ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইবরাহিমের আমন্ত্রণে আগামী ২১ জুন দেশটিতে সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের এটিই প্রথম বিদেশ সফর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দুদিনব্যাপী মালয়েশিয়া সফরকে কেন্দ্র করে বন্ধ শ্রমবাজারের পর্দা উঠতে পারে। সাত লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী কঠোর পরিশ্রম করে দেশটির আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন এবং প্রচুর রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছেন। একাধিক জনশক্তি রফতানিকারক এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক প্রথম বিদেশ সফরে কোন দেশে যাবেন, তা নিয়ে গত তিন মাস নানা আলোচনা চলছিল। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং এই অঞ্চলের প্রধান শক্তিগুলোর সাথে একটি সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল হিসেবে সরকারপ্রধান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ায় প্রথম সফর বেছে নিলেন। কুয়ালালামপুর থেকে সরাসরি তিনি যাবেন চীনে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারেক রহমান আগামী ২১ থেকে ২২ জুন কুয়ালালামপুর সফর করবেন। এরপর ২৩ থেকে ২৬ জুন সরকারপ্রধানের চীন সফরের দিনক্ষণ ঠিক করা আছে। প্রধানমন্ত্রী কুয়ালালামপুর থেকে সরাসরি বেইজিং যাবেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়ার সফরের বড় একটি উপলক্ষ হতে পারে শ্রমবাজার চালুর বিষয়টি। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে এখনো কোনো খবর জানা নেই। তবে দেশটিতে প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে এটি হতেও পারে। শিগগিরই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী বলেছিলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য মালয়েশিয়া সফর প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে আলোচনা চলছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত তথ্য তার কাছে নেই। তবে চলমান প্রক্রিয়া দ্রুতই পরিষ্কার হবে এবং সংশ্লিষ্ট কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তির বাজার বন্ধ বাংলাদেশের। ওই বছর মালয়েশিয়ার সরকার ঘোষণা করেছিল, আগে থেকে অনুমোদন পাওয়া বাংলাদেশের কর্মীদের ৩১ মের মধ্যে দেশটিতে যেতে হবে। এরপর কর্মী ভিসায় আর কেউ সেখানে ঢুকতে পারবেন না। ওই তারিখের পর থেকে আর কোনো কর্মী যেতে পারেননি দেশটিতে। এরপর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দফায় দফায় চেষ্টা করেও এই শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
বিএনপি সরকার গঠনের পর গুরুত্বপূর্ণ এই জনশক্তি বাজার আবার উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গত এপ্রিলে মালয়েশিয়া সফর করেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ও উপদেষ্টা দ্রুতই বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজারটি খোলার কথা বলে আসছেন। বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রথমবার বন্ধ হয় ২০০৮ সালে। এরপর ২০১৬ সালে শ্রমবাজারটি আবার খোলা হলেও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে ২০১৮ সালে ফের বন্ধ করে দেয়া হয়। তারপর ২০২২ সালে বাজারটি আবার খুললেও ২০২৪ সালে আবারো বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৮ এবং ২০২২ সালে সই করা সমঝোতায় স্মারকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কাজে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৩১ মে বন্ধ হওয়া দেশটির শ্রমবাজার এখনো বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য খোলেনি। দুই বছর বন্ধ থাকার পর আবার শ্রমবাজার খোলার বিষয়টি আশার আলো দেখালেও রিক্রুটিং এজেন্সি ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চললে আবারো পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হতে পারে। কারণ, ওই চুক্তিতে যোগ্য এজেন্সি বেছে নেয়ার ক্ষমতা মালয়েশিয়াকে দেয়া হয়েছিল। এটি হলে অতীতের সেই বিতর্কিত সিন্ডিকেট ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি হবে।
২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশকে একটি চিঠি দেয়। তাতে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্তের ভিত্তিতে কর্মী পাঠাতে সক্ষম রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তালিকা চাওয়া হয়। পরে মালয়েশিয়াকে অন্তত তিনটি শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ। এই শর্তগুলো হলোÑ গত পাঁচ বছরে অন্তত তিন হাজার প্রবাসী কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকা ও তিন বছর ধরে অন্তত ১০ হাজার বর্গফুটের একটি স্থায়ী অফিস স্পেস থাকা। বাকি শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ অন্তত পাঁচ বছরের বৈধ লাইসেন্স থাকা, কমপক্ষে তিনটি দেশে কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, গুড কন্ডাক্ট সার্টিফিকেট ও বলপূর্বক শ্রম বা মানবপাচারে জড়িত থাকার কোনো রেকর্ড না থাকা। বাংলাদেশে আড়াই হাজার এজেন্সি সরকারি নিয়ম-কানুন মেনে লাইসেন্স পেয়েছে। এর মধ্যে ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা মালয়েশিয়া সরকারকে দিয়েছে বাংলাদেশ। বায়রার সাবেক ইসি সদস্য মোহাম্মদ আলী গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বারবার বন্ধ হয় সিন্ডিকেটের অপতৎপরতার কারণেই। