Image description

কুমিল্লার দাউদকান্দির ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া প্রধানকে ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ‌‘নিখোঁজ’ হওয়া এই নেতাকে উদ্ধারের পর পুলিশের দাবি, তিনি স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে ছিলেন। অন্যদিকে জিসানের দাবি, তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করা হয়েছিল। এর মধ্যেই জিসানের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ ও গর্ভপাতের অভিযোগে মামলা এবং তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের ঘটনায় স্থানীয় ও রাজনৈতিক মহলে নানামুখী প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একইসঙ্গে উদ্ধার-পরবর্তী জিসান ও মামলা করা ওই নারীর সঙ্গে কারও কথা বলতে না দেওয়ার অভিযোগে পুরো ঘটনায় এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি।


এদিকে জিসানের শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চার সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পরই ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তদন্তের মোড় ও পুলিশের দাবি

নিখোঁজের এক দিন পর কুমিল্লার লাকসাম জংশন এলাকা থেকে অজ্ঞান অবস্থায় গত ১২ জুন রাতে জিসানকে উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথম দিকে নিখোঁজের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হলেও কুমিল্লা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। বলা হয়, নিখোঁজ নয়, আত্মগোপনে ছিলেন শিবির নেতা জিসান।

বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ জানায়, গত ২০ মে জিসান তার দাউদকান্দির ভাড়া বাসায় নিয়ে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক নারীকে ধর্ষণ করে। পরে ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে ওষুধের মাধ্যমে ভ্রূণ নষ্ট করা হয়। এ ঘটনার পর ওই নারী জিসানকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে ১২ জুন বিয়ে করবে বলে সম্মতি দেন। কিন্তু আগের দিনই আত্মগোপনে চলে যান জিসান। এ ঘটনায় তিনি চাচাতো ভাই রাসেল আহমেদের মাধ্যমে থানায় নিখোঁজের জিডি করান।

পুলিশ জানায়, প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে জিসানকে কেউ অপহরণ করেনি। তিনি নিজেই আত্মগোপনে ছিলেন। এক নারীকে ধর্ষণ ও নারীর সঙ্গে প্রতারণামূলক ঘটনার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ওই মামলায় জিসানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। একইসঙ্গে গর্ভপাতে সহযোগিতার অভিযোগে সেকান্দর আলী, গোলাম রাব্বী ও সজীব হাসান নামে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

জিসানের পরিবারের বক্তব্য

জিসানের পরিবার থেকে দাবি করা হয়েছে, গত ১১ জুন ঢাকা থেকে দাউদকান্দিতে আসেন জিসান। রাত ৮টার দিকে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে খুঁজে না পেয়ে থানায় জিডি করা হয়।

জিসানকে উদ্ধারের পর প্রথমে লাকসাম জেনারেল হাসপাতাল ও পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমি মডেল মসজিদের সামনের সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এ সময় একটি গাড়ি আমার সামনে এসে থামে। কয়েকজন আমাকে টান দিয়ে গাড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে নেয়। এরপর থেকে আমি আর কিছুই বলতে পারি না বা মনে করতে পারছি না।

হাসপাতালে জিসানের সঙ্গে থাকা তার বাবা শফিকুল ইসলাম বলেন, আগের চেয়ে আমার ছেলে কিছুটা সুস্থ আছে। তবে এখনও স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছে না। আমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও পুলিশ নিয়ে গেছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে পারছি না।

ছাত্রশিবিরের প্রতিক্রিয়া

জিসান অপহরণের পর ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, একটি চক্র জিসানকে অপহরণ করে তার পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করছে এবং যে ফোন নম্বর ব্যবহার করে মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিল, সেটিও সক্রিয় থাকার পরও রহস্যজনকভাবে তারা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ জানিয়েছেন, পুলিশের বক্তব্য ছাড়া আমরা এখন পর্যন্ত অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পুরো ঘটনার বিস্তারিত জানতে পারিনি। তবে প্রেমের সম্পর্কের প্রাথমিক তথ্য সামনে আসায় সাংগঠনিক বিধান অনুযায়ী জিসানকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, উদ্ধারের পর থেকে জিসানের সঙ্গে পরিবার বা সংগঠনের কাউকে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। ফলে নিখোঁজ বা কথিত অপহরণের বিষয়ে জিসানের নিজস্ব বক্তব্য এখনও আড়ালেই রয়ে গেছে।

কী বলছে ওই নারীর পরিবার

ওই নারীর বড় বোন দাবি করেছেন, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় পুলিশ তার বোনকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। এ সময় পরিবারের অন্য সদস্যদের তার সঙ্গে যেতে দেওয়া হয়নি। এখন পর্যন্ত বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।

তিনি আরও বলেন, বাড়ি থেকে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার সময় থেকে শুরু করে থানায় নেওয়া, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া এবং বর্তমান পরিস্থিতি—কোনো বিষয় সম্পর্কেও তিনি বিস্তারিত অবগত নন।

শারীরিক অবস্থা ও মেডিকেল বোর্ড

জিসানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের অবসান ঘটাতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেডিসিন, নিউরো মেডিসিন, অ্যানেসথেসিয়া ও মনোরোগবিদ্যা বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে চার সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা সোমবার বেলা ১১টায় পরিচালকের কার্যালয়ে সভা করেছেন। তারা জিসানের সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছেন। সব বিষয় পর্যালোচনা শেষে বোর্ড জিসানের বড় ধরনের কোনো সমস্যা খুঁজে পায়নি।

মেডিকেল বোর্ডের সদস্যসচিব ও হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান মজুমদার বলেন, দীর্ঘক্ষণ এ নিয়ে কাজ করেছি এবং রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে প্রতিবেদন পরিচালকের কার্যালয়ে দিয়েছি। এ নিয়ে আমাদের সরাসরি মন্তব্য করার সুযোগ নেই। এ নিয়ে হাসপাতালের পরিচালক বিস্তারিত কথা বলবেন।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক নিশাত সুলতানা বলেন, একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে সকল চিকিৎসকের এখনও স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়নি। মঙ্গলবার পরিচালক এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন। আগামীকাল তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হতে পারে।

পুলিশের বক্তব্য

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) ইমাম হোসেন বলেন, ঘটনার সব দিক নিয়ে তদন্ত চলছে। এ মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়। ‍সুস্থ থাকলে জিসানকে মঙ্গলবার আদালতে তোলা হতে পারে।

বাদীর (মামলা করা নারী) সাথে কেন পরিবার কথা বলতে পারবে না— এমন প্রশ্নে দাউদকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল বারী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এগুলো অযৌক্তিক প্রশ্ন। তাই আপনাদের কল ধরি না।’ এ বলেই কল কেটে দেন তিনি।

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোহাম্মদ সাইফুল মালিক জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। জিসানের শারীরিক অবস্থা ও ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত মন্তব্য করা যাবে। তদন্তের স্বার্থে আপাতত এর বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না।