কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টার শিকার হয়ে ছয় মাস বয়সি এক শিশুসহ ছয়জন টানা প্রায় ৬৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। খোলা আকাশের নিচে, তীব্র রোদ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে তাদের অবস্থানকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয়রা।
দেখা গেছে, রৌমারীর গয়টাপাড়া সীমান্তে মাথার ওপর সামান্য একটি পলিথিন টানিয়ে তার নিচে আশ্রয় নিয়েছেন এক দম্পতি। তাদের কোলে ছয় মাস বয়সি এক শিশু। সঙ্গে রয়েছে আড়াই থেকে তিন বছর বয়সি আরেক সন্তান। একই স্থানে অবস্থান করছেন আরও দুই যুবক।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, টানা দুই দিন ও দুই রাত খোলা আকাশের নিচে থাকার পর শিশুদের কষ্টের কথা বিবেচনা করে মাথার ওপর সামান্য পলিথিন টানানোর ব্যবস্থা করা হয়। এর আগে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই দিন কাটাতে হয়েছে তাদের।
পুশইনের শিকার ছয়জনকে রাখা হয়েছে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলারের কাছে এক ফাঁকা স্থানে। এক পাশে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া ও ঝালুর চর বিএসএফ ক্যাম্প, অন্যপাশে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি খাল। আশপাশে নেই কোনো বসতবাড়ি, দোকানপাট কিংবা ন্যূনতম মানবিক সহায়তার সুযোগ।
তাদের অবস্থান ঘিরে একদিকে বিএসএফ এবং অন্যদিকে বিজিবি সদস্যরা পাহারা দিচ্ছেন, যাতে তারা কোনো দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পারেন। এমন পরিস্থিতি টানা ৬৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চললেও এখনো কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি।
সেখানে নেই পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানি, গোসল কিংবা স্যানিটেশনের ব্যবস্থা। মাঝে মধ্যে বিএসএফ খাবার দিলেও অধিকাংশ সময় স্থানীয় গ্রামবাসীর দেওয়া বিস্কুট ও সামান্য খাদ্যসামগ্রীই তাদের ভরসা। বিশেষ করে শিশু দুটির অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা।

ছয় মাস বয়সি শিশুসহ পুশইনের শিকার ব্যক্তিদের দেখতে প্রতিদিনই সীমান্ত এলাকায় ভিড় করছেন শত শত নারী-পুরুষ ও শিশু। একটি নিষ্পাপ শিশুকে দিনের পর দিন এমন পরিস্থিতিতে আটকে রাখা নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন তারা।
গয়টাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা লিটন মিয়া বলেন, শিশু দুটির সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। বিশেষ করে ছয় মাস বয়সি শিশুটি তো কোনো অপরাধ করেনি। তাহলে কেন তাকে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে কষ্ট পেতে হবে? আমরা দ্রুত এ ঘটনার সমাধান চাই। প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক মহলেরও হস্তক্ষেপ করা উচিত।
ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মী ওয়াহিদুজ্জামান তুহিন বলেন, এটি স্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন। একটি ছয় মাসের শিশুকে কেন দিনের পর দিন খোলা মাঠে থাকতে হবে? মানবিক বিবেচনায় হলেও দ্রুত এই সংকটের সমাধান হওয়া প্রয়োজন। বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলোরও বিষয়টি নজরে আনা দরকার।
জানা গেছে, গত রোববার (১৪ জুন) সকালে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া ও ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে কয়েকজনকে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিষয়টি টের পেয়ে বিজিবি ও স্থানীয়রা বাধা দিলে ছয় মাসের এক শিশুসহ দুই শিশু, এক নারী ও তিনজন পুরুষ শূন্যরেখায় অবস্থান নিতে বাধ্য হন।
একই দিনে আরও তিন যুবককে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হলে বাধার মুখে তারাও শূন্যরেখায় অবস্থান নেন।
ঘটনার পর রোববার দুপুরে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি। এরপর থেকেই গয়টাপাড়া, ভন্দুরচরসহ রৌমারী সীমান্তজুড়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। স্থানীয় বাসিন্দারাও সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন।
গয়টাপাড়া বিওপি ক্যাম্পের হাবিলদার মাসুদ রানা বলেন, যে কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে।
জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান জানান, বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানে বিজিবির পক্ষ থেকে আবারও পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বিএসএফের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।