দেশজুড়ে প্রতি বছর লাগানো হচ্ছে কোটি কোটি গাছ। এর পেছনে শত শত কোটি টাকা ব্যয়। কিন্তু গাছের সেই হিসাব শুধু কাগজেই আছে, স্যাটেলাইট ইমেজে মিলছে না সবুজের দেখা। উল্টো গত ২৫ বছরে বাংলাদেশ হারিয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা। প্রশ্ন উঠেছে, ঢাকঢোল পিটিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয়ে লাগানো কোটি কোটি গাছ কোথায় গেল? বর্তমান সরকার দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে। বিগত সরকারগুলোর আমলেও নিয়মিত বাস্তবায়ন হয়েছে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। অথচ সাম্প্রতিক স্যাটেলাইটভিত্তিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশের অধিকাংশ জেলায় এখনো বৃক্ষ আচ্ছাদন ৩০ শতাংশের নিচে। বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠানের (স্পারসো) চলমান জাতীয় বৃক্ষ আচ্ছাদন জরিপে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি বাদে ৫৯ জেলার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। খসড়া ফলাফলে দেখা গেছে, শুধু পিরোজপুর ও বাগেরহাটের বৃক্ষ আচ্ছাদন ৫০-৬০ শতাংশ, তা-ও সুন্দরবনের কারণে। মাত্র পাঁচটি জেলার বৃক্ষ আচ্ছাদন ৪০-৫০ শতাংশ। বিপরীতে ৩৫টিরও বেশি জেলার বৃক্ষ আচ্ছাদন ৩০ শতাংশের নিচে। সুনামগঞ্জে বৃক্ষ আচ্ছাদন ১০ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ কাগজে যত গাছের হিসাব, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না দেশের সবুজ মানচিত্রে।
স্পারসোর সদস্য (প্রযুক্তি) ড. মো. মাহমুদুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২০২৪ সালের স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচটি জেলার কাজ চলছে। শেষ হলে পুরো দেশের চিত্র পাওয়া যাবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ (জিএফডব্লিউ) হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০০১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলে (প্রায় ৯৪%)।
পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রকল্পের টাকা খরচ করার জন্য গাছ লাগানো হয়। পরে অযত্নে অধিকাংশ গাছ মারা যায়। বন অধিদপ্তরের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, শুধু কয়েকটি বনায়ন ও সবুজায়ন প্রকল্পেই ব্যয়ের পরিমাণ ১৫০ কোটির বেশি। এর বাইরে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে একাধিক সবুজায়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। চলতি অর্থবছরে কৃষকদের মাঝে চারা বিতরণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর, কৃষি মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রেলওয়ে, বিআইডব্লিউটিএ, জেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পাশাপাশি অনেক বেসরকারি সংস্থাও নিয়মিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বনায়ন কার্যক্রমে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। তবে এর সুফল দৃশ্যমান হচ্ছে না। পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন সেভারসের প্রতিষ্ঠাতা এহসান রনি বলেন, গাছ লাগানো এখন একটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। তিনি জানান, গত বছর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের লেকপাড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ গাছ লাগানো হয়েছিল। গাছগুলো রক্ষার জন্য তিনি সিটি করপোরেশনকে বেড়া দেওয়ার অনুরোধ করলে তাকে জানানো হয়, গাছ লাগানোর প্রকল্পে বেড়ার কোনো বরাদ্দ নেই। পরে বেড়া দেওয়া হবে। এখন বড়জোর ৫০ থেকে ১০০টি গাছ টিকে আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বড় বড় গাছ কাটা হচ্ছে।
বিতর্ক এড়াতে আগে গাছের শিকড় কেটে গাছ মারা হয়, পরে সেটা কাটা হয়। প্রকল্প শেষে চারা লাগানোর প্রকল্প গ্রহণ করে। অথচ একটা গাছের চারা লাগালে তা থেকে পরিপূর্ণ সুফল পেতে বহু বছর লাগে। পরিবেশবিদদের মতে, বনায়নের প্রকৃত সাফল্য পরিমাপের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো স্যাটেলাইটভিত্তিক বৃক্ষ আচ্ছাদন বিশ্লেষণ। কারণ, মাঠপর্যায়ে কোটি কোটি চারা রোপণের হিসাব দেওয়া সম্ভব হলেও স্যাটেলাইটের কাছে কোনো কাগুজে হিসাব চলে না। সেখানে দেখা যায় শেষ পর্যন্ত একটি এলাকার সবুজ আচ্ছাদন বাড়ল নাকি কমল। স্পারসোর সর্বশেষ জরিপ সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। কোটি কোটি গাছ লাগানোর দাবি এবং শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও দেশের অধিকাংশ জেলার বৃক্ষ আচ্ছাদন এখনো ৩০ শতাংশের নিচে। প্রশ্ন উঠেছে-এত গাছ লাগানোর পরও সবুজ বাড়ছে না কেন? কোটি কোটি কাগুজে গাছের কতগুলো বেঁচে আছে?