Image description

নানাবিধ সংকটের মুখে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। বৈশ্বিক সমস্যা, জ্বালানি সংকট, কম অর্ডার, লোডশেডিং সব মিলিয়ে শিল্প মালিকরা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে আছেন। প্রায় প্রতি মাসেই বন্ধ হচ্ছে কোনো না কোনো কারখানা। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক শিল্প কারখানায় দিতে হচ্ছে লোকসান। সেই লোকসান সামাল দিতে শিল্প মালিকরা বাধ্য হচ্ছেন ‘ম্যানপাওয়ার’ কমাতে। এতেই ছাঁটাই আতঙ্কে ভুগছেন শিল্প কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা।

তৈরি পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ব্যবসায়ীদের একপ্রকার কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল। হয়রানির ভয়ে অনেক ব্যবসায়ী নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিলেন। এতে নষ্ট হয়েছে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ। সেই ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি শিল্প মালিকরা। তারা আরও জানান, গত ১১ মাসের মধ্যে এক-দুই মাস প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও অন্য মাসগুলোতে ছিল নিম্নমুখী। এই ধারা এখনো অব্যাহত।

ঢাকার সাভারে অনেক তৈরি পোশাক শিল্প কারখানা অবস্থিত। সেখানেও অনেক শিল্প কারখানা তাদের লোকবল কমিয়েছে। চাকরিচ্যুত করেছে অনেক শ্রমিককে। সম্প্রতি সাভারের আল-মুসলিম গ্রুপের ৭ পোশাক কারখানার মোট ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে শ্রমিকরা সাভারের রেডিও কলোনি ও উলাইল ও আশুলিয়ার জিরাবো এলাকায় কারখানার সামনে প্রতিদিন জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করছেন। শ্রম আইন অনুসরণ না করা, পাওনা পরিশোধ না করার প্রতিবাদে ও চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সার্ভিস লেনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা।

বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে বর্তমানে ৪৬০টি তৈরি পোশাক কারখানা চালু আছে। সবই মাঝারিশিল্প। লোকসানসহ নানা সমস্যায় গত এক বছরে বেশ কয়েকটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানা থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে শ্রমিক। জানা গেছে, নগরীর কালুরঘাট এলাকার একটি বড় পোশাক কারখানার শ্রমিকরা দীর্ঘদিন বেতন পাচ্ছেন না। ওই কারখানার শ্রমিকদের অন্যত্র চাকরি খুঁজে নিতে মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৮৩৪টি পোশাক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার বেশির ভাগেই আগে থেকে উৎপাদন কমেছে। হাতেগোনা বড় বড় কয়েকটি কারখানা কোনো রকম উৎপাদন ধরে রাখতে পারলেও ছোট কারখানাগুলোর জন্য টিকে থাকাই কষ্টকর বলছে কর্তৃপক্ষ। টিকে থাকার লড়াইয়ে অনেক শিল্প কারখানা অনেক কর্মীকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের চাকরিচ্যুত ইউনাইটেড গার্মেন্টের সুপারভাইজার মো. কবির হোসেন বলেন, গত কয়েকমাস ধরেই আমার বেতন দিচ্ছিল না। এরই মধ্যে হঠাৎ করে আমিসহ অনেককেই ছাঁটাই করে দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় আামাদের মানবেতর দিনযাপন করতে হচ্ছে।

