মহামারি মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্য প্রস্তুতি গড়ে তোলা, আইসিইউ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা সেবা সম্প্রসারণে নেওয়া হয়েছিল ৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকার প্রকল্প। কিন্তু ছয় বছর পর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও পরিকল্পিত ১৬টি পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (পিআইসিইউ) একটিও চালু করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে ৫০টি জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপনের উদ্যোগেও চালু হয়নি কার্যকর সেবা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম সমন্বয়হীনতা, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, প্রয়োজন নির্ধারণে ত্রুটি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে হাজার কোটি টাকার এ উদ্যোগ কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের প্রতি গুরুতর অবহেলা ও জবাবদিহির অভাবের একটি বড় উদাহরণ।
‘ইমারজেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ারডনেস (ইআরপিপি)’ নামে নেওয়া এ প্রকল্পের বড় অংশের অর্থায়ন করেছিল বিশ্বব্যাংক। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় সংস্থাটি তাদের প্রতিশ্রুত অর্থের একটি অংশ ছাড় দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এ প্রকল্পে চূড়ান্ত দায়িত্বহীনতার প্রবণতা দেখা গেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৬টি পিআইসিইউ এবং ৫০টি জেলা হাসপাতালের আইসিইউ কার্যকর করা গেলে বর্তমানে হাম, নিউমোনিয়া কিংবা অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসংকট অনেকাংশে মোকাবিলা করা সম্ভব হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘নতুন সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছে চাইলে এ অর্থায়ন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে তারা মানুষের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে, রোগ প্রতিরোধে নির্দিষ্ট প্রকল্প করে এ অর্থায়ন কাজে লাগাতে পারে।’
প্রকল্পের আওতায় আরও বিভিন্ন পরিকল্পনার পাশাপাশি দেশের ১৪টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে বিদ্যমান কাঠামোর বাইরে পৃথকভাবে ১৬টি পিআইসিইউ স্থাপনের কথা ছিল। এসব ইউনিটে সংকটাপন্ন শিশুদের উন্নত চিকিৎসার পরিকল্পনা ছিল। হাম, নিউমোনিয়া, জটিল সংক্রমণ, জন্মগত রোগ এবং অন্যান্য গুরুতর অসুস্থতায় আক্রান্ত শিশুদের জীবন রক্ষায় এ ইউনিটগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত বলে উল্লেখ ছিল প্রকল্পে।
কিন্তু আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রকল্প শেষ হলেও একটি পিআইসিইউও চালু করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও শিশুরা সেই কাক্সিক্ষত সেবা পায়নি। শুধু পিআইসিইউ নয়, দেশের ৫০টি জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপনের পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি। কোথাও ভবন নির্মাণ শেষ হয়নি, কোথাও যন্ত্রপাতি স্থাপন হয়নি, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় সেবা চালু করা যায়নি। প্রকল্প অফিস ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়হীনতায় স্থবির হয়ে পড়ে কাজ। আইএমইডির প্রতিবেদনে প্রকল্প ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সমন্বয়হীনতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকল্পের অধীনে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনার দায়িত্ব ছিল প্রকল্প অফিসের ওপর। যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্ব ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তরের ওপর। কিন্তু এ দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে কাজের অগ্রগতি থমকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি কেনার পরিকল্পনা থাকলেও স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত হয়নি।
আবার কোথাও অবকাঠামো প্রস্তুতির কাজ শুরুই হয়নি। ফলে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতা ও অচলাবস্থার মধ্যে পড়ে। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালকদের ঘন ঘন পরিবর্তনও বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নেতৃত্বে ধারাবাহিকতার অভাব এবং প্রকল্পের প্রকৃত প্রয়োজন নির্ধারণে ত্রুটির কারণে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়। প্রকল্পের অনেক কার্যক্রম বাস্তব চাহিদা বিবেচনা না করেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে বাস্তবায়নের সময় নানান জটিলতা তৈরি হয়। সূত্র জানান, বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন স্থগিত করার পেছনে শুধু ধীরগতি নয়, বরং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং অনিয়মের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেয়। পরে ‘পঞ্চম স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচি’র আওতায় অসমাপ্ত কাজ শেষ করার পরিকল্পনা করা হলেও কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি।
দেশে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুরুতর অসুস্থ শিশুদের জন্য দেশে পিআইসিইউ সুবিধা অত্যন্ত সীমিত। সরকারি হাসপাতালে আসনসংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগী ভর্তি করানো সম্ভব হয় না। পর্যাপ্ত নিবিড় পরিচর্যা সুবিধা না থাকায় অনেক অভিভাবক সন্তানকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে বাধ্য হচ্ছেন। চিকিৎসা পেতে দেরি হওয়ায় অনেক শিশুর অবস্থার অবনতি ঘটছে, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।