প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই পানির খোঁজে বের হতে হয় রূপগঞ্জের মর্তুজাবাদের মনসুর মিয়াকে। কখনো পাশের গ্রামের নলকূপ, কখনো প্রতিবেশীর বাড়ি। যেখানেই পানি মেলে, সেখানেই ছোটেন তিনি। অথচ তার বাড়ির সামনেই রয়েছে কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্পের পাইপলাইন। তবে সেটি চার মাস ধরে অচল।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা ও মর্তুজাবাদ এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ। এ এলাকার মানুষের পানির চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নেওয়া হয় পানি সরবরাহ প্রকল্প। ২ কোটি ১৪ লাখ টাকার এ প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে থাকায় তিন শতাধিক পরিবার এখন দিন কাটাচ্ছে তীব্র পানি সংকটে। অনেককে দূরদূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, কেউ কিনে আনছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে পুকুর, দীঘি কিংবা ব্যবহার করছেন নদীর পানি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটি চালু অবস্থায় প্রতিটি সংযোগের জন্য খরচ করতে হয়েছে কয়েক হাজার টাকা। মাসে মাসে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ বিলও; কিন্তু এখন পানি না পেয়ে তারা চরম ভোগান্তির শিকার।
মর্তুজাবাদ এলাকার মনসুর মিয়ার ভাষায়, যাদের সামর্থ্য আছে তারা পানি তুলছেন গভীর নলকূপ বসিয়ে; কিন্তু আমাদের মতো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের নেই সে সুযোগ। অন্যের বাড়ি থেকে পানি এনে মেটাতে হচ্ছে প্রয়োজন। অনেক সময় টাকা দিয়েও কিনতে হচ্ছে পানি।
একই অভিযোগ ভুলতা এলাকার কামরুন নাহারের। তিনি জানালেন, খাবার পানি কোনোভাবে সংগ্রহ করা গেলেও গোসল, কাপড় ধোয়া কিংবা গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে পানি পাওয়া বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘অনেকে পানি ব্যবহার করছেন পাশের দীঘি থেকে এনে; কিন্তু সেই পানি ময়লা, দুর্গন্ধযুক্ত। এতে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে’— বলেছেন তিনি।
পাড়াগাঁও এলাকার গার্মেন্টসকর্মী মোশারফ হোসেনের ভাষ্য, সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছি আমরা শ্রমিকরা। সময়মতো কাজে যেতে হয়, কিন্তু পানি না থাকায় গোসল, কাপড় ধোয়া— সবকিছুতেই সমস্যা।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় ২০২১-২২ অর্থবছরে ‘পাইপ ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রায় ১ লাখ লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। দুটি পাম্পের মাধ্যমে ভুলতা দীঘিরপাড় এলাকায় সরবরাহ করা হতো পানি।
প্রকল্প বাস্তবায়নের পর চুক্তি অনুযায়ী হাবিব এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান দুই বছর পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় পানি সরবরাহ। এরপর চার মাস ধরে পুরো প্রকল্পটি কার্যত অচল।
এলাকাবাসীর দাবি, কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো এখন ব্যবহার না হওয়ায় সরকারি অর্থেরও অপচয় হচ্ছে। পানি সংকট শুধু দৈনন্দিন ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, তৈরি করছে নতুন ঝুঁকিও। গোসল ও অন্যান্য কাজে পুকুর কিংবা দীঘিতে গিয়ে শিশুদের দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
হ্যান্ডওভার প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগছে। তবে দ্রুত সমস্যার সমাধান করার কথা জানিয়েছেন রূপগঞ্জ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মুকিত আল মাহমুদ। তিনি বলেছেন, ‘প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এবং এটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। বর্তমানে প্রকল্পটি ইউনিয়ন পরিষদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।’
স্থানীয়দের মতে, প্রকল্পটি চালু হলে এলাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মুক্তি পাবে পানি সংকট থেকে। একই সঙ্গে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি হবে না এমন পরিস্থিতির। ততদিন পর্যন্ত রূপগঞ্জের শত শত পরিবারের কাছে বিশুদ্ধ পানি একটি মৌলিক অধিকার নয়, বরং প্রতিদিনের সংগ্রামের নাম।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জয় জানালেন, ১ লাখ লিটার ধারণক্ষমতার এই পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো হস্তান্তর হয়নি ইউনিয়ন পরিষদের কাছে।
তিনি বলেছেন, ‘প্রকল্পটি প্রায় চার মাস ধরে বন্ধ। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পানি সরবরাহ চালু করার চেষ্টা করছি আমরা।’