শামীম হোসেন—নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ইংরেজি বিভাগের লেকচারার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্যানেলে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। এশিয়া পোস্টের বিশেষ আলাপনে শামীম হোসেন কথা বলেছেন নিজ জীবনের সন্ধিক্ষণ, তারুণ্যের নতুন বাংলাদেশ, ছাত্র রাজনীতির সম্ভাবনা ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবিদ আজম।
এশিয়া পোস্ট: ডাকসু নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দলের ব্যানারে না দাঁড়িয়েও আপনি তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন। এই নির্বাচনটাকে আপনি কতটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন?
শামীম হোসেন: ডাকসু নির্বাচন অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণ, জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা আমাদের সংসদীয় আসনগুলো ৩০০টি অংশে বিভক্ত করি, ফলে পুরো পার্টির নজর থাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে। কিন্তু ডাকসু নির্বাচন যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রথম নির্বাচন ছিল, ফলে পুরো দেশের একটা চাপ ছিল। বড় দলগুলো এখানে তাদের শক্তির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করেছে।
তারা জাতীয়ভাবে সর্বোচ্চ শক্তি যেখানে প্রয়োগ করেছে, সেখানে আমার মতো একজন একক ব্যক্তির লড়াই করা খুবই কঠিন ছিল। তাছাড়া অন্তর্বর্তী সময়ে অসত্য তথ্য ও গুজব ছড়ানো খুব সাধারণ একটা ব্যাপার ছিল। যে কারণে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল অনলাইন মাধ্যমে নিজের ইমেজ পরিচ্ছন্ন রাখা। কারণ তখন নানা ধরনের প্রোপাগান্ডা আমাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে।
একই সঙ্গে আমি মাঠে একেবারে নতুন ছিলাম, নানা জায়গায় আমাকে নতুনভাবে প্রচারণা করতে হয়েছে। বড় কর্মীবাহিনী যেহেতু আমার ছিল না, সেক্ষেত্রে আমাকে এককভাবে সবকিছু গোছাতে হয়েছে। আমার প্রচারণায় যারা কাজ করেছে, অনেকের সাথেই আমার প্রথমবার দেখা হয়েছে। আমি যেহেতু ইংরেজি শেখাই, আমার শিক্ষার্থীরাও স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছে; ফলে আমরা অনেক দূর পৌঁছাতে পেরেছি।
এর বাইরে দেখা গেছে অনেকেই আমাদের সঙ্গে কাজ করেছে—এমনও হয়েছে যে একজন আমার জন্য কাজ করেছে, কিন্তু ভোট চেয়েছে অন্য কারও জন্য। এ রকম ঘটনা অহরহ ঘটেছে এবং শুধু আমার ক্ষেত্রে না, অন্যান্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। হলের রুমে রুমে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। সুতরাং এইসব মোকাবেলা করার মতো সক্ষমতা খুব কম সময়ে তৈরি করা আসলে কঠিন ছিল। আমি এই নির্বাচনে একটা জিনিস অনুধাবন করেছি, বাংলাদেশে আসলে দলীয় রাজনীতির বাইরে নিজের অবস্থান তৈরি করা ভীষণ কঠিন।
শেষ সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার দেখে আমি খুব বিষণ্ন ছিলাম। দোয়া করতাম যে কোনভাবেই যদি পাশ করে যাই, তাহলে এটা আমার জন্য খুবই কঠিন হতে যাচ্ছে। কারণ, তিনটা বড় দল যখন আপনার বিপরীতে, সেখানে আমার টিকে থাকা খুব কঠিন।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ কেমন? সাধারণ শিক্ষার্থীরা কী ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে?