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন মালয়েশিয়া সফরকালে অন্যান্য সোর্স কান্ট্রির মতো সিন্ডিকেটবিহীন স্বল্প অভিবাসন ব্যয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমবাজার চালু হলো আবার হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল, এমনটি যেন না হয়।
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ১৯৭৮ সালে প্রথম ২৩ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যান। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে আনুষ্ঠানিক জনশক্তি নিয়োগ চুক্তি সই হয় ১৯৯২ সালে। ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সে দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক রফতানি বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ তিন লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন মালয়েশিয়ায় গেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কুয়ালালামপুর সফরকালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইবরাহিমের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার অন্তত দুজন মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে পারেন। মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, শ্রমবাজার খোলার একটি বিষয় আছে সেজন্য অভিবাসন ইস্যু অগ্রাধিকারে থাকবে। এ ছাড়া, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, জ্বালানি, উচ্চশিক্ষা, রোহিঙ্গা সংকট, কৃষি, হালাল খাদ্য, সুনীল অর্থনীতি, আসিয়ান, মধ্যপ্রাচ্যে সংকটসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুই দেশের সহযোগিতার মতো নানা ইস্যু আলোচনায় আসতে পারে। উল্লেখ্য, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গত বছরের (২০২৫) আগস্টে মালয়েশিয়া সফর করেছিলন। এর আগে, ২০২৪ সালে অক্টোবরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইবরাহিম ঢাকা সফর করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে কুয়ালালামপুর থেকে সি-মিলিনিয়াম ট্রেড (এম) এসডিএনবিএইচডির ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. ওয়াহিদুর রহমান ইনকিলাবকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফর ঘিরে দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের মালয়েশিয়া সফর হওয়ায় প্রবাসীরা এটিকে ভ্রাতৃপ্রতিম দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন এবং শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, দেশটিতে সাত লক্ষাধিক প্রবাসী বাংলাদেশি কঠোর পরিশ্রম করে প্রতি বছর প্রচুর রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছেন। বাংলাদেশিরা কঠোর পরিশ্রমী বিধায় দেশটির নিয়োগকর্তারা অভিবাসীকর্মীর মধ্যে বাংলাদেশিদের বেশি পছন্দ করেন। এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী ব্যবসায়ী ওয়াহিদুর রহমান বলেন, দেশটিতে যেসব অবৈধ বাংলাদেশি পালিয়ে থেকে কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরকালে অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধকরণের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দেশটিতে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধি লাভ করবে।
মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রবাসীরা আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে শ্রমবাজার, কলিং ভিসা, অবৈধ কর্মীদের বৈধতা এবং প্রবাসীদের কল্যাণ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় স্থান পাবে। কুয়ালালামপুরের ভেস্ট-মার্কেটিং এসডিএনবিএইচডির পরিচালক মো. রুহুল আমিন বলেন, বন্ধ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণে বর্তমান সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশটিতে সফরকালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সরকার যদি সরাসরি এবং স্বচ্ছ পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা করে, তাহলে সাধারণ শ্রমিকরা কম খরচে বিদেশে আসার সুযোগ পাবেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরে আমরা এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করছি। তিনি বলেন, দেশটিতে কেউ নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন, আবার কেউ কর্মসংস্থান সংকটের কারণে অনিয়মিত অবস্থায় পালিয়ে থেকে কাজ করছে। তিনি দেশটিতে অবৈধ বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধতা লাভেও ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতার দাবি জানান।