Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাফল্য তাদেরকে প্রথমবারের মতো বিরোধী দল হিসেবে সংসদে জায়গা করে দিয়েছে। এবার দলটি এককভাবে ৬৮টি আসন আর তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য মিলে মোট ৭৭টিতে জয় পেয়েছে। কিন্তু সফলতার এ গল্পের মধ্যেই সংসদে দলীয় সংসদ সদস্যদের তথ্যগত ভুল, বিতর্কিত মন্তব্য এবং অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যে ‘বিব্রত’ জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব। পরিস্থিতি এমন জায়গায় ঠেকেছে যে, নিজেদের সংসদ সদস্যদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার উদ্যোগ নিচ্ছে দলটি। কারণ সংসদ শুধু আন্দোলন, সংগঠন বা নির্বাচনী রাজনীতির মঞ্চ নয়; এটি এমন একটি জায়গা— যেখানে প্রতিটি শব্দ, তথ্য এবং বক্তব্য রাষ্ট্রীয় নথির অংশ হয়ে থাকে।

বাস্তবতা হলো, দলটির অধিকাংশ সংসদ সদস্যই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে এসেছেন। নির্বাচিতদের ৫৯ জনই নতুন মুখ। তারাই মূলত সংসদীয় ভাষা, তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার, বাজেট বিশ্লেষণ, আইন প্রণয়ন এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার ঘাটতিতে পড়ছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

 

সাম্প্রতিক আলোচনার সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম। গত ১৪ জুন জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি দাবি করেছেন, তার বাবা ও দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। বক্তব্যটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে। কারণ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তার বাবা জীবিত রয়েছেন। পরে তিনি নিজের বক্তব্য সংশোধন করে বলেছেন, এটি ছিল ‘মুখের ভুল’। তিনি আসলে বাবার চাচার কথা বলতে চেয়েছিলেন।

বিতর্কের আরেকটি ঘটনায় জড়ান নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার। সংসদে একটি উপমা ব্যবহার করে দেওয়া তার বক্তব্য নিয়ে আপত্তি ওঠে। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমানও সংসদ সদস্যদের আবাসিক সুবিধা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পর আলোচনায় আসেন। স্থানীয় উন্নয়ন বা জাতীয় নীতির পরিবর্তে ওভেন, পর্দা কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয় সংসদে উত্থাপনের ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক হাস্যরসের জন্ম দেয়।

 

 

এ ছাড়া কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার বাজেটবিষয়ক বক্তব্যও সমালোচনার মুখে পড়েছে। তিনি বাজেটের আকার ‘৬০০ কোটি টাকা’ করার কথা বলে আলোচনার জন্ম দেন।

জামায়াতের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে তাদের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। কয়েকজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে দলের শীর্ষনেতারা পৃথকভাবে কথা বলেছেন। সংসদে বক্তব্য দেওয়ার আগে আরও প্রস্তুতি নেওয়া, তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংসদে দলের অবস্থান আরও সুসংগঠিতভাবে তুলে ধরার জন্য একটি সমন্বিত কৌশল নিয়েও আলোচনা চলছে।

দলটির পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সংসদ সদস্যদের জন্য নিয়মিত ওরিয়েন্টেশন কর্মশালা, বাজেট ও অর্থনীতি বিষয়ে বিশেষ ব্রিফিং, সংসদীয় আচরণবিধি নিয়ে প্রশিক্ষণ, তথ্য-উপাত্তভিত্তিক বক্তব্য তৈরিতে সহায়তা এবং গণমাধ্যম ও জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়ার কৌশল শেখানো।

 

জামায়াতের একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেছেন, ‘আমাদের অধিকাংশ এমপি নতুন। তারা আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক কাজ বা পেশাগত জীবনে দক্ষ হতে পারেন; কিন্তু সংসদীয় রাজনীতি একটি ভিন্ন বিষয়। সংসদে কীভাবে বক্তব্য দিতে হয়, কোন বিষয়কে কীভাবে উপস্থাপন করতে হয়— এসব বিষয়ে আরও দক্ষতা প্রয়োজন।’ এই নেতা তার নাম প্রকাশ করতে চাননি।

 

তিনি আরও বলেছেন, ‘দলের পক্ষ থেকে সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের জন্য কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংসদীয় আচরণ, বাজেট আলোচনা, আইন প্রণয়নপ্রক্রিয়া এবং গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।’

তবে দলটির নেতারা মনে করছেন, তাদের সংসদ সদস্যদের ভুলকে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে। তাদের দাবি, সংসদে নতুন সদস্যদের ক্ষেত্রে এমন কিছু বিচ্ছিন্ন ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় বক্তব্যের নির্দিষ্ট অংশ কেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়, যা ভুল-বোঝাবুঝির জন্ম দেয়।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, ‘আমাদের এমপিদের একটি ছোট ভুল নিয়ে যেভাবে আলোচনা হচ্ছে, অন্য দলের এমপিদের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। সংসদে প্রায় সব দল থেকেই বিভিন্ন সময় বিতর্কিত বা অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য আসে। কিন্তু জামায়াতের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো বেশি আলোচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও বিষয়গুলোকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করছে।’

তার মতে, নতুন সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব কমে আসবে।

হামিদুর রহমান আরও বলেছেন, ‘সংসদের বিষয়গুলো ট্র্যাডিশনাল রাজনীতির সঙ্গে মেলে না। এখানে বিধির বাইরে খুব বেশি কথা বলা যায় না। কোন জায়গায় কোন বিষয় উত্থাপন করতে হয়, সেটা বুঝতে হয়। বিভিন্ন কমিটিতে দাবি-দাওয়া ও চাওয়ার জায়গা আছে। এসব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে আমাদের প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা চলবে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম মনে করছেন, অনভিজ্ঞতার বিষয়টি শুধু জামায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেছেন, ‘এবারের সংসদে নতুন সদস্যের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিষয়টি দৃশ্যমান হচ্ছে। শুধু জামায়াতেই নয়, বিএনপি, এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের নতুন সদস্যদের মধ্যেও এমন ভুল দেখা যাচ্ছে। সংসদে কথা বলা একটি বিশেষ দক্ষতার বিষয়, যা সময় ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত হয়।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন। এতে সংসদীয় আচরণ, বিধি-বিধান ও বক্তব্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়বে এবং এ ধরনের বিতর্কও কমে আসবে।’

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নির্বাচনী সাফল্য ধরে রাখতে জামায়াতকে শুধু ভোটের মাঠে নয়, সংসদের ভেতরেও নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। আর সে কারণেই এখন দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ— সংসদীয় রাজনীতির ভাষা, শিষ্টাচার ও দক্ষতায় নিজেদের দ্রুত মানিয়ে নেওয়া।