আবির ফ্যাশনের শ্রমিক মো. মিজান বলেন, ঈদের পর গার্মেন্টে যাওয়ার পরই মালিকপক্ষ বলছে তাদের অর্ডার নেই। তাই আমাদের কোনো কাজ নেই। ফলে আমাদের আর প্রয়োজন নেই। আমাদের আর গার্মেন্টে আসতে হবে না। আমরা যেন অন্য কোথাও কাজ খুঁজে নেই। কিন্তু এই সময়ে কোথায় কাজ খুঁজে পাব তার কোনো নিশ্চয়তা পাচ্ছি না। এই অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চিন্তায় আছি। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বলেন, আমরা লক্ষ্য করছি ঈদের পূর্বে এবং পরে ব্যাপকভাবে শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে। ঈদের পরে ইউনাইটেড গার্মেন্ট বন্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে। আবির ফ্যাশনের শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আর এভাবে প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকলে শিল্পাঞ্চলে ব্যাপক অস্তিরতা চলে আসতে পারে। গত কয়েক মাসের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জে প্রায় ২ হাজারেও বেশি শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে গাজীপুরে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বড় ধরনের কোনো ঘটনা না থাকলেও জেলার কিছু কিছু কারখানায় নানা কারণে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের চান্দনা এলাকায় অবস্থিত লিবাস নিটওয়্যার লিমিটেড কারখানার কয়েকজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত মে মাসে তাদের কারখানায় কয়েকজন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছিল।

এখন কারখানার কাজকর্ম স্বাভাবিক চলছে। তাদের মধ্যে ছাঁটাই আতঙ্ক কাজ করছে বলে তারা জানান। গাজীপুর শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কারখানায় কাজের অর্ডার কম থাকা, কাজের অর্ডারের তুলনায় শ্রমিক বেশি হওয়ায়, শ্রম অসন্তোষ সৃষ্টির অভিযোগ, শ্রমিকদের মাঝে অযৌক্তিক দাবি, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ও কারখানার নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগসহ নানা কারণে চলতি বছরের গত ১৭ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত গাজীপুর জেলার ১৯টি কারখানার ৫৬০ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। এসব কারখানা গাজীপুর সিটি করপোরেশনের চান্দনা, বাসন, কোনাবাড়ী, টঙ্গী, কাশিমপুর, গাছা এবং জেলার গাজীপুর সদর, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর উপজেলা এলাকায় অবস্থিত। জানতে চাইলে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কেউ তো ইচ্ছাকৃত শ্রমিক ছাঁটাই করে না। ব্যবসার অবস্থা খারাপ এটা সত্য কথা। আমরা সবসময় বলি, ছাঁটাই করতে হলে কর, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সবার প্রাপ্য পাওনা মিটিয়ে দিতে হবে। 

তিনি বলেন, আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলেই আমরা আশঙ্কা করছি। যে ইঙ্গিতগুলো দেখছি, তা খুব একটা সুখকর নয়। পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ দেখছি। আমরা চাই সবাই টিকে থাকুক। টিকে থাকার জন্য যদি কেউ মনে করে কিছু শ্রমিক কমিয়ে প্রতিষ্ঠানকে শক্ত অবস্থানে রাখতে হবে, সেটি তাদের সিদ্ধান্ত। কিন্তু যার যা পাওনা, তা অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। পরিস্থিতি দুঃখজনক, কিন্তু এটাই বাস্তবতা। শ্রমিক ছাঁটাই পরিস্থিতি নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের পরিচালক মমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যেসব কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে, সেখানে মালিক পক্ষ শ্রম আইন অনুযায়ী নোটিস দিচ্ছে এবং শ্রমিকদের প্রাপ্য পাওনা পরিশোধ করেই ছাঁটাই কার্যক্রম সম্পন্ন করছে বলে আমরা জেনেছি। তবে অনেক শ্রমিকের অভিযোগ, ঈদের ছুটিতে যাওয়ার পর ফিরে এসে তারা চাকরি হারানোর বিষয়টি জানতে পারছেন। মূলত চাকরি হারানোই তাদের বড় উদ্বেগের কারণ। যেসব এলাকায় শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে বা এমন পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে শিল্প পুলিশ নজরদারি ও মোতায়েন জোরদার করেছে জানিয়ে তিনি বলেন কোথাও যাতে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সেজন্য আমরা কাজ করছি। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে মালিক পক্ষ ও শ্রমিক পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও মধ্যস্থতার ভূমিকাও পালন করছি।