স্কুলে ভর্তিতে নামমাত্র পরীক্ষা হবে, কেউ সন্তানকে কোচিংয়ে দেবেন না : শিক্ষামন্ত্রী n কোচিং না করালে সন্তান ভালো স্কুলে চান্স পাবে না :আশঙ্কা অভিভাবকদের n ওপরের ক্লাসে ভালো স্কুলে ভর্তি হতে স্কুল ও কোচিং সেন্টারের দ্বৈত চাপে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক অবসাদে ভুগছে
১৬ বছর পর বাতিল হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি ব্যবস্থা। ২০২৭ সাল থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি হতে হবে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বারবার আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, এই পরীক্ষাগুলো হবে মূলত ‘নামমাত্র’, যার জন্য কোচিং সেন্টারে দৌড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। তারপরও কোচিংয়ে ছুটছেন অভিভাবকরা। স্কুলজীবন শুরুর আগেই প্রথম শ্রেণির ভর্তিযুদ্ধে অংশ নিতে সারা দেশে প্রায় ৪০ লাখ শিশু কোচিং শুরু করে দিয়েছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে কোচিং সেন্টার কর্তৃপক্ষ। সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা নেওয়া হলে, ভর্তিতে কোচিং বাণিজ্যের অর্থ দাঁড়ায় ২ হাজার কোটি টাকা। অভিভাবকদের অভিমত, যেহেতু ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে, তাই কোচিং না করালে তাদের সন্তান ভালো স্কুলে ভর্তি হতে পারবে না। তাই বাধ্য হয়ে তারা সন্তানদের কোচিংয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে ওপরের ক্লাসে ভালো স্কুলে ভর্তি হতে চাওয়া অনেক শিক্ষার্থী স্কুল ও কোচিং সেন্টারের দ্বৈত চাপে চরম মানসিক অবসাদের শিকার হচ্ছে।
গত ১৬ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের দেওয়া এক পরিপত্রে জানানো হয়, ‘বর্তমানে সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম লটারির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তবে আগামী ২০২৭ সাল থেকে এ পদ্ধতি বাতিল করা হবে। এর পরিবর্তে অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।’ গত বৃহস্পতিবার শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, লটারিভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি বাতিল করে নতুন ব্যবস্থায় ক্যাচমেন্ট এরিয়া ও পরীক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। তিনি বলেন, ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে, ক্লাস ওয়ানের ব্যাপারে আমরা বলেছি, একটি নামমাত্র ভর্তি পরীক্ষা নেব। এখানে কোচিং সেন্টারে যাওয়ার মতো কোনো ভর্তি পরীক্ষা না। কেউ সন্তানকে কোচিংয়ে দেবেন না। আমরা ‘ক্যাশমেন্ট এরিয়া’ (স্কুলের আশপাশের শিক্ষার্থীদের ভর্তি নেওয়া) এবং ন্যূনতম ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সিট অনুযায়ী সেভাবে ব্যবস্থা করব।
দেশের বিবেকবান ও শিক্ষাসচেতন অভিভাবক-শিক্ষাবিদ-শিক্ষকরা বলেন, প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য পরীক্ষাটিকে যদি পরীক্ষা না বলে শিশু নির্যাতনের আয়োজন বলি, তাতে ভুক্তভোগী মানুষমাত্রই একমত পোষণ করবেন। আর এটা তো সবারই জানা যে তদবির-ঘুষ-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি-ক্ষমতার দাপটসহ এমন কোনো দাওয়া নেই, যার চর্চা কাঙ্ক্ষিত বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য হয় না। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অতীতে ভর্তি প্রক্রিয়াকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী একটি স্বার্থান্বেষী চক্র। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা—এ তিনের সমন্বয়েই অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত হতো শিক্ষার্থীর ভাগ্য। মতিঝিলের এক অভিভাবক মো. শহীদুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমার ছেলে ভালো ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু পরে শুনলাম টাকার বিনিময়ে অনেকেই সুযোগ পেয়েছে। তখন মনে হয়েছিল, মেধার কোনো মূল্যই নেই।’ তবে লটারি পদ্ধতির কারণে এগুলোর চর্চা অনেকটাই কমে যায়। শিক্ষাবিদরা বলেন, কোচিং সংস্কৃতির প্রভাব কেবল অর্থনৈতিক বা শিক্ষাগত নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশেও প্রভাব ফেলে। নির্দিষ্ট প্রশ্ন-উত্তর মুখস্থ করা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি—এসবের ফলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তারা শেখার আনন্দ থেকে দূরে সরে গিয়ে কেবল নম্বরের পেছনে ছুটতে শুরু করে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি একটি জাতির চিন্তাশক্তি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজধানীর ‘নামিদামি’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাণিজ্য এবং কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে ২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারির মাধ্যমে ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। ২০১২ সাল থেকে বেসরকারি বিদ্যালয়েও একই পদ্ধতি চালু হয়। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হয় এবং এরপর থেকে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছিল। এরপর থেকে শিক্ষার্থী ভর্তিতে বাণিজ্য বন্ধের পাশাপাশি কোচিং ব্যবসায় ধস নামে। লটারি পদ্ধতি বাতিল হওয়ায় সম্প্রতি কোচিং বাণিজ্য আবার চাঙ্গা হয়েছে। জানা গেছে, রাজধানীর ভালো স্কুলে ভর্তির গ্যারান্টিসহ নানা চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে অলিগলিতে খোলা হয়েছে ভর্তি কোচিং সেন্টার। পত্রিকার ভেতরে করে ঘরে ঘরে পাঠানো হচ্ছে লিফলেট; এসব লিফলেটে থাকছে কোচিং সেন্টারের স্কুলের শিক্ষক পরিচিতি, বিগত দিনে কোচিং করে কতজন নামকরা স্কুলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন সেসব শিক্ষার্থীর ছবিসহ চটকদার বিজ্ঞাপন।
মোহাম্মদপুরে বসবাসরত একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আদিব হোসেন তার ছয় বছরের সন্তান আদনানকে আগামী বছর প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করাতে চান। আদিব হোসেন বলেন, সেন্ট যোসেফ এবং রেসিডেনসিয়াল স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাতে গত এপ্রিল মাসে তাজমহল রোডে একটি কোচিং সেন্টারে কোচিং করাচ্ছেন। এদিকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া রুমা আক্তার তৃতীয় শ্রেণিতে ভালো স্কুলে ভর্তি হতে ইকবাল রোডে একটি কোচিংয়ে ক্লাস করছেন। রুমা একাডেমিক পড়ালেখা কমিয়ে দিয়ে কোচিংয়ের পড়ায় বেশি মনোযোগ দিয়েছে। শুধু আদনান ও রুমা নয়, তাদের মতো অসংখ্য শিক্ষার্থী ভর্তি কোচিংয়ে এখন বেশি সময় অতিবাহিত করছে। শিক্ষাবিদরা বলেন, উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক স্তরে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয় না, সেখানে মেধাতালিকা বা পরীক্ষার বদলে এলাকাভিত্তিক বা ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ পদ্ধতি অনুসরণ করে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়; অবশ্য এসব দেশের সব স্কুলের মান একই রকম হওয়ায় ‘এলিট স্কুল’ কালচার নেই।
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ জানান, ‘আসল সমাধান হলো সারা দেশের সব এলাকায় মানসম্মত প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুল নিশ্চিত করা। কিন্তু যেহেতু তা নেই, তাই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে লটারিই ছিল অধিকতর ন্যায়সংগত ব্যবস্থা। লটারি বাদ দেওয়ায় সেই পুরোনো বৈষম্যই ফিরে আসবে—যেখানে শিক্ষিত ও সচ্ছল মা-বাবার সন্তানরা সব সুবিধা পাবে, আর গরিবের সন্তানরা পিছিয়ে পড়বে। লটারি পদ্ধতি তুলে দেওয়া ঠিক হয়নি। শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউই ভর্তি পরীক্ষার পক্ষে নয়। তারপরও কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো জানি না।’