শামীম হোসেন: ডাকসু নির্বাচন করেছিলাম কারণ আমার একটা নিজস্ব বোঝাপাড়া আছে। পড়ালেখার জগৎ থেকে আমার রাজনৈতিক দীক্ষা হয়েছে। আমি নিজেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন পড়ালেখা করেছি, নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে ক্যাম্পাসে ছিলাম। দূর থেকে মনে হয় আমি চোখ দিয়ে দেখতে পাই যে ভেতরে কী হচ্ছে। আমরা যখন ফিল্ডে থাকি না, তখন আমরা অন্ধ থাকি; শুধু এক দলের দিকে ঝুঁকে থাকি। আমি ভালো করে জানি আমাদের প্রকৃত সমস্যাগুলো কোথায়।
পৃথিবীতে যারা একাডেমিক জগৎ থেকে রাজনীতিতে এসেছে, তারা একাডেমিক রাজনীতি করে। আমি বুঝলাম দাসত্ব থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্ত করতে গেলে আমাদের বোঝাপাড়ার জগৎ সৃষ্টি করতে হবে। আজকে আমার উদ্ভাবনী পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে; পৃথিবীতে অনেকেরই আইডিয়া প্রথম জীবনে ব্যর্থ হয়েছে। অনেকে মারা যাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তাদের আইডিয়া কার্যকর হয়েছে। আমার কথা ছিল, আমরা সবকিছু নতুনভাবে চিন্তা করতে শিখব এবং দলীয় রাজনীতির বাইরেও চিন্তা করতে পারি।
আমি কিন্তু আমার ক্যাম্পেইনে বলেছি যে, আমার বাইরেও স্বতন্ত্র প্রার্থী আছে ৪১ জন। আপনি যাকে ইচ্ছা ভোট দিতে পারেন, কিন্তু সবাই একজনকেই দিন। স্বতন্ত্র একজন বের হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আপাতদৃষ্টে হলেও লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি থেকে মুক্তি পাবে। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসুই একমাত্র সাংবিধানিকভাবে রাজনীতি চর্চার কেন্দ্র। রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার নিজস্ব একটা জায়গা থাকা উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় একটা জায়গায় ব্যর্থ হচ্ছে—সবকিছুকে এখানে রাজনৈতিক মিটারে মাপা হয়। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যদি পড়ার সময় এটা মনে করে যে, আমি যে থিওরিটা শিখছি তা আমার রাজনৈতিক আদর্শের বিপরীত, তাই আমি শিক্ষককে মারব—তাহলে তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার দরকার নেই, বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কারণ বিদ্যার ব্যাপারটা হচ্ছে আপনি অনেক কিছু অপছন্দ করলেও তা পড়বেন। আপনার যদি মনে হয় ভালো লাগছে না, আপনি যৌক্তিক বিরোধিতা করবেন। আপনি থিওরিকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেও নতুন থিওরি আনতে পারেন। পশ্চিমা সব থিওরিকে চ্যালেঞ্জ করেই তো ওরিয়েন্টালিজম (প্রাচ্যবাদ) এসেছে।
স্বাধীনতার রক্তে রঞ্জিত ইতিহাসের পরে পাঁচ-সাতটা ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেলা হলো সূর্যসেন হলে। এগুলো কি ক্ষতি না? লস অব দ্য ট্যালেন্ট। আপনি হাজার হাজার ছেলের প্রতিভাকে নষ্ট করছেন। আমার চেয়ে অনেক ভালো শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে, আমি তো ব্যাকবেনচারদের একজন ছিলাম। তাদের সম্ভাবনা আমি নিজের চোখে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেছি। কারণ, আপনি তাকে ঘুমাতে জায়গা দেন না। একটা ছেলে ছারপোকার কামড় খেয়ে এসে আপনাকে বুদ্ধিভিত্তিক আলাপ উপহার দেবে—সেটা তো কল্পনা করা যায় না। ভাত-কাপড়ের ভাবনার সঙ্গে আমাদের চিন্তা শক্তির সম্পর্ক রয়েছে।
আমাদের সামাজিক শ্রেণি আমাদের চিন্তার সীমারেখা তৈরি করে। আমরা যারা ছারপোকার কামড় খেয়েছি, আমাদের চিন্তা থাকে একটা বিসিএস ক্যাডার হওয়া। কারণ, আমি এই কষ্টকর জীবন চাই না। পূর্ববর্তী রেজিমের সময় গেস্টরুম-গণরুমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ট্রমার ভেতরে রাখা হতো। এই ট্রমার ভেতরে থেকে একটা শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আপনি কী প্রত্যাশা করতে পারেন? সেই জায়গা থেকে আমার মনে হয়েছে, একটা নতুন আইডিয়া প্রয়োগ করা যেতে পারে, যেকোনো বিষয়ে একটু যৌক্তিক আলাপচারিতায় আসা এবং সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।
এশিয়া পোস্ট: দলীয় প্যানেল থেকে উপাচার্য (ভিসি) নির্বাচন করা হলে শিক্ষার্থীদের কী কী প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয়?
