Image description
লাইসেন্স বাতিল ভুল নয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী দায়ীদের আইনি ব্যবস্থায় কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দরকার হাসপাতালের আইসিইউতে এখনো ৪৫ রোগী

কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় বাতিল হয়েছে মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি, বেসরকারি ওই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে কোনো ভুল করেনি সরকার। অবশ্য সরকারের এ সিদ্ধান্তে অসুবিধায় পড়েছেন কম আয়ের রোগী ও তাদের স্বজনরা। আর জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যেসব ঘাটতির কারণে লাইসেন্স বাতিল হয়েছে, সেগুলো পূরণ করে হাসপাতালটিকে পুনরায় স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ দেওয়া দরকার।

গত ২৭ মে, কোরবানির ঈদের আগের দিন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে অক্সিজেনের ঘাটতিতে সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে মারা যায় ছয় নবজাতক। ওই ঘটনার তদন্তে নেমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির প্রমাণ পায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর বাতিল করা হয় হাসপাতালটির লাইসেন্স। 

এরপর থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আসছে বিভিন্ন মহল থেকে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। যাদের অবহেলায় শিশুদের প্রাণ ঝরল, তাদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দরকার। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের যে ঘাটতির কারণে লাইসেন্স বাতিল হয়েছে, তা চিহ্নিত করে ঠিক করার পর হাসপাতালটি ফের চালুর সুযোগও দেওয়া দরকার বলে মত তাদের।

তবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘প্রথমে আমরা লাইসেন্স বাতিল করেছি। আমি মনে করি, আমি কোনো ভুল করিনি। ছয় শিশুকে অবহেলায় মারা যেতে দেওয়া হবে, আর কর্তৃপক্ষ শান্তিতে থাকবে, এটা হতে পারে না।’

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম চিকিৎসা-সংক্রান্ত ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব বলার পাশাপাশি মন্ত্রী দিলেন হুঁশিয়ারিও। বললেন, ‘সরকারের নির্দেশনা ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কেউ পার পাবে না। অনিয়ম ও অবহেলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অবশ্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেছেন, বিষয়টির আইনগত সমাধান দরকার। একটি শিশু মারা গেলে হয়তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারত; কিন্তু ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষমা চেয়ে বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে সমাধান হতে পারে না। আবার স্থায়ীভাবে লাইসেন্স বাতিল হলে অনেক রোগীর চিকিৎসার সুযোগ কমে যাবে।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেছেন, হাসপাতালটিতে ছয় শিশুর মৃত্যুর পর বৈজ্ঞানিকভাবে পরিবেশগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি, আবেগজনিত কারণে শিশুদের ময়নাতদন্ত হয়নি। ফলে শিশুদের মৃত্যুর সঠিক কারণ উঠে আসবে কি না— এ বিষয়ে সন্দিহান এই বিশেষজ্ঞ। তাই সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি হাসপাতালে নিয়মিত তদারকির তাগিদ দিলেন তিনি।

হাসপাতালে এখনো ৪৫ রোগী

গত ১১ জুন আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটির লাইসেন্স বন্ধ করে সরকার। এর তিন দিনের মধ্যে রোগীদের অন্য হাসপাতালে সরিয়ে নিতে বলা হয়। এরপর থেকেই হাসপাতাল থেকে রোগীরা অন্য হাসপাতালে চলে যেতে শুরু করেন। তবে শারীরিক জটিলতা ও আর্থিক কারণে অনেক রোগী যেতে চাচ্ছিলেন না। গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ৪৫ জন রোগী ছিলেন। রোগীর স্বজনদের অনেকে কী কারণে হাসপাতাল বন্ধ হচ্ছে, তা-ও জানেন না।

মুমূর্ষু এসব রোগীর কারও শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত অবনতির দিকে। কেউ কেউ ভেন্টিলেশনে আছেন। কারও কারও সামর্থ্য নেই অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা চালানোর।

রোগীর স্বজনরা বলেছেন, হাসপাতালের দোষ জানেন না তারা। তারা কম খরচে রোগীর চিকিৎসা করাতে চান। সরকার হাসপাতাল বন্ধ না করে অন্য কোনো উপায়ে শাস্তি দেবে— এমন প্রত্যাশা তাদের।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলেছেন, দেশে চাহিদার তুলনায় হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা অনেক কম। সেখানে ৭০০ শয্যার একটি হাসপাতাল বন্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন রোগীরা। আইনের মাধ্যমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের শাস্তি হোক, তাদের জবাবদিহি দরকার। তার মতে, হাসপাতাল বন্ধ সমাধান হতে পারে না।

হাসপাতালটির মানবসম্পদ বিভাগ ও কোম্পানি অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল আগামীর সময়কে বলেছেন, গতকাল হাসপাতালের জরুরি সেবা অব্যাহত রাখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে অবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব অসংগতি উঠে এসেছে, শুরু হয়েছে তা সংস্কারের কাজ।

তারিকুল ইসলাম মুকুলের আশা, সংস্কার কাজ শেষ হলে সরকার হাসপাতালটির লাইসেন্স ফিরিয়ে দেবে, যাতে রোগীদের সেবা অব্যাহত থাকে।

নির্বাহী পরিচালকের অব্যাহতি

এদিকে চলমান আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়েছেন আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শেখ মহিউদ্দিন। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, অধ্যাপক জামালুন্নেসাকে নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব দিয়েছে ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদ।

স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়নে কমিটি গঠন

দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ গঠন করেছে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি।

গত ৮ জুন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকদের উপস্থিতিতে ইন্টার্ন চিকিৎসক এবং পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভার যৌথ বিবৃতির আলোকে গঠিত হয় ওই কমিটি। কমিটিকে আগামী ২০ কর্মদিবসের মধ্যে আইনের খসড়া প্রস্তুত করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে জমা দিতে বলা হয়েছে।

কমিটির কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনের খসড়া প্রণয়ন, প্রয়োজন অনুযায়ী সদস্য কো-অপ্ট করা এবং বিভিন্ন সংস্থা ও অংশীজনের মতামত গ্রহণ করা।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণীত হলে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায় একটি সুসংহত আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা পাবে।