সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন শহরে খুব একটা লোডশেডিং না হলেও গ্রামীণ এলাকায় এই সমস্যা প্রকট হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন এলাকায় দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না বলে খবর পাওয়া গেছে। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার পারকুলা গ্রামের বাসিন্দা রিংকু মিয়া স্ট্রিমকে বলেন, ‘দিনের মধ্যে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। গরমে লোডশেডিংয়ে দৈনন্দিন কাজও ঠিকভাবে করা যাচ্ছে না। বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখারও সুযোগ পাচ্ছি না।’
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। তবে বড় কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে রক্ষণাবেক্ষণ এবং গ্যাস-সংকটের কারণে কিছু কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে গত কয়েক দিন ধরে লোডশেডিং বেড়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াটে। এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট।
চলতি বছরের মে মাসে দেশে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের রেকর্ড হয়েছে। সূত্র বলছে, কয়লা ও গ্যাস-সংকট এবং কারিগরি ত্রুটির কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ঘণ্টাভিত্তিক বিদ্যুৎ চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি সপ্তাহের শুরুতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল। গত ১০ ও ১১ জুন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল যথাক্রমে ২১৮ ও ৬৩৮ মেগাওয়াট।
১৩ জুন (শনিবার) থেকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করে। ওই দিন দুপুর থেকেই লোডশেডিং এক হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়, যা রাত ১২টায় ১ হাজার ৯৭১ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। ১৪ জুন লোডশেডিংয়ের সর্বোচ্চ পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ২৬৬ মেগাওয়াটে।
গত সোমবার (১৫ জুন) বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫৫৩ মেগাওয়াট। বিপরীতে দিন সর্বোচ্চ সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৫৭৯ মেগাওয়াট। মঙ্গলবার মধ্যরাতে লোডশেডিং ৩ হাজার ২৭৫ মেগাওয়াটে গিয়ে ঠেকে। গতকাল বুধবার রাত ৯টায় দিবাগত রাত ১২টায় লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ১৫২ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সূত্র বলছে, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের ২৭৫ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতাসম্পন্ন ৩ নম্বর ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ। ফলে রংপুর অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে লোডশেডিং বেড়েছে।
এর ওপর গত ১৫ জুন বাগেরহাটের রামপাল (মৈত্রী সুপার থার্মাল) বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিটে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, ১৩ ও ১৪ জুন এই ইউনিট থেকে এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলেও ১৫ জুন ৫০০ মেগাওয়াটে নেমে আসে।
দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। পিডিবির ১৫ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধুমাত্র গ্যাস ও তরল জ্বালানির অভাবে ৪ হাজার ১২৩ মেগাওয়াট উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
গ্যাসের সংকটের কারণে সিরাজগঞ্জ ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্টের প্রথম ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ। এ ছাড়া ঘোড়াশাল, মেঘনাঘাট ও সিদ্ধিরগঞ্জের গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অধিকাংশ ইউনিট গ্যাস স্বল্পতায় সক্ষমতার অনেক নিচে উৎপাদন করছে।
কয়লা সংকটে গত কয়েক দিন চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এস এস পাওয়ার প্ল্যান্টের একটি ইউনিট বন্ধ ছিল।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, গতকাল রাত থেকে এসএস পাওয়ারের বন্ধ থাকা ইউনিটও উৎপাদনে ফিরেছে।
তিনি বলেন, দ্রুত কারিগরি সমস্যাগুলো সমাধান করে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছি। রামপালের বন্ধ ইউনিট আগামী সপ্তাহের শেষ নাগাদ চালু হতে পারে। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ার কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় মালামাল পৌঁছে গেছে, দুই-তিন দিনেই ইউনিটটি চালু হবে।
জহুরুল ইসলাম আরও বলেন, পত্রপত্রিকায় দেখছি গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। কোথায় লোডশেডিং হবে তা পলিসি লেভেলেই ঠিক হয়। আগে রাতে বিদ্যুতের চাহিদা কমত, কিন্তু এখন থ্রি হুইলার চার্জ দেওয়ায় ওই সময় চাহিদা আরও বাড়ে। লিকুইড ফুয়েল বাড়ানো ও গ্যাসের জেনারেশন বাড়ানো গেলে লোডশেডিং কমবে। কিন্তু খরচ কমানোর জন্য এটি করা হচ্ছে না।
এদিকে লোডশেডিং নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। দেশের কিছু জায়গায় লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে কর্মসূচিও পালিত হয়েছে। গতকাল বুধবার লালমনিরহাটের পাটগ্রামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়। একই দিন ক্ষুব্ধ জনতা খুলনার কয়রায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিসে ভাঙচুর করে। একই দিন সুনামগঞ্জে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে হারিকেন নিয়ে মানববন্ধন করেন গ্রাহকরা।
লোডশেডিংয়ের বিষয়ে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) বিতরণ ও পরিচালন বিভাগের দায়িত্বে থাকা সদস্য মো. শফিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা হয়েছে। তিনি ঢাকার বাইরে থাকায় এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।