বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম)-এর চারপাশের আইনি বেড়াজাল ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। সাইপ্রাসে তার সম্পত্তি ক্রোক ও সিঙ্গাপুরে সম্পদ অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় এবার নজর পড়েছে কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুটি নামী হোটেলের ওপর। সম্প্রতি এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়ার সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘দ্য এজ মালয়েশিয়া’।
চট্টগ্রাম থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এস আলমের বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মূল ভিত্তি মূলত অর্থ পাচার—এমনটাই অভিযোগ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মে মাসে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সাইপ্রাসে তার ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল আবাসিক সম্পত্তি ক্রোক করেছে দেশটির আদালত। একই সময়ে বাংলাদেশের একটি আদালত তার অনুপস্থিতিতে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেছে। সিঙ্গাপুরে তার এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও (৪ বিলিয়ন রিঙ্গিত) বেশি মূল্যের সম্পদের ওপর অনুসন্ধান চালাচ্ছে দেশটির তদন্তকারী সংস্থা। এসবেরই ধারাবাহিকতায় এবার কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুটি নামী হোটেলের ওপর নজর পড়েছে।
কুয়ালালামপুরের প্রাণকেন্দ্র জালান সুলতান ইসমাইল এবং জালান আমপাং-এর সংযোগস্থলে অবস্থিত ‘রেঁনেসা কুয়ালালামপুর হোটেল অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টার’ এবং এর পাশেই অবস্থিত ‘ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার’ মূলত সাইফুল আলমের আন্তর্জাতিক পোর্টফোলিওর অন্যতম দৃশ্যমান অংশ। একই জমির ওপর নির্মিত এই হোটেল দুটির মালিকানা রয়েছে ‘ভেঞ্চুরা ইন্টারন্যাশনাল এসডিএন বিএইচডি’ (সাবেক কানালি লজিস্টিকস)-এর হাতে, যা এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে। ২০১৬ সালে তৎকালীন আইজিবি কর্পোরেশন (বর্তমান আইজিবি বিএইচডি) এই রেঁনেসা হোটেলটি ৭৬৫ মিলিয়ন রিঙ্গিতে ভেঞ্চুরা ইন্টারন্যাশনালের কাছে বিক্রি করেছিল।
ভেঞ্চুরা ইন্টারন্যাশনালের প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই কোম্পানির শতভাগ শেয়ারের মালিক ‘ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়া’। অন্যদিকে ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়ার পরিচালক হিসেবে ওং ওয়াই চিয়ং, পু সিন ই এবং আরিভালাগাম চকালিঙ্গম-এর নাম রয়েছে। এদিকে ‘ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়া’র সম্পূর্ণ মালিকানা আবার সিঙ্গাপুরের ‘ওয়াইআইএফ হোল্ডিং প্রাইভেট লিমিটেড’-এর হাতে। সিঙ্গাপুরের এই মূল প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডার হিসেবে রয়েছে ‘হিলড্রিক্স এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ভিসিসি’ এবং এর পরিচালক চু কি সিওং, যিনি হিলড্রিক্স ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
হিলড্রিক্স ক্যাপিটালের ব্যবসায়িক পরিধি মালয়েশিয়ার রাবার প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘জিআইআইবি হোল্ডিংস’ পর্যন্ত বিস্তৃত। দুর্নীতির তদন্ত, করপোরেট হুমকি এবং আইনি বিরোধের কারণে জিআইআইবি সম্প্রতি বেশ আলোচনায় এসেছে। এমনকি মে মাসের শুরুতে এক সকালে এই কোম্পানির শেয়ারের দাম আকস্মিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় বুর্সা মালয়েশিয়া (মালয়েশীয় পুঁজিবাজার) তাদের কাছে কৈফিয়ত তলব করেছিল। এ ছাড়া হিলড্রিক্স এশিয়া গ্রোথ ফান্ড সিঙ্গাপুরের বিনোদনধর্মী প্রতিষ্ঠান ‘এমএম২ এশিয়া লিমিটেড’-কে রক্ষায় বড় ধরনের পুঁজি বিনিয়োগের চুক্তি করেছে, যা বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
এদিকে, ভেঞ্চুরা ইন্টারন্যাশনাল ২০২০ সালে রেঁনেসা হোটেলটি বড় ধরনের সংস্কারের জন্য বন্ধ করে দেয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে এটি মালয়েশিয়ায় ম্যারিয়টের প্রথম দ্বৈত-ব্র্যান্ডের সম্পত্তি হিসেবে পুনরায় চালু হয়, যার পশ্চিম উইংয়ে রেঁনেসা এবং পূর্ব উইংয়ে ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন অবস্থিত। ম্যারিয়টের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো ভেঞ্চুরা ইন্টারন্যাশনালকেই এর মালিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এই হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা বা সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দেয়নি। তবে এস আলমের বিরুদ্ধে সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস এবং জার্সিতে চলমান আন্তর্জাতিক তদন্তের পরিধি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ধারণা করছে, বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী সম্পদ পুনরুদ্ধারের যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তার অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ায় থাকা এস আলম গ্রুপের এই সম্পদগুলোও শিগগিরই কঠোর নজরদারির আওতায় আসতে পারে।
তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর
এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই একটি আকর্ষণীয় কূটনৈতিক সংযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। যদিও প্রথম আমন্ত্রণটি এসেছিল ভারত থেকে, তবে তিনি ২১ ও ২২ জুন কুয়ালালামপুরে দুই দিনের সফরের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছেন। সেখানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রমতে, গত ২৪ মে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এই সফরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে বাংলাদেশ হাইকমিশন—ঠিক যে সপ্তাহে সাইপ্রাসে আলমের সম্পত্তি ক্রোক করা হয়। কুয়ালালামপুর সফরের মূল এজেন্ডায় অভিবাসন, শ্রমিক সংকট, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিক্ষা সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য এমন একটি দেশকে বেছে নিয়েছেন, যেখানে এস আলম গ্রুপের সবচেয়ে দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক সম্পদ অর্থাৎ ম্যারিয়ট ব্র্যান্ডের দুটি হোটেল অবস্থিত, যা কোনো সাধারণ কাকতালীয় বিষয় নাও হতে পারে।
এই সফরের আরেকটি অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করা। আধুনিক দাসত্ব ও চড়া অভিবাসন ব্যয়ের কারণে ২০২৪ সাল থেকে এই বাজারটি বন্ধ রয়েছে। ২০২৩ সালে বহু শ্রমিক বিপুল অর্থ খরচ করে মালয়েশিয়ায় গিয়ে দেখেন, রিক্রুটিং এজেন্টদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সেই চাকরির কোনো অস্তিত্বই নেই। এর ফলে ২০২৪ সালের শুরুতে মালয়েশিয়া যখন সীমান্ত বন্ধ করে দেয়, তখন প্রায় ১৮ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক দেশটিতে প্রবেশ করতে পারেননি।
বাংলাদেশের বর্তমান নতুন সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে বিতর্কিত এজেন্টরা এখন আত্মগোপনে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং রিক্রুটিং এজেন্টরা যোগসাজশ করে মানবসম্পদ রপ্তানির নামে এই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই শ্রমবাজার চালু করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক মাইলফলক। তবে বাংলাদেশ সরকার এবার আর পুরোনো সিন্ডিকেট ব্যবস্থা বহাল রাখতে চায় না। মালয়েশিয়ার প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে নির্ধারিত গুটি কয়েক কোম্পানির পরিবর্তে আরও বেশি সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সিকে যুক্ত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ঢাকা। বর্তমানে ১০২টি এজেন্সির পরিবর্তে ৪৩২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মালয়েশিয়ার বর্তমান ‘ফরেন ওয়ার্কার সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডি’-এর প্রতিষ্ঠাতা দাতুক সেরি আমিনুল ইসলাম আব্দুল নূর, যিনি মূলত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশীয় নাগরিক। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সরকার আমিনুল এবং তার সহযোগী রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে প্রত্যর্পণ অনুরোধ জারি করেছে, যা বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন।
আসন্ন দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় অর্থ পাচার প্রতিরোধ বা সম্পদ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্থান পাবে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে এটি স্পষ্ট, মালয়েশিয়ায় এস আলমের সম্পদের ওপর যখন তদন্তের চাপ বাড়ছে এবং শ্রমবাজার চালুর প্রক্রিয়া গতিশীল হচ্ছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক একটি উচ্চ রাজনৈতিক স্তরে প্রবেশ করছে।
স্থানীয় সূত্রমতে, কুয়ালালামপুরের মোট ৯১৯ কক্ষবিশিষ্ট এই হোটেল দুটি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রির তালিকায় না থাকলেও, কয়েক বছর আগে এর আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছিল এক দশমিক ২৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত। তবে বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দাম কিছুটা বেশি এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে হোটেল দুটির যৌক্তিক বাজারমূল্য ৮৫০ মিলিয়ন থেকে ৯৫০ মিলিয়ন রিঙ্গিতের মধ্যে হওয়া উচিত।
অন্যদিকে, বাংলাদেশি শ্রমবাজারকে কেন্দ্র করে হাজার কোটি রিঙ্গিতের লেনদেন হলেও, এর একটি বড় অংশই চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী ও এজেন্টদের পকেটে।
শ্রমিকদের শোষণমুক্ত রাখতে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি রামানান রামাকৃষ্ণান ‘তুরাপ’ নামে একটি নতুন ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছেন, যা বেস্টিনেটেরই একটি সৃষ্টি। তবে বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ার অনেক অংশীজন এই ব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এটি মূলত শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আবারও কয়েকটি নির্দিষ্ট কোম্পানির হাতে কুক্ষিগত করার একটি নতুন কৌশল মাত্র।