শামীম হোসেন: একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান বিষয় হচ্ছে তার পরিবেশ এবং তার একটা নির্দিষ্ট সীমানা থাকা। ঢাকা ইউনিভার্সিটি নিজে একটা উদ্বাস্তু প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে এখানে একটু ঢাবি, ওখানে একটু ঢাবি—ওর নিজেরই কোনো সুনির্দিষ্ট এরিয়া নাই। আমরা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকে দেখি, এটি ছিল এশিয়ার প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। তখন শিক্ষকদের সাথে ছাত্ররা মাঠে খেলা করত।
অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন, একবার এক ছাত্র পায়ে ব্যথা পেয়েছে, ভিসি পানি আনতে বালতি নিয়ে দৌড় দিচ্ছে। কারণ ছেলেটা ব্যথা পেয়েছে, একটু পানি দেবে তার মাথায়। ছাত্র-শিক্ষকদের এরকম একটা ভালো সম্পর্ক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু হয়েছিল।
একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আরো দুইটা প্রতিষ্ঠান মানে বাংলা একাডেমি ও পরমাণু কেন্দ্র করা হলো। মাঝখান দিয়ে আবার একজন এসে মেট্রোরেল করে দিয়ে সবকিছু ধ্বংস করলেন। এর বেশ আগে মিন্টো রোডের জমি দখল করে মন্ত্রীপরিষদ বানানো হলো।
জমির অফিসে গিয়ে চেক করে দেখবেন আশেপাশের সব জমি ঢাবির নামে, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বানানোর জায়গা নাই। অর্ধেক শিক্ষার্থী অনাবাসিক, বাকিদের যাদের সিট আছে তারা একটা ছোট্ট সিটে ডাবলিং করে থাকে। অর্থাৎ, মৃত্যুর পর যে তিন হাত জায়গা মানুষ পায়, সেটাও ঢাবিতে শিক্ষার্থীরা পায় না। এভাবে ঢাবিকে পদে পদে শোষণ করা হয়েছে।
শিক্ষক রাজনীতি এখানে আরেকটা বড় সংকট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান নয়? একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান যদি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হন, তবে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হওয়া উচিত ছিল প্রধানমন্ত্রীর। কিন্তু উপাচার্য কেন রাষ্ট্রপতি শাসিত করা হলো? কারণ সমাবর্তনে কোনো প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিতে পারেন না এবং তিনি আমন্ত্রিত হতে পারেন না, কারণ বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় রাজনৈতিক আধিপত্যের বাইরে থাকা উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন কিছু লোকজনের চাকরি দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কর্মসংস্থান করা ছাড়া অন্য কোনো কাজে লাগে বলে আমি মনে করি না। তবে এখানে কিছু কিছু বিভাগ খুব ভালো করছে। একটা সময় ১০ শতাংশ বিদেশি শিক্ষক ছিলেন ঢাবিতে, তখন শিক্ষার মান যথেষ্ট ভালো ছিল। আমার নিজের ইংরেজি বিভাগে অনেক বিখ্যাত শিক্ষক আছেন যারা অসাধারণ পড়ান; কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পদে আমরা যাদেরকে দেখি, আসলে তাদের প্রোফাইল দেখলে হতাশ হতে হয়।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি এবং তারুণ্যের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
শামীম হোসেন: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ছাত্র রাজনীতি করছে, ১৭ থেকে ১৮ বছর ধরে একটা দলের জন্য তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদেরকে ঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। আমরা আসলে যাদেরকে নেতা হিসেবে দেখতে চাই, তাদের সন্তানেরা ঠিকই অক্সফোর্ড-কেমব্রিজে পড়ে এসে এখানে নেতৃত্ব গ্রহণ করছে।
