Image description
২০০৫ সালেই সুপারিশ, এখনো সেখানেই আটকা ২১ বছর ধরে ‘সরছে’ ঢাকার ৪ বাস টার্মিনাল ২০০৫-২০২৫ এসটিপিতে ছিল পরিকল্পনা ২০১০ সালে হয় অনুমোদন

গল্পের শুরু ২০০৫ সালে। তখন রাজধানী ঢাকার যানজট কমানোর উপায় খুঁজতে গিয়ে প্রথম আলোচনায় আসে একটি ধারণা— রাজধানীর ভেতর থেকে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সরিয়ে শহরের বাইরে নেওয়া হবে। উদ্দেশ্য ছিল সহজ— দূরপাল্লার বাসগুলো যেন আর ঢাকার কেন্দ্রস্থলে ঢুকে শহরের সড়কগুলোকে অচল করে না দেয়।

এরপর কেটে গেছে ২১ বছর। এই সময়ে দেশে সরকার বদলেছে বারবার। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার বিদায় নিয়েছে, এসেছে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তারপর আওয়ামী লীগ টানা তিন মেয়াদ ক্ষমতায় থেকেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্ব নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। চক্র ঘুরে আবারও বিএনপি সরকারে এসেছে। কিন্তু গাবতলী, মহাখালী, গুলিস্তান (ফুলবাড়িয়া) ও সায়েদাবাদ— এই চার বাস টার্মিনাল রয়ে গেছে নিজেদের পুরনো ঠিকানাতেই।

বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফুলবাড়িয়া ও গুলিস্তান বাস টার্মিনাল যাবে কেরানীগঞ্জে। গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের নতুন ঠিকানা হবে হেমায়েতপুর। সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী টার্মিনাল স্থানান্তরিত হবে কাঁচপুরে। আর মহাখালী বাস টার্মিনাল আপাতত পূর্বাচলে গেলেও স্থায়ীভাবে নেওয়া হবে টঙ্গীর কাছাকাছি এলাকায়। কিন্তু অদ্ভুত এক নিয়তির মতো টার্মিনালগুলো বছরের পর বছর ধরে শুধু ‘সরছে’; গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভাব, ঢাকা নগর পরিবহনের ব্যর্থতা, পরিবহন মালিকদের সঙ্গে সরকারের কুলিয়ে উঠতে না পারা, জমি অধিগ্রহণ করতে না পারাসহ বেশ কয়েকটি কারণে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ পাচ্ছে না। আবার এই কাজের সঙ্গে সড়ক পরিবহন বিভাগ ও স্থানীয় সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠান জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠানের নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেও বারবার হোঁচট খেয়েছে কাজের গতি।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আবারও বিষয়টি সামনে এনেছেন। সচিবালয়ে ঢাকার যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন-সংক্রান্ত এক সভায় তিনি চারটি বাস টার্মিনাল দ্রুত স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ফলে পুরনো প্রশ্নটি আবারও ফিরে এসেছে— এবার কি সত্যিই সরবে টার্মিনালগুলো, নাকি নতুন ঘোষণার সঙ্গে পুরনো ফাইলের স্তূপ আরও একটু উঁচু হবে?

কাজটি করবে সরকারের প্রতিষ্ঠান ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। যুগ্ম সচিব আবদুল লতিফ খান ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালকের (ম্যাস ট্রানজিট) দায়িত্বে রয়েছেন। তার কাছে প্রশ্ন ছিল— কীভাবে কাজ এগোচ্ছে? জবাবে তিনি বললেন, ‘অনেক দিন ধরেই এই কাজটা চলছে। বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের ভাবনায় কাঁচপুরে জমি নিয়ে সেটি ডেভেলপ করা হয়েছে। বাকিগুলোর জন্য এখনো কোনো জায়গা নির্ধারণ করা যায়নি।’

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, রাজধানীর কেন্দ্রে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থাকার কারণে প্রতিদিন হাজারো দূরপাল্লার বাস শহরের ভেতরে প্রবেশ করে। এতে সড়কের সক্ষমতা কমে যায়, যানজট বাড়ে এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা জটিল হয়ে ওঠে। তাদের পরামর্শ, ঢাকার চারপাশে আধুনিক আঞ্চলিক টার্মিনাল গড়ে তুলে সেখানে মেট্রোরেল, বিআরটি, সিটি বাস ও পার্ক-অ্যান্ড-রাইড সুবিধা যুক্ত করা গেলে নগর পরিবহনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, পরিকল্পনার ইতিহাস যত দীর্ঘ, বাস্তবায়নের গল্প ততটাই সংক্ষিপ্ত। ২০০৫ সালে যখন এটি আলোচনায় আসে, তখন জাইকার সহায়তায় প্রণীত স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) ২০০৫-২০২৫-এ ঢাকার বাইরে আঞ্চলিক বাস টার্মিনাল তৈরির সুপারিশ করা হয়েছিল। ২০১০ সালে পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত হয়। পরে সংশোধিত আরএসটিপি, বাস রুট রেশনালাইজেশন কর্মসূচি এবং ২০২১ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও একই সুপারিশ করেছে। সমীক্ষায় গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদকে রাজধানীর যানজটের অন্যতম বড় উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিটি পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত আরেকটি প্রতিবেদনে পরিণত হয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব সতর্ক করে বলেছেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে সমন্বিতভাবে। মহাখালী থেকে টার্মিনাল সরিয়ে পূর্বাচলে নেওয়া হলে যাত্রীদের সহজে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় একটি সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে আরেকটি নতুন সমস্যা তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেছেন, ‘ট্যানারির আবর্জনা থেকে হাজারীবাগ বেঁচেছে, কিন্তু সাভার নষ্ট হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার মতো একটি নদীকে বাঁচিয়ে আরেকটি নদী মেরে ফেললে তো লাভ হলো না। মহাখালী বাঁচাতে গিয়ে যেন পূর্বাচলকে না মারি।’

একই মত যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামানের। তার ভাষায়, ঢাকার মানুষ গত দুই দশকে অন্তত একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে শিখেছে— বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের ঘোষণা শুনে খুব বেশি অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এই শহরে কিছু প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয় গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য নয়; বরং ‘শিগগির বাস্তবায়ন হবে’— এই আশ্বাসের টার্মিনালে দীর্ঘদিন দাঁড়িয়ে থাকার জন্য।