আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কড়াকড়ি উপেক্ষা করে মাথাচাড়া দিচ্ছে সুন্দরবনের দস্যুরা। বর্তমানে সাতটি দস্যু দল পৃথক এলাকায় আনুমানিক দুই শতাধিক সদস্য নিয়ে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট একটি গোয়েন্দা দলের তথ্যের ভিত্তিতে সরেজমিন অনুসন্ধানে দস্যুদের তৎপরতার প্রমাণ পেয়েছে যুগান্তর।
প্রায় প্রতিদিনই দস্যুদের কাছে জিম্মির হচ্ছেন স্থানীয়রা। কখনো আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে, আবার কখনো ধারালো অস্ত্র গলায় ঠেকিয়ে তুলে নেওয়া হচ্ছে তাদের। মাছ ধরার নৌকা ছোট খালে প্রবেশ করলে কিংবা বনজীবী মৌয়ালরা বনে গেলে পড়তে হচ্ছে দস্যুতার থাবায়। জীবন বাঁচাতে দস্যুবাহিনীকে মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হচ্ছে অপহরণের শিকার ব্যক্তির পরিবার। এক্ষেত্রে প্রশাসনের কাছে কেউ ভয়ে অভিযোগও করছে না।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনে সক্রিয় রয়েছে-করিম শরীফ বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী, দয়াল বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, নানা ভাই ওরফে ডন বাহিনী, কাজল মুন্না ওরফে জোনাব বাহিনী। এই জোনাব বাহিনীর প্রধান কাজল মুন্না বর্তমানে ভারতে অবস্থান করলেও তার দলের লোকজন ঠিকই তৎপর রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, করিম বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে, জিওধারা, তাম্বুলবুনিয়া, শেলা নদী, চড়পুটিয়া, ধানসিঁড়ির চড়, শরণখোলা ও এর আশপাশের এলাকা। কাজল মুন্না বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে-১৮ বেকি, খোবড়াখালী, মাউন্দে নদী, কাচিখাটা নদী, নুচখালী খাল, বৈকারি নদী ও কৈখালীর শ্যামনগর এলাকা।
দুলাভাই বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে তেঁতুলতলার চর, কলমিলতার খাল, মুরলী খাল, খাশিটানা খাল, ডাকাতিয়া খাল ও আন্দারমানিক খাল এলাকা। দয়াল বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে-বড়লক্ষ্মী, মালঞ্চ, ফিরিঙ্গী নদী, দোবেকি, জোড়া বয়সিং হরিণগর, মান্দারবাড়ি, পুষ্পকাঠি, জলঘাটা, মেঘনা খাল ও কলাগাছিয়া এলাকা। বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে-মুড়লি খাল, কুঞ্চে খাল, কাগাদোবেকী ও পাটকোস্টা এলাকা। ছোট খাজুরা এলাকা এবং রামপালের শ্রীফলতলা দক্ষিণপাড়া এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী।
আর নানা ভাই ওরফে ডন বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে-মালঞ্চ নদী, চুনকুড়ি নদী, চালতেবেড়ি ও সুবদে খাল সংলগ্ন এলাকা। এছাড়াও রায় নদী, খাশিটানা খাল, সোনামুখী খাল, দুম্বাখালী খাল এলাকাসহ সুন্দরবন জুড়েই রয়েছে বিভিন্ন বাহিনীর তৎপরতা। এসব বাহিনীর সদস্যরা বেশিরভাগই একনলা ও দুইনলা বন্দুক ব্যবহার করে। তবে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে, বাহিনীর কারও কারও কাছে বিশেষ করে দলনেতাদের কাছে মরণঘাতি অত্যাধুনিক অস্ত্রও থাকতে পারে।
সূত্র বলছে, যেসব দস্যুবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল তাদের অনেকেই পুনর্বাসন দুর্বলতায় নতুন করে দস্যুতায় ফেরায় পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। যদিও সম্প্রতি একটি গ্রুপ পুনরায় আত্মসমর্পণ করেছে। তবে আত্মসমর্পণ করা অনেক দস্যুবাহিনীর কাছে আত্মরক্ষার কৌশল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এছাড়াও এসব দস্যু দল মৎস্যজীবী ও বনজীবীদের দেখলেই তাড়া করছে। অনেককে জিম্মি করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করা হয়। দুর্গম এলাকায় অবস্থান করায় এদের আইনের আওতায় আনতে অনেকটাই হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ঘন জঙ্গলের রাস্তা না চেনা, বনের ভেতরে নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা কাজ না করা, দস্যু দলের হাতে কি ধরনের অস্ত্র আছে সেটির আগাম তথ্য না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে তারা।