দেশের তরুণদের একটা সুসংগঠিত রূপ থাকা উচিত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় অর্থনৈতিক কারণে নতুন দল গঠন করা খুব কঠিন। অনেকগুলো তরুণদের পার্টি নষ্ট হয়ে গেছে কেন? কারণ রাজনীতির পেছনে যে একটা অর্থনীতি আছে, যাকে আমরা ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি’ বলি, সেটা কে দেবে? একটা ফ্লোর ভাড়া করে ছোট একটা অফিস নিতে গেলেও যে টাকা দরকার, সেটা তারা কোথায় পাবে? আমরা না হয় অনেকেই নিজের পকেটের টাকা নষ্ট করে শখ হিসেবে রাজনীতি করেছি; কিন্তু সবার ক্ষেত্রে এটা সম্ভব হয় না। এই আর্থিক সংকটের কারণেই তরুণরা বড় দলগুলোতে যোগ দিতে বাধ্য হয়।
সেই জায়গা থেকে আমি মনে করি তরুণদের আগে নিজেকে ডেভেলপ করা উচিত। দিনশেষে নিজের স্কিল থাকতে হবে। কারণ বিদ্বান পৃথিবীর সব জায়গায় সম্মান পায়, কিন্তু রাজা শুধু নিজের দেশে। তরুণদের ভেতরে এই জিনিস নিয়ে আসা উচিত যে—আমি যদি যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তি হই এবং নিজের যদি অর্থনৈতিক উন্নতি হয়, তাহলে পৃথিবীর কেউ আমাকে কিনতে পারবে না, কেউ অবমূল্যায়ন বা পদদলিত করতে পারবে না।
আমাদের যখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকে না, তখনই আমরা বিগড়ে যাই। মানুষের ভাত-কাপড়ের ভাবনা থেকে না বের হওয়া পর্যন্ত আপনি কখনোই রাজনীতিতে একক ব্যক্তি হিসেবে মজবুত হতে পারবেন না। সবার আগে ইনকাম সোর্স বের করতে হবে। উপার্জন না থাকলে ছাত্র রাজনীতি বলুন আর যে রাজনীতিই বলুন, আপনাকে সারা জীবন দাসত্ব করে যেতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
শামীম হোসেন: এখন আসলে ভোটের রাজনীতি এবং যুক্তিনির্ভর রাজনীতি পুরোপুরি আলাদা। আমি নিজেকে সাধারণ মানুষ দাবি করি, আমি নিজেও গ্রাম থেকে এসেছি। আমি যেহেতু সরাসরি কোনো দলে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছি না, তাই আমি একজন সাধারণ ভোটার। সাধারণ মানুষের ভাষা কেন আমরা অনুধাবন করতে পারি না? আমরা আসলে আজ পর্যন্ত এমন কোনো পার্টি পাই নাই যারা শতভাগ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। তবে বিএনপি যথেষ্ট জনমুখী দল, কারণ বিএনপিতে সবচেয়ে বেশি সাধারণ মানুষ আছে।
বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় এসেছে। আমার কাছে নির্বাচন সুষ্ঠু মনে হয়েছে। কারণ, এখানকার প্রধান দুটি দলই একসময় জোটে ছিল। ফলে আমরা প্রথম এমন একটা নির্বাচন দেখেছি, যে নির্বাচনে কোনো মানুষ আমার জানামতে নিহত হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের হয়তো অনেক কিছু নিয়ে সমালোচনা আছে—বিশেষ করে মবতন্ত্র বা নানা কিছু নিয়ে আমরা হতাশ ছিলাম। কিন্তু এই নির্বাচনের প্রশংসা করা উচিত। কারণ, অন্তত শান্তিপূর্ণভাবে এবং কোনো প্রাণহানি ছাড়াই আমরা একটা নির্বাচন পেয়েছি। বিষয়টা খুবই প্রশংসাযোগ্য।
এশিয়া পোস্ট: আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজপথে নানান দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রতিনিয়ত আন্দোলন হতে দেখেছি। এই সরকারের সময়ে সব দাবি কি পূরণ হয়ে গেছে? সেই আন্দোলনকারীরা হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলেন কেন?
