রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিশেষ অভিযানেও লাগাম টানা যাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বিপর্যয়ের। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, মব, ডাকাতি, অপহরণ, অস্ত্রের মহড়া, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আধিপত্যের লড়াই ও অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে। অপরাধীদের হাতে আক্রান্ত হচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যও। এতে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা আরও তীব্র হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোয় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বয়ং পুলিশ কর্মকর্তারা।
পুলিশের দাবি, মানুষের আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দিনদিন বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। কোথাও কঠোর অবস্থানে গেলে ফ্যাসিস্ট আমলের পুলিশ ট্যাগ দিয়ে হামলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ কারণে অনেকটা নড়বড়ে পুলিশিং চলছে সারা দেশে। আর এ সুযোগটা নিচ্ছে অপরাধীরাও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সরকারের সদিচ্ছার সমন্বয়, সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের আইন মেনে চলতে বাধ্য করা ও মূল অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পারলে একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু এ জায়গাগুলোতে অনেক ঘাটতি রয়েছে। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু সেটি স্থিতিশীল হচ্ছে না। ১৬-১৭ বছরের নির্যাতনের উদাহরণ টেনে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা প্রতিশোধপরায়ণ হচ্ছেন। অপরাধ অর্থনীতিতে আধিপত্যের লড়াই চলছে। সাধারণ মানুষও আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। পুলিশ আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে সরকারকেই আরও কঠোরভাবে উদ্যোগী হতে হবে, যাতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আইন মেনে চলে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত তিন মাসে (মার্চ-মে) দেশে ৯১৫ হত্যা, ৪৬১ ছিনতাই, ১৩২ ডাকাতি, ২৮৬ অপহরণ, ২ হাজার ৪৬৬ চুরি ও ৩৯৬টি অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে। ওই তিন মাসে পুলিশের ওপর হামলা ঘটেছে ১৮৪টি। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য বলছে, মে মাসে মব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন ও আহত হন ৬৮ জন। ৬৪ রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন পাঁচজন এবং আহত হয়েছেন ২৮৯ জন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর তিনটি হামলায় পাঁচজন আহত হয়েছেন। ছয়টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর এবং একটি ভূমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। ৩০৫ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
৭৬ নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৭ নারী ও শিশু। আইনশৃঙ্খলা বিপর্যয়ের সবশেষ চিত্র ফুটে উঠেছে গতকাল ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারের অভিযানে গিয়ে চাপাতির কোপে রাজধানীর আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম ও এসআই তরুণ আহত হওয়ার ঘটনায়। রাজধানীর অন্যতম অপরাধপ্রবণ এ এলাকাটিতে অপরাধীদের হামলা নিয়ন্ত্রণে গুলি ছোড়ে পুলিশ। এতে দুই ছিনতাইকারী আহত হন। গুলিশের ওপর হামলার আগে ছিনতাইকারী চক্রটি চাপাতি ঠেকিয়ে এক দোকান থেকে ছিনতাইও করে। এর আগে নারায়ণগঞ্জ, সুন্দরবনসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলার শিকার হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এদিকে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি ও খুনাখুনিও উদ্বেগ ছড়াচ্ছে জনমনে। চলতি বছরের এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি ২০৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এরপর চট্টগ্রামে ১৮৬, রাজশাহীতে ১০৬ ও খুলনায় ৮৪টি মামলা হয়েছে। মেট্রোপলিটনের মধ্যেও শীর্ষে ঢাকা। শুক্রবার ঢাকার পশ্চিম রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। একই দিন খুলনায় এক বিএনপি কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। রবিবার খুলনা শহরের দৌলতপুরে ফজর নামাজের সময় মসজিদের ভিতর সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে দুই মুসল্লি আহত হন।
শনিবার চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার এক জনাকীর্ণ বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। যার সিসিটিভি ফুটেজ সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়। পাঁচ-সাতজনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীর গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতাকেই দায়ী করেন সবাই। এর আগে রাজধানীতে ফিল্মি স্টাইলে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন ও টিটন হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশে একের পর এক যে ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলো খারাপ ইঙ্গিত দিচ্ছে। মূলত জুলাই আন্দোলনের পর পুলিশের ওপর আস্থা কমে যাওয়া এবং মানুষের আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারে ভেঙে পড়েনি। যে ঘটনা ঘটছে সেগুলোয় মামলা হচ্ছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পুলিশ নড়বড়ে গতিতে চলছে, এটা অস্বীকার করছি না। তবে এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। মাঠ পর্যায়ের পুলিশের মধ্যে অজানা ভীতি কাজ করছে। এজন্য আমরা নিয়মিত মোটিভেশন দিচ্ছি এবং পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে অভিযানে যাওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছি। গাড়িসংকটসহ নানান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে।’
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিশাল জনসংখ্যার এই শহরে বহুমাত্রিক লোকের বসবাস। বেকারত্ব, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন কারণে দু-একটি ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। তবে যেকোনো অপরাধ ঘটলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। প্রিভেনশন পুলিশিং জোরদার করতে চেকপোস্ট, প্যাট্রলিং ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও জোরালো অ্যাকশন প্রয়োজন হতে পারে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পুলিশের মনোবলে ঘাটতি নেই। মানুষ ফ্যাসিস্ট আমলে যে পুলিশ দেখেছে সেই রূপে আমরা ফিরব না কখনো। সমাজকে সঙ্গে নিয়েই আইনের মধ্যে থেকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা হবে।’