বজ্রপাত প্রতিরোধে ২০১৭ সালে ১০০ কোটি টাকা খরচ করে লাগানো হয়েছিল তালগাছ। বছর না ঘুরতেই দেখা যায় কোথাও গরু-ছাগলের পেটে চলে গেছে। কোথাও গাছ না লাগিয়েই টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। তালগাছে প্রতিরোধ কৌশল ব্যর্থ হলে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড বসানো হয়। কিছু জায়গায় সেই দণ্ডের তামার তারসহ অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে যায় চোর। বজ্রপাতে প্রতি বছর প্রায় ৩০০ মানুষের প্রাণহানি হলেও কাজে আসছে না কোনো কৌশল। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগের ব্যর্থ প্রকল্পগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার মাঠভিত্তিক জরিপ করে পরিকল্পনা করছে সরকার। এবারও ১৪ লাখ তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেসব এলাকায় গাছের সংখ্যা কম সেখানে লাগানো হবে। ৬৪ জেলার প্রশাসককে তালগাছের সংখ্যা জরিপ করে প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা বিশেষ করে হাওড়াঞ্চলে ‘মাল্টিপারপাস শেড’ নির্মাণ করা হবে। আকাশে বজ্রমেঘ দেখলেই কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারবেন। এ শেডে বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা থাকবে। এ শেড কৃষকরা ধান মাড়াই, স্বল্প সময়ের জন্য ধান মজুতসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশে বজ্রপাতে প্রাণহানি কমানোর জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বজ্রপাতের ঝুঁকিহ্রাস ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে বজ্রপাতের পূর্বাভাস তৈরি করে তা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি ‘ইন্টিগ্রেটেড ভয়েস রেসপন্স’ বা আইভিআর প্রযুক্তির সাহায্যে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে লিফলেট বিতরণ, পোস্টার ও বিশেষ মহড়ার মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় কৃষক ছাউনিতে বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন এবং ব্যাপক হারে তালগাছ রোপণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বজ্রপাতে এক যুগে ৩ হাজার ৪২৫ জন মারা গেছে। ২০১৪ সালে ১৭০, ২০১৫ সালে ২২৬, ২০১৬ সালে ৩৯১, ২০১৭ সালে ৩০৭, ২০১৮ সালে ৩৫৯, ২০১৯ সালে ১৫৮, ২০২০ সালে ২৫৫, ২০২১ সালে ৩৬৩, ২০২২ সালে ৩৩৭, ২০২৩ সালে ৩৫০, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে ২৬৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন বজ্রপাতে। চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত ৭ দিনেই ৭১ জন মারা গেছেন। এ বছর মৃত্যু শতাধিক।
জানা গেছে, বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় টিআর কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। বরাদ্দ করা হয় ১৫ কোটি টাকা। এ টাকা দিয়ে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় ৩৪৩টি বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। তবে সব এলাকায় স্থাপন করা হয়নি। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫টি জেলায় বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপনের জন্য ১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় মন্ত্রণালয়। এ ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয়টি বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছিল। এসব দণ্ডের অনেক যন্ত্রাংশ চুরি ও খোয়া যায়। ফলে সরকারের শুধু অর্থই খরচ হয়েছে, বাস্তবে কাজে আসেনি। পরে এগুলো পুনরায় স্থাপন করতে হয়।