শামীম হোসেন: আমরা শক্তের ভক্ত, নরমের যম। বাংলাদেশে কাউকে সুযোগ দিলে দেখবেন খেতে পেলে শুতে চায়। অন্তর্বর্তী সরকার সেই অর্থে ক্ষমতার কঠোর প্রয়োগ করতে পারেনি, তারা একপ্রকার পুতুল মাত্র ছিল। এটা অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। কারণ, বাংলাদেশে একমাত্র তারাই কোনো কিছু নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে, যাদের ওয়ার্ড পর্যন্ত কমিটি আছে। বাংলাদেশে কখনো প্রতিষ্ঠান (Institution) এককভাবে ফাংশন করে না। আপনি চাইলেই শুধু পুলিশ দিয়ে দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না; আপনাকে দল দিয়ে দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একটা এলাকায় যদি মারামারি হয়, প্রথম বিচারটা কারা করে? স্থানীয় নেতারা করেন। কারণ, ওই এলাকার মাধ্যম তারাই। এখানে পুলিশ সরাসরি ফাংশন করতে পারে না।
ইনস্টিটিউশন বলতে আমি বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ প্রশাসন এবং আমলাতান্ত্রিক বিভাগগুলোর কথা বলছি। এগুলো যখন আলাদা করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না, তখন আমাদের সরাসরি রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভর করতে হয়, যেটাকে আমরা বলছি বন্দোবস্ত বা ম্যানেজ করা। এই ম্যানেজ করার সক্ষমতা আছে একমাত্র বড় দলগুলোর, যাদের কমিটি ওয়ার্ড পর্যন্ত আছে। না হলে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। একটা বড় দল কোথাও মারামারি বন্ধ করতে চাইলে এক-দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে না।
অন্তর্বর্তী সরকার ভেবেছিল তারা প্রশাসন দিয়ে এটা কিছু করতে পারবে। যেখানে প্রশাসনের কিছু অংশই তার বিপরীতে। ফলে সে আসলে এমন একটা সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে যে সাগরের পানি তার অচেনা। পানি ও তাকে চায় না এবং সে এর মধ্যে ডুব দিয়েছে। তো যার ফলে তার সময় প্রচুর আন্দোলন হয়েছে। সবাই ভেবেছে, যা চাইব তাই পাব। সরকার তো আমাকে কিছুই করতে পারবে না।
সরকারের সেই ক্ষমতাই ছিল না যে কোনো একটা প্রেসার গ্রুপকে সে বসিয়ে দেবে। তাদের প্রথম ভুলটা এইচএসসি দিয়ে শুরু হয়েছে। অটোপাস মনে আছে কি না? যখনই একটা উদাহরণ তৈরি হয়, মানুষ এটা ফলো করতে শুরু করে। উদাহরণ খুব সাংঘাতিক জিনিস। ফলে এটা বারবার পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে। যেহেতু প্রথমেই তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নাই।
বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে বড় দল ক্ষমতায় আছে। আন্দোলন হলে তারা আগে সমঝোতা করে ফেলতে পারবে। আমার জানামতে, ইন্টেরিম টাইমে কিন্তু বিএনপি যথেষ্ট সংযমী আচরণ করেছে। এটা প্রশংসাযোগ্য।
