নতুন অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার । বাজেটে অনেক ভোগ্যপণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করা না হলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে এমনিতেই অস্থিরতা বিরাজ করছে। ফলে কয়েক বছর ধরে চলা তীব্র মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের কাছে বাজেট নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ নেই।
গতকাল বৃহস্পতিবার কেরানীগঞ্জের বউবাজার, হাতিরপুল, নয়াবাজার ও কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের কাছে বাজেটের একমাত্র বাস্তবতা পরদিন সকালে বাজারে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য বাড়তি টাকা গুনতে হবে কি না।
গতকাল বিকালে কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের মুদি ব্যবসায়ী ইমাম উদ্দিন বাবলু আমার দেশকে বলেন, বাজেটের এত হিসাব আমরা বুঝি না। কিন্তু বাজারে বেশিরভাগ পণ্যের দামই বাড়তির দিকে। তিনি বলেন, বাজেটে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের ওপর নতুন কর ও শুল্ক আরোপ করা না হলেও বাজারে বিশাল সিন্ডিকেট সক্রিয়। এ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে বাজেটে যাই বলা হোক না কেন, তাতে বাজারে কোনো প্রভাব পড়বে না।
অপর ব্যবসায়ী আজমত উল্লাহ বলেন, বাজেট ঘোষণার আগেই তো চাল, ডাল, ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে আমদানি করা পণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে সরকার ভোগ্যপণ্যের ওপর নতুন কর ও শুল্ক আরোপ না করাতে তেমন কিছু আসে যায় না। ব্যবসায়ীদের দাবি, পরিবহন খরচ ও জ্বালানি তেল-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পরোক্ষ প্রভাবের কারণে পাইকারি পর্যায়েই দাম বেড়েছে। ফলে খুচরাবাজারে আরো বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে পণ্য।
কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী উজ্জ্বল বখত বলেন, বাজেটের খবরে সবকিছুর দাম যেন নতুন করে ডানা মেলেছে। বাজারের যে অবস্থা, তাতে মাসিক বাজেট মেলানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। আমরা সাধারণ মানুষ কোনো ছাড় পাচ্ছি না, শুধু নিত্যপণ্যের দামের বোঝা বাড়ছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কামাল হোসেন আকাশ মাসে বেতন পান ৩০ হাজার টাকা। গত কয়েক বছরে তার বেতন না পারলে বেড়েছে পণ্যের দাম। তার পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ, বাসাভাড়া ও সন্তানের শিক্ষা খরচ মেটাতে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। ফলে প্রতি মাসেই তাকে সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বাজেট নিয়ে আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের বড় কোনো চাওয়া নেই। সরকার কত টাকার বাজেট দিল, তা দিয়ে আমাদের কী হবে? যা বেতন পাই তা দিয়ে সংসার চলছে না। বাজারে চাল-ডালের দাম একটু কমলে আমরা শান্তিতে দুমুঠো ভাত খেয়ে বাঁচতে পারব। তাই বাজেটে আমাদের দৃষ্টি থাকে পণ্যের দাম কমা-বাড়ার ওপর।
বিক্রেতারা অবশ্য নিজেদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরছেন। খুচরা বিক্রেতা নাজির হোসেন বলেন, আমরা বেশি দামে কিনি, তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। পাইকারি আড়ত থেকেই দাম বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে। আমরা তো ইচ্ছা করে দাম বাড়াই না, আমাদেরও তো লাভের বিষয় আছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের আগের তুলনায় চালের দাম বাড়তি। পাইকারি বাজারে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মিনিকেট চালের দাম মানভেদে কেজিপ্রতি বেড়েছে পাঁচ থেকে ১০ টাকা, আটাশ চালের দামও কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। এছাড়া পোলাও চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২৫ টাকা। মাছ ও মুরগির দামও কিছুটা বাড়তি লক্ষ করা গেছে। তবে ঈদের আগের তুলনায় সরবরাহ বেড়ে সবজির দাম অর্ধেকে নেমেছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের আমার দেশকে বলেন, বাজেটের আগেই দুদফা তেল-গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। এখন যে সরকার অনেক পণ্যের ওপর থেকে কর ও শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিয়েছে এর সুবিধা সাধারণ মানুষ না-ও পেতে পারে।
এছাড়া তদারকি সংস্থাগুলোর এক প্রকার নিশ্চুপ থাকার কারণে মনে হচ্ছে, অসাধু ব্যবসায়ীদের ক্রেতার পকেট কাটতে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের ত্রাহি অবস্থা। এ পরিস্থিতিতে বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকিতে সরকার নজরদারি না বাড়ালে বাজেটের কোনো সুফল সাধারণ জনগণ ভোগ করতে পারবে না। তাই বাজেটের ইতিবাচক প্রভাব নির্ভর করছে সরকারের বাজেট পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপর।