীরা স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবেন। তাই ঝুঁকি নিয়েই আমাদের মাঠে নামার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। প্রয়োজনে জেল-জুলুম খাটতে হবে বলেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে দলীয়প্রধানের।
আওয়ামী লীগের এই মাঠমুখী হওয়ার প্রচ্ছন্ন চেষ্টা বা পরিকল্পনার বিষয়টি নজর এড়ায়নি সরকারের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শুধু সাইবার মনিটরিংয়েই সীমাবদ্ধ নেই, বরং মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি দ্বিগুণ করেছে। এরই মধ্যে ঝটিকা মিছিল থেকে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, ঝটিকা বা গুপ্ত মিছিলগুলোর ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রবিরোধী বা উসকানিমূলক কোনো কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে কি না— তা দেখতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটগুলো ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ভার্চুয়াল দুনিয়ার নিরাপদ দেয়াল পেরিয়ে রাজপথের তপ্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতায় পা রাখা আওয়ামী লীগের জন্য মোটেও সহজ হবে না। একদিকে আইনি নিষেধাজ্ঞা ও গ্রেপ্তারের ভয়, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার দাপট হারিয়ে ফেলা সাধারণ কর্মীদের মনোবল ফিরিয়ে আনা— এই দুই চ্যালেঞ্জ পাড়ি দেওয়া দলটির জন্য বড়ই কঠিন হবে।
মাহবুবুর রহমানের মতে, মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সিনিয়র নেতাদের সবার আগে তাদের মামলাগুলো আইনিভাবে মোকাবিলার পথে আসতে হবে। প্রয়োজনে জেলে যেতে হবে। না হলে শুধু কর্মীরা জীবন বাজি ধরে রাজপথে নামবেন না।