এশিয়া পোস্ট: শহীদ শরীফ ওসমান হাদিকে নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
শামীম হোসেন: হাদি ভাই সাইফুরসে পড়াতেন, সেই হিসেবে আমি তার সহকর্মী ছিলাম। সেখানকার ইংরেজি বইটার সম্পাদক ছিলেন তিনি। আমরা একই অনুষদে দীর্ঘদিন কাজ করেছি, প্রত্যেক মিটিংয়ে একসঙ্গে অংশ নিয়েছি। আমি যেমন স্বতন্ত্র চিন্তা করতাম, তিনিও স্বতন্ত্রভাবে বাংলাদেশকে দেখতেন। কিছু মানুষ আছে যারা আমাদের শিক্ষা দিয়ে যায় যে পৃথিবীটা কেমন হওয়া উচিত। পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ডিসকোর্স (জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা)।
আপনি বেঁচে থাকবেন না, কিন্তু আপনার আইডিয়া বেঁচে থাকবে। কার্ল মার্কসের আইডিয়া কি বেঁচে নেই? গণতন্ত্রের সংজ্ঞা আমরা প্রতিদিন বারবার বলছি। জুলাই অভ্যুত্থানের পরে স্বতন্ত্র রাজনীতি বিকাশের ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল।
ডাকসুতে আমার পরপরই হাদি ভাই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ফলে আমরা মোটামুটি একই ধরনের আইডিওলজি (মতাদর্শ) নিয়ে কাজ করেছি। তিনি জাতীয় রাজনীতিতে কাজ করেছেন, আর আমি ডাকসুর ছোট একটা প্ল্যাটফর্মে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালি মুসলমানের অগ্রগতির আসল জায়গাটি হলো সংস্কৃতি।
যার মেধা আছে, তাকে মেরে ফেললে বা বিতাড়িত করলেও তার প্রজ্ঞা বিকশিত হবেই। সংস্কৃতির জায়গায় তিনি বারবার ফোকাস করেছেন। তিনি যেমন ইনসাফের কথা বলেছেন—সেই ইনসাফ হলো শত্রুর সঙ্গেও যেন ন্যায়ের বিচার হয়। তার মানে একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে আমাদের বারবার রাজপথে আন্দোলন করতে হবে না।
আমরা তাকে জুলাই অভ্যুত্থানের একটা প্রকৃত প্রতিমূর্তি বলতে পারি। অভ্যুত্থানের ভেতর এরকম একজন আদর্শিক নেতা আমাদের দরকার ছিল। নতুন মুখ হিসেবে যারা এসেছেন, তাদের আমরা তরুণ প্রজন্মের আইডল বলছি; হাদি ভাই ছিলেন জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতীকী উদাহরণ।
আমি নিয়মিত তার সাক্ষাৎকারগুলো দেখেছি। এসব মানুষের আইডিয়া অনুসরণ করে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রে বড় ধরনের বৈপ্লবিক বা কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারে। ওসমান হাদি আমাদের একটা আলোর পথ দেখিয়ে গেছেন, এখন আমরা কতদূর যাব তা সময় নির্ধারণ করবে।
এশিয়া পোস্ট: সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি হত্যার পাশাপাশি নতুন করে ভারত থেকে পুশইন করা হচ্ছে। এর সুরাহা হতে পারে কীভাবে?
