Image description

এবারের বাজেটকে নিছক রাজস্ব আহরণ ও ব্যয় বরাদ্দের দলিল হিসেবে দেখতে নারাজ অর্থমন্ত্রী। তার ভাষায়, এটি মূলত অর্থনৈতিক দর্শনের পরিবর্তনের একটি প্রচেষ্টা— একটি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার রূপরেখা। যেখানে রাষ্ট্রের নীতির কেন্দ্রে থাকবে সাধারণ মানুষ, উৎপাদনশীল খাত ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার। এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ।

গতকাল শুক্রবার বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রস্তাবিত বাজেটকে এভাবে মূল্যায়ন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে দেশের অর্থনীতির নাজুক বাস্তবতা তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় সরকারের কৌশলও ব্যাখ্যা করেন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে ব্যাংক খাতের আস্থাহীনতা, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে নানা প্রশ্নের জবাব দেন অর্থমন্ত্রী।

এক প্রশ্নের জবাবে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, বিগত সময়ে দেশকে অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিয়ে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল জ্বালানি খাতকে। আর এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানালেন, প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো বিধান রাখা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকের সংকটের সমাধান শিগগিরই হবে। আমানতকারীদের টাকা তুলতে কোনো সমস্যা হবে না। তবে পুরো ব্যাংক খাতের আমানতের এক-তৃতীয়াংশ চুরি হয়ে গেছে— যোগ করেন তিনি।

এটি শুধু বাজেট নয়: অর্থমন্ত্রী বললেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বৈশ্বিক যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ আর্থিক খাতের দুর্বলতা— সব মিলিয়ে অর্থনীতি পরিচালনা সহজ নয়। আমাদের সম্পদ সীমিত, চাহিদা অসীম। তাই কোথায় ব্যয় করলে সবচেয়ে বেশি সুফল পাওয়া যাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তার মতে, সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে চারটি বিষয় সামনে রাখা হয়েছে— ভ্যালু ফর মানি, বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাবর্তন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব।

বাজার পুলিশ দিয়ে চলে না: অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিন বছর ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে আছে। ইউক্রেন যুদ্ধ হয়েছে, এখন মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত চলছে। এসব কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বেই। তার অভিমত, ব্যাংক খাতের দুর্বলতাও মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে। এ খাতে যে লুটপাট হয়েছে, তাতে তৈরি হয়েছে মূলধনের ঘাটতি। অর্থের দাম বেড়েছে। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে। ব্যবসায়ী তার খরচ শেষ পর্যন্ত সমন্বয় করে নেয় পণ্যের দামের মধ্যে।

আমির খসরুর মতে, একটি ব্যবসা শুরু করতে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় লাগে। কোম্পানি নিবন্ধন, অনুমোদন, লাইসেন্স সংগ্রহসহ নানা ধাপ পেরোতে হয়। এসব ক্ষেত্রে সময় ও অর্থের অপচয় হয়। বন্দর থেকে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রেও অদক্ষতা ও অতিরিক্ত ব্যয় রয়েছে। ফলে ব্যবসার সামগ্রিক খরচ বেড়ে যায়। সরকার এসব অদক্ষতা দূর করতে সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস কমানো গেলে মূল্যস্ফীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন।

অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, বাজার নিয়ন্ত্রণ পুলিশ বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সম্ভব নয়। মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হয় সঠিক নীতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে। এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমতে পারে: সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বললেন, বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ১১ বছর ধরে নতুন পে-স্কেল হয়নি। কিন্তু এ সময়ে মূল্যস্ফীতি হয়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মানুষের প্রয়োজনও বেড়েছে। তিনি স্বীকার করেন, দুর্নীতির পেছনে বহুমাত্রিক কারণ থাকলেও আর্থিক অনিশ্চয়তা তার একটি উপাদান। আমি বলছি না শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতি কিছুটা কমে আসবে।

