Image description
তিন দলের ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশের রাজনীতিতে স্বস্তি ফিরে আসেনি। বরং আধিপত্য বিস্তারসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে ‘বৈরিতা’ দেখা যাচ্ছে। আর তিনটি দলের এই বিরোধ বা অনৈক্যের সুযোগ নিতে চাইছে রাজনীতির মাঠ থেকে ছিটকে পড়া দল আওয়ামী লীগ। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচন থেকে বাইরে এবং সাংগঠনিকভাবে এলোমেলো অবস্থায় থাকলেও দলটি একটি সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করছে। উদ্দেশ্য হলো-ওই সুযোগে তারা যাতে দেশে ঢুকে পড়ে রাজনীতির মাঠ দখল করতে পারে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়েও নেপথ্যে থেকে নানা ইস্যুকে উসকে দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগ। তবে শেষ পর্যন্ত তারা ব্যর্থ হয়েছে।

নানা সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, এরপর দলটির প্রত্যাশা ছিল, কোনো-না-কোনোভাবে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। কিন্তু অধ্যাদেশ জারি করে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি দলটি। নির্বাচনের পর দলটির প্রত্যাশা ছিল, ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার অন্তত তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ সংসদে পাশ করে আইনে পরিণত করায় রাজনীতিতে ফেরার আশা দলটির আরও কমে যায়। সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এসব কারণে তারা এখন বিএনপি সরকারের ব্যর্থতা দেখতে আগ্রহী। পাশাপাশি তারা চায়, তিন দলের মধ্যে বিরোধের সূত্র ধরে একটা গোলাযোগ তৈরি হোক। কারণ, এমন গোলযোগ বা সংঘাতের সুযোগে তারা দেশের ঢুকে পড়তে পারবে বলে মনে করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলামের মতে, জুলাই মুভমেন্টে যারা ছিল, তাদের মধ্যে যখন ফাটল দেখা দেবে, তখনই তৃতীয় কোনো দল কিংবা আওয়ামী লীগ সুযোগটা নেবে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন জায়গায় মাঝেমধ্যে আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিং হচ্ছে। এটা বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির ঐক্যের ফাটলের অংশ। তাই জাতীয় স্বার্থে দলগুলোকে পরস্পরবিরোধী অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সংবিধান সংস্কারসহও বিভিন্ন ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে ঐকমত্যের অভাব দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরুণদের প্রতিনিধিত্বকারী দল এনসিপি। বিভিন্ন ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরেই দলগুলোর মধ্যে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং বিগত সরকারের আমলানির্ভর সিন্ডিকেট ভাঙার মতো মৌলিক ইস্যুতে দলগুলো একক সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। বরং বিভিন্ন সভা-সমাবেশে একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা অব্যাহত রেখেছে। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক ঐক্য থাকলেও অনেক ইস্যুতে এ দল দুটির মধ্যেও ভিন্নমত রয়েছে।

এদিকে রাজনৈতিক দল হিসাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ বর্তমানে মাঠের রাজনীতিতে পুরোপুরি কোণঠাসা। তবে দলটির একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ‘চোরাগুপ্তা’ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যবর্তী বিরোধকে আরও উসকে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। এমনকি রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায়ই দলটির নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল করতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলার মতো সাহসও দেখাচ্ছেন তারা।

কয়েকদিন আগে নোয়াখালীতে বড় একটি ঝটিকা মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ। ৭ জুন কুমিল্লার সদর দক্ষিণ এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মীরা ঝটিকা মিছিল বের করেন। একই সময়ে ঝিনাইদহ ও ময়মনসিংহের ভালুকায় ঝটিকা মিছিল করেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এছাড়া ৩ জুন গোপালগঞ্জ ও পটুয়াখালীতে এবং ৬ জুন চট্টগ্রামে তাদের মিছিল করার খবর পাওয়া যায়।

তবে এসব কর্মকাণ্ডের জন্য জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে‌ একটি ইসলামিক দলের রাজনীতিকে দায়ী করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ওই দলটির বর্তমান আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল একসময় জাসদ করতেন, যা মূলত আওয়ামী লীগেরই অংশ। ফলে ইসলামের নাম নিলেও তারা ভেতরে-ভেতরে পুরোনো আওয়ামী লীগেরই উত্তরাধিকার বহন করছেন। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করার আহ্বান জানিয়ে আলাল বলেন, যুক্তিহীন বিরোধিতার নেতিবাচক রাজনীতি ১৯৭২-৭৫ সাল থেকে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা করে এসেছে, যা বর্তমান সময়ে আর কারও কাছ থেকেই কাম্য নয়।

বিএনপির সঙ্গে বৈরিতার বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের মতে, আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করা আর বর্তমান সরকারের সমালোচনা করা এক জিনিস নয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের জন্য গণ-অভ্যুত্থানে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিএনপি এখন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সেই আওয়ামী লীগকেই রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। ফলে এর বিরোধিতা আমাদের করতেই হবে। তিনি বলেন, বিএনপি দেশের কল্যাণ চাইলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই চরম অবনতি হতো না। দেশের এই নাজুক অবস্থায় তাদের ভূমিকা রহস্যজনকভাবে নিষ্ক্রিয়। আযাদ বলেন, আমরা সবাইকে নিয়ে দেশ পুনর্গঠনের আহ্বান জানালেও বর্তমান সরকার সঠিক পথে হাঁটছে না।

এনসিপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মনিরা শারমিন যুগান্তরকে বলেন, ‘এনসিপি, জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে বৈরিতা চলমান থাকলে নিশ্চয়ই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সুযোগ নেবে এবং নিচ্ছেও। দলগুলোর মধ্যে বিভেদ এবং খোদ জাতীয় সংসদে একে অপরের বিরুদ্ধে যে বক্তব্য উঠে আসছে, তাতে আওয়ামী লীগ ফেরার শক্তি পাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আসছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার তথা বিএনপি আওয়ামী লীগকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে জয়ের স্বপ্ন দেখছে। আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকলেও দল হিসাবে নিষিদ্ধ হয়নি।’ প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ কি হাসিনা? আওয়ামী লীগ তো একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে বর্বরতা চালিয়েছে, সুতরাং অপরাধ দল হিসাবে করেছে। দলকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে। দেশের সবকটি রাজনৈতিক দলকে ঐক্য হতে হবে। তবে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে বিএনপিকে।