শামীম হোসেন: সবার আগে দুই রাষ্ট্রের শক্তির সমতা দরকার। সেটা অর্থনৈতিক কিংবা সামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই হতে পারে। যে রাষ্ট্র সমকক্ষ নয়, সে তার পার্শ্ববর্তী শক্তিশালী দেশ দ্বারা পরাভূত হবেই। বড় রাষ্ট্রগুলো সবসময় ছোট রাষ্ট্রগুলোকে শোষণ করে। ভারত যে শুধু আমাদের সঙ্গেই এমন করছে তা না, অনেকের সঙ্গেই করে।
ভারতবিরোধিতা আমাদের দেশে অনেকের কাছে শুধুই একটি রাজনৈতিক ভাষাগত কৌশল। একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন, যারা দেশটির সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করে, তাদের অনেকেই ভেতরে ভেতরে বড় ধরনের লিয়াজোঁ করে বসে আছে। এটা প্রমাণিত হয় যখন কিছু বছর পরপর সমীকরণ আবার উল্টে যায়।
আমরা আসলে নিজেদের কতটা উন্নত করেছি? আমাকে যদি কোনো দেশের ওপরে উঠতে হয়, সবার আগে মানবসম্পদের উন্নয়ন করতে হবে। পৃথিবীর প্রায় সব বড় প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী নিয়োগ হয় অন্য দেশ থেকে, আর আমাদের দেশের লোক সেখানে যাচ্ছে শ্রমিক হিসেবে। অথচ আমাদের সক্ষমতা আছে। বাঙালিরা একসময় জয় করেনি এমন কিছু নেই।
আমাদের কি নিজস্ব মিসাইল বা আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আছে? আমরা জানি যুদ্ধ হলে আমরা জীবন দিতে পারব, এই আত্মত্যাগের ক্ষমতা বাঙালির আছে। কিন্তু শুধু জীবন দিলে তো হবে না, আধুনিক অস্ত্রও দরকার। যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম আমাদের হাতে নেই, ততদিন আমরা এই আধিপত্য থেকে বের হব কীভাবে? মুখে বড় কথা বললে তো হবে না। যখন ওপার থেকে দেখবে যে আমাকে একটা আঘাত করলে পাল্টা দুইটা আঘাত আসবে, তখন তারা সমীহ করবে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।
শক্তির সক্ষমতা অর্জন করতে হলে নিজের সীমান্ত সুরক্ষিত করার মতো সক্ষমতা থাকতে হবে। দেখুন, পৃথিবীতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কারণে বড় রাষ্ট্রগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় না। পাকিস্তান এবং ভারতের কথাই চিন্তা করুন—ঐতিহাসিকভাবে তারা নানা সময় যুদ্ধে জড়ালেও সেই যুদ্ধগুলো আট-দশ দিনের বেশি স্থায়ী হয়নি, কারণ উভয় দেশেরই সামরিক শক্তির সমতা ও পারমাণবিক অস্ত্র আছে।
বর্তমানে ইরান যদি এটা অর্জন করে, তবে সেখানেও যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ আমাদের যদি এগিয়ে যেতে হয়, তবে প্রতিরক্ষা খাতকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী করতে হবে। নিজের ভূমি রক্ষা করার ক্ষমতা না থাকলে শুধু ইটপাটকেল দিয়ে তো আর আধুনিক বন্দুকের সামনে যুদ্ধ করা যাবে না।
এশিয়া পোস্ট: ভবিষ্যতে আপনার কোনো রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়া বা তরুণদের নিয়ে নতুন প্ল্যাটফর্ম শুরু করার সম্ভাবনা আছে কি না?
শামীম হোসেন: আমাকে নতুন প্ল্যাটফর্ম করতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। আমাদের এমন কিছু মানুষের দরকার যারা যৌক্তিক কথা বলবে। একটা বিষয় খেয়াল করবেন, সমাজে অনেকে কথা বলতে পারে না, কিন্তু যিনি সঠিক কথাটি বলতে পারেন তার একটা আলাদা মূল্য আছে। আবার ভুল কথা বললে সমাজ তা গ্রহণ করে না, ভুল কথা বলে অনেকে পালিয়ে যেতেও বাধ্য হয়েছে। তাই কথার অনেক দাম আছে।
আমি মনে করি তরুণদের অনেকের ভেতরেই দারুণ সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সঠিক নির্দেশনার অভাবে তা কাজে লাগছে না। আপাতত আমার কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা নেই, ভবিষ্যতে কী হবে তা জানি না। তবে আমাদের মূল কাজ হচ্ছে সমাজে একটি পজিটিভ ডিসকোর্স বা চিন্তার জগৎ তৈরি করা। সেটা আমি শিক্ষক হিসেবেও করতে পারি। কারণ সমাজ গঠনে একজন শিক্ষকের গুরুত্ব একজন রাজনৈতিক নেতার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।