কর্মসংস্থান

কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলছিলেন, বাজেটে কর্মসংস্থানের বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি সচেতনভাবেই। যদি বলি পাঁচ লাখ চাকরি হবে, সেটি বাস্তবে নিশ্চিত করতে না পারলে তা দায়িত্বশীল বক্তব্য হবে না। কর্মসংস্থান তৈরি হয় বিনিয়োগের মাধ্যমে। আমাদের কাজ হচ্ছে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বিনিয়োগ বাড়বে, শিল্প সম্প্রসারিত হবে এবং উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত হবেন। এজন্য আইসিটি, কৃষি, স্বাস্থ্য, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশে কর্মসংস্থানকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গভর্নরের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি

সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, আমরা যখন দায়িত্ব নিয়েছি, তখন দেখেছি ব্যাংক খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমানত কার্যত চুরি হয়ে গেছে। আর খেলাপি ঋণের হার ৩৫ থেকে ৩৬ শতাংশ। আমাদের প্রথম কাজ ছিল আতঙ্ক ঠেকানো এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সচল রাখা। মানুষ যেন ব্যাংকে গিয়ে টাকা তুলতে পারে, সেই আস্থা ফিরিয়ে আনাই ছিল আমাদের প্রথম লক্ষ্য।

ব্যাংক খাত নিয়ে জনমনে আতঙ্কের বিষয়ে গভর্নরের ভাষ্য— সব ব্যাংককে এক কাতারে ফেলা ঠিক হবে না। কিছু ব্যাংকে তারল্য সংকট আছে, বিশেষ করে কয়েকটি ইসলামি ধারার ব্যাংকে। মানুষের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের বিষয়ে স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স কাজ করছে। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের সম্পদ উদ্ধারের সাফল্যের হার ২ শতাংশেরও কম। সাত থেকে দশ বছর সময় লাগে। তবে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, আমরা চেষ্টা ছেড়ে দেব না। যারা অর্থ পাচার করেছে, তাদের খুঁজে বের করা হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা

বিদ্যুৎ, জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, গত দেড় দশকে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। দেশকে অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। বাপেক্সকে কার্যত নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছিল। নতুন রিগ সংগ্রহ, দেশীয় অনুসন্ধান বৃদ্ধি এবং সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও বাংলাদেশে বড় ধরনের সংকট হয়নি। কাতার ও সৌদি আরবের সঙ্গে তৈরি হয়েছিল কিছু জটিলতা। কিন্তু বিকল্প উৎস থেকে সংগ্রহ করে সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছি। তিনি আরও জানালেন, উচ্চমূল্যের আইপিপি চুক্তি এখন বড় আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। অনেক চুক্তি এমনভাবে করা হয়েছিল, যেখান থেকে সহজে বেরিয়ে আসা যায় না। তবে আইনগত পর্যালোচনার মাধ্যমে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কালো টাকা সাদার সুযোগ রাখা হয়নি

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান জানিয়েছেন, এবারের বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার জন্য কোনো বিশেষ বিধান রাখা হয়নি। তবে অতীতে জমি ও সম্পত্তি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অনেক ক্রেতা-বিক্রেতা প্রকৃত লেনদেন মূল্যের পরিবর্তে কম মূল্য প্রদর্শন করতেন। কারণ, সরকার নির্ধারিত মৌজা রেট বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় সেই সুযোগটি তৈরি হয়েছিল। এতে প্রকৃত অর্থের একটি অংশ অঘোষিত থেকেই যেত এবং কার্যত কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি হতো।

তার ভাষ্য, মৌজা রেটের বিষয়টা যে সত্যিকার ভ্যালু থেকে অনেক কম থাকে, সেটা আপনারা সবাই জানেন। এ কারণেই সম্পত্তি নিবন্ধনের সময় অনেকে প্রকৃত মূল্য না দেখিয়ে কম মূল্য প্রদর্শন করেছেন। সরকার এখন উদ্যোগ নিয়েছে মৌজা রেটকে বাস্তব বাজারমূল্যের কাছাকাছি নিয়ে আসার।