শুক্র ও শনিবার সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে-এখন মাছ ধরায় ৩ মাসের নিষেধাজ্ঞা চলায় সুন্দরবনের জেলেরা সেভাবে মাছ ধরতে যান না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে অনেকেই দস্যু দলের হাতে জিম্মি হতে হয়েছেন। আবার অনেকেই তাড়া খেয়ে প্রাণে বেঁচেছেন।
গত সপ্তাহে শরণখোলার কটকা অভ্যয়ারণ্য এলাকায় বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর তাড়া খাওয়া এক ব্যক্তি বলেন-অস্ত্র হাতে বাহিনীটির সদস্যরা কয়েকজন তাদের তাড়া করে। কিন্তু ধরতে পারেনি। ভয়ে আমরা ছোট খালগুলোতে তেমন প্রবেশ করি না। অপর এক ব্যক্তি জানান, প্রতি ডাকাত দলে ১২-১৫ জন থাকে। সবার হাতেই থাকে অস্ত্র। আমরা প্রশাসনকে কিছু বলি না। কারণ তথ্য দেওয়ার খবর জানলে পরবর্তীকালে আরও বেশি বিপদের মুখোমুখি হতে হয়। ওই ব্যক্তি আরও বলেন, বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত চাঁদাও তোলে। এক্ষেত্রে কার কত টাকা চাঁদা দিতে হবে সেটি আগেই বলে যায় তাদের সদস্যরা।
সুন্দরবনের দস্যুদের মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন এবং অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। বাহিনীর তথ্যমতে-১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সুন্দরবনে পরিচালিত অভিযানে ৪২টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ রাউন্ড গুলি, ২৫০ রাউন্ড কার্তুজ, ৯৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগানের গুলি, একটি ককটেল, একটি টেলিস্কোপ এবং দুটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ৩৯ জন বনদস্যু ও জলদস্যুকে আটক করা হয়েছে। তাদের কবল থেকে ৪১ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
বাহিনীটি জানিয়েছে, সুন্দরবনে ইলিশ ধরার মৌসুম, মাছ আহরণ মৌসুম এবং মধু সংগ্রহের সময় দস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এসব সময়ে বিপুলসংখ্যক জেলে, মৌয়াল ও বনজীবী সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। তাদের লক্ষ্য করেই অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও চাঁদাবাজির পরিকল্পনা করে দস্যুরা। বর্তমানে সরকার ঘোষিত তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বনজীবীদের প্রবেশ সীমিত রয়েছে। ফলে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও কমে এসেছে। মৌসুম শুরু হলে দস্যুরা আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। তবে কোস্ট গার্ডের তৎপরতার কারণে দস্যুরা এখন আগের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। তাদের চলাচল, অস্ত্র সরবরাহ, অর্থ সংগ্রহ এবং সংগঠন পরিচালনার সক্ষমতা কমে এসেছে।
কোস্ট গার্ডের পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম বলেন, কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযানের কারণে দস্যুরা এখন আগের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। তাদের চলাচল, অস্ত্র সরবরাহ, অর্থ সংগ্রহ এবং সংগঠন পরিচালনার সক্ষমতা কমে এসেছে। আমাদের কঠোর নজরদারি কারণেই ছোট সুমন বাহিনীর প্রধান সুমন হাওলাদার ও তার সহযোগীরা সম্প্রতি আত্মসমর্পণ করেছে।