দেশব্যাপী ভূগর্ভস্থ পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। দেশের প্রায় ৯৭ ভাগ লোক এই বিষাক্ত পানি পান করছে। অতি সম্প্রতি দেশব্যাপী এক গবেষণায় এ ভয়াবহ তথ্য বের হয়ে আসে। একটি জার্নালে বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ বেশি থাকার বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও গবেষকদের মতে, এ ধরনের বিষাক্ত পানি পান কিংবা ব্যবহার করার ফলে লিভারের রোগ, লিভার ক্যানসার, স্কিন ক্যানসার, হার্টের রোগ, চোখ-নাকের সমস্যা, রক্তশূন্যতা, জয়েন্টে ব্যথাসহ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় পুরো দেশের মানুষ।
সায়েন্স ল্যাবরেটরি, বিএসটিআই ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মতে, দেশে ৬৪ জেলাতেই পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ বেশি। তবে ৫৪টি জেলায় টিউবওয়েলের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক ও আয়রন রয়েছে। কর্মকর্তাদের অনুসন্ধানে এই তথ্য বের হয়ে আসছে। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে জানানো হলেও এর প্রতিকারে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি তারা, নেয়নি কোনো জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ইমিরেটস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, মাত্রাতিরিক্ত আয়রন ও আর্সেনিকযুক্ত পানি ব্যবহার ও পান করলে, লিভার, হার্ট, কিডনি, চোখ ও নাকের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। স্কিন ক্যানসার, রক্তশূন্যতাসহ নানা ধরনের জটিল রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। জয়েন্টে ব্যথা ও স্কিনে সমস্যা হতে পারে।
আগারগাঁও নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম বলেন, মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত পানি পান কিংবা ব্যবহার করলে গর্ভবতী মায়ের পেটের বাচ্চার নার্ভ অকেজো, মানসিক ভারসাম্যহীনতাসহ বিভিন্ন ধরনের নিউরোলজিক্যাল সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এই ধরনের জটিলতা নিয়ে প্রচুর শিশু নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন আসছে।
ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, একসময় শুধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ক্যানসার রোগীর চিকিত্সা ব্যবস্থা ছিল। বর্তমানে আলাদা সরকারি ক্যানসার হাসপাতাল ছাড়াও প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পৃথক ক্যানসার ইউনিট রয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালেও ক্যানসার চিকিত্সা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। তার পরও রোগীরা বিছানা পায় না এবং সময় মতো ভর্তি হতে পারে না। ভেজাল খাদ্যসামগ্রী ও আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করার কারণে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
মহাখালী গ্যাসট্রোলিভার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ডা. এনামুল করিম বলেন, বেশি পরিমাণে আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত পানি পান কিংবা ব্যবহারে লিভারের ক্ষতি ও দীর্ঘ মেয়াদে দেহের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সফি আহমেদ মোয়াজ বলেন, মায়ের গর্ভে থাকাকালে শিশুরা মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক ও আয়রন পাওয়ার কারণে অনেকে স্কিন ক্যানসার, কিডনি সমস্যাসহ নানা শারীরিক জটিলতা নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক ও আয়রন গর্ভবতী মা ও শিশু উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্যই ঝুঁকি বয়ে আনে। মা ও শিশুর মৃত্যুহার বৃদ্ধির অন্যতম কারণও এটি। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মোশতাক হোসেনও অনুরূপ মতামত দিয়েছেন।
সায়েন্স ল্যাবরেটরির দুই জন সিনিয়র বিজ্ঞানী বলেন, সব জেলার পানিতেই আর্সেনিক ও আয়রনের পরিমাণ বেশি, তবে ৫৪টি জেলায় টিউবওয়েল কিংবা অন্যান্য উপায়ে সংগ্রহ করা খাবার পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত, যা পান কিংবা ব্যবহার মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবে বৃষ্টির পানি নিরাপদ। এই পানিতে আর্সেনিক ও আয়রন নেই। সাপ্লাইয়ের পানি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
দুই বিজ্ঞানী বলেন, বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করার প্রযুক্তি রয়েছে। ফাস্টফ্লাশ প্রযুক্তিভিত্তিক যন্ত্রটি ঘরে টিনের এককোনায় কিংবা ভবনের একপাশে স্থাপন করা যায়। যন্ত্রটির দুটি ছোট পাইপ থাকবে। একটি পাইপ দিয়ে ময়লা পানি এবং অপরটি স্বচ্ছ পরিষ্কার পানি বের হবে। এই পানি দীর্ঘদিন রেখে ব্যবহার করা যাবে। এই প্রযুক্তি তেমন বেশি ব্যয়বহুল নয়। সামান্য খরচ হবে। সকলেই ব্যবহার করতে পারবে। ওয়াসার ও বোতলজাত পানি নিরাপদ বলেও তাদের পরীক্ষায় প্রমাণিত। তারা বলেন, এ দেশে খাবার পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ ৫০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত মানবদেহের জন্য সহনীয়। এর বেশি হলে তা স্বাস্থ্যের চরম ঝুঁকিপূর্ণ। আমেরিকায় পানিতে আর্সেনিক ১০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত অনুমোদিত।
বিএসটিআইয়ের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কিংবা তাদের অনুমোদনবিহীন বোতলজাত পানি উত্পাদন ও বাজারজাতকারী বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে জেল-জরিমানা করেছেন তারা। তাদের এই মোবাইল কোর্ট নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে।