মাদ্রাসা শিক্ষক তাজুল ইসলামকে গুম করে এক বছর আট মাস নির্জন কক্ষে আটকে রাখা হয়। এ সময় তাকে নির্মম নির্যাতন করা হতো। জিজ্ঞাসাবাদের সময় কয়েকজন ব্যক্তির নাম বলে তাদের সম্পর্কে জানতে চাওয়া হতো; জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে স্বীকারোক্তি দিতে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো হতো। একসময় তিনি জানতে পারেন, তাকে ডিজিএফআই তুলে নিয়ে গিয়েছিল।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন ভুক্তভোগী তাজুল ইসলাম। আওয়ামী লীগের দেড় দশকের দুঃশাসনের সময়ে ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) বা আয়নাঘরে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি। এই মামলায় আসামিদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাবেক ও বর্তমান ১২ জন সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন।
জবানবন্দিতে তাজুল ইসলাম বলেন, “আমি বর্তমানে কৃষিকাজ করি। ঘটনার সময় আমি মানিকগঞ্জ জেলার গঙ্গাধর পট্টি এলাকায় ‘দারুল উলুম মানিকগঞ্জ’ নামের একটি মাদ্রাসায় কর্মরত ছিলাম। আমি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের একজন কর্মী। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের জুলুম-নির্যাতন ও হেফাজতের ওপর সরকারের গণহত্যার বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখির কারণে আমাকে গুম করা হয়। ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল গভীর রাতে এই মাদ্রাসা থেকে ১০ থেকে ১৫ জন ব্যক্তি আমাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তারা আমার ফেসবুক পাসওয়ার্ড এবং জিমেইল আইডি ও পাসওয়ার্ড চায়। তারা কয়েকজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে, আমি তাদের চিনি কি না জানতে চায়। আমি চিনি না বলে জানালে তারা বলে, কীভাবে চিনাতে হয় তা আমাদের জানা আছে। এরপর তারা আমার কাঁধে, বাহুতে এবং পায়ের রানে লাঠি দিয়ে পিটাতে থাকে। এরপর আমাকে একটি রুমে নিয়ে রাখা হয়। সেখানে ১ হাজার ভোল্টের বাতি জ্বালিয়ে রাখা হতো। এই রুমে আমাকে সাত মাস রাখা হয়। প্রথম চার মাসে আমাকে ২০-২৫ দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় আমাকে লাঠি দিয়ে কয়েকজন মিলে পেটাতো।”
জবানবন্দিতে তাজুল বলেন, “২০১৬ সালের ১৫ রমজান হাত, মুখ ও চোখ বেঁধে আমাকে একটি গাড়িতে তোলে। একবার নিচে নামিয়ে গাড়িতে ওঠানোর সময় একজন জানতে চায়—'এটা কোনটা?’ বলা হয়—'এটা পুরাতন।’ এরপর তারা একজন আরেকজনকে বলে, ‘স্যার, সিএফ কখন হবে?’ পরবর্তীতে কারাগারে থাকা অবস্থায় আমি জানতে পারি, সিএফ মানে ক্রসফায়ার। এরপর আমাকে নতুন রুমে রাখা হয়, সেখানে ফ্যানের গায়ে লেখা ছিল—র্যাব-৪। এখানে চার মাস রাখার পর নতুন আরেক রুমে নেওয়া হয়। সেখানে রুমটি ছিল টয়লেট আকৃতির, ৩ ফুট বাই ৬ ফুট। রুমের অর্ধেক অংশে কমোড এবং বাকি অংশে আমাকে থাকতে দেওয়া হয়। রুমের সামনে সিসি ক্যামেরা লাগানো ছিল। এই জায়গাটি র্যাব-১০ বলে জানতে পারি।”
“এখানে একদিন রাখার পর চোখ বেঁধে, হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে গাড়িতে তোলা হয়। ৭-৮ ঘণ্টা চলার পর গাড়িটি একটি জায়গায় থামে। গাড়ি থেকে আমাকে নামিয়ে দুজন ব্যক্তি দুপাশ দিয়ে ধরে ছাতা দিয়ে আড়াল করে ৮-১০ কদম হাঁটিয়ে একটি রুমে নিয়ে রাখে। ওই রুমটিও টয়লেটের মতো। ৮ দিন এখানে রাখার পর ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর আমাকে গাড়িতে তুলে চট্টগ্রাম আকবর শাহ থানাধীন কর্নেল হাট এলাকায় সানজিদা এন্টারপ্রাইজের সামনে গাড়ি থেকে নামিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের একটি নাটক সাজিয়ে আবার গাড়িতে তোলা হয়। ১০-১৫ মিনিট গাড়ি চলার পর একটি নির্মাণাধীন বাড়ির সামনে গাড়িটি থামে এবং গাড়ি থেকে নামিয়ে দোতলার একটি রুমে নিয়ে আটকে রাখা হয়। আশপাশ দিয়ে র্যাবের গাড়ির হুইসেল বাজতে থাকে। এভাবে ৩-৪ ঘণ্টা জঙ্গি নাটক মঞ্চস্থ করে ওই বাড়ি থেকে বের করে আমাদের সাংবাদিকদের সামনে আনা হয়। এরপর ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর আমাকে আকবর শাহ থানায় সোপর্দ করা হয়।”
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, “এর একদিন পর ৯ ডিসেম্বর কোর্টে ওঠানো হলে, কোর্ট থেকে জেলে পাঠানো হয়। জেলে থাকা অবস্থায় দুই দফায় আমাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়। তিন দিন পুলিশের হেফাজতে এবং তিন দিন র্যাবের হেফাজতে রিমান্ডে নেওয়া হয়। র্যাবের হেফাজতে রিমান্ডে থাকা অবস্থায় এএসপি রুহুল আমীন জানায়, আমাদের ডিজিএফআই তুলে এনেছে। আমার নামে মোট তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। একটি মামলা সন্ত্রাস দমন আইনে, একটি বিস্ফোরক দ্রব্য ও অস্ত্র আইনে এবং অন্যটি অস্ত্র আইনে। সম্পূর্ণ জঙ্গি নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিলেন তৎকালীন র্যাব-৭ এর সিও কর্নেল মিফতাহ। এরপর ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি আট বছর কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হই। একটি মামলায় আমি খালাস পেয়েছি, বাকি মামলাগুলো এখনো চলমান।”
“আমি আমার গুম, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা এবং কারাভোগের সঙ্গে যারা জড়িত—বিশেষ করে শেখ হাসিনা, তার সামরিক উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিকীসহ ডিজিএফআইতে তৎকালীন যারা দায়িত্বরত ছিল, তাদের সকলের বিচার চাই।”