‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি’, ‘অপরাধী হইলেও আমি তর’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’- এর মতো কালজয়ী গানের স্রষ্টা উকিল মুন্সী। তাঁর কোনো ছবি নেই। গবেষকেরাও তার কোনো ছবির সন্ধান দিতে পারেননি। অনলাইন বিভিন্ন প্লাটফর্মে উকিল মুন্সী নামে যে ছবি পাওয়া যায়, সেটিও সঠিক নয়।
কালজয়ী এই মরমীসাধক দেখতে কেমন ছিলেন, সেই বর্ণনা পরিবারের সদস্য এবং স্বজনদের কাছ থেকে জেনে তাঁর প্রতিকৃতি আঁকলেন কয়েকজন চিত্রশিল্পী। ইতোমধ্যে শিল্পী এ জেড শিমুলের আঁকা একটি প্রতিকৃতি প্রকাশ্যে এসেছে।
অন্যদিকে কুন ক্রিয়েটিভ স্টুডিওর উদ্যোগে আঁকা আরেকটি প্রতিকৃতি আজ শুক্রবার এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উন্মোচন করা হবে। যে চিত্রশিল্পীরা উকিল মুন্সীর প্রতিকৃতি এঁকেছেন, তাদের কেউই উকিলকে সরাসরি দেখেননি। ফলে তাদের ক্যানভাসে উকিলের মুখাবয়ব কতটা ধরা দিয়েছে, তা নিয়ে কৌতুহলী হয়েছেন অনেকে।
উকিল মুন্সীকে কাছ থেকে দেখেছেন তাঁর নাতি পারুল মিয়া। আগামীর সময়কে পারুল মিয়া বলেছেন, ‘যে প্রতিকৃতি আঁকা হয়েছে, সেটা পুরোপুরি না হলেও কিছুটা মিলেছে।’
আরেক নাতি কুলকুল আহমেদের ভাষ্য, ‘একটু হইছে। পুরোপুরি হয় নাই।’ যদিও উকিল মুন্সীকে দেখার স্মৃতি কুলকুলের মনে নেই। কারণ তখন তার বয়স ছিল দেড় বছর।
গবেষকরা মনে করছেন, উকিল মুন্সীর গুরুত্ব মুখাবয়বে নয়, জীবন-দর্শনে। ফলে উকিল মুন্সীর ছবি আঁকাটা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ নয়। বরং তাঁর জীবনদর্শনকে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়াটা বেশি জরুরি।
উকিল মুন্সির জন্ম নেত্রকোনার খালিয়াজুরি উপজেলার নূরপুর বোয়ালী গ্রামে ১৮৬৫ সালে। পরবর্তী সময়ে তিনি মোহনগঞ্জের জৈনপুর গ্রামে থিতু হন। সেখানেই ১৯৭৮ সালে প্রয়াত হন।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে নেত্রকোনায় শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে হয়েছিল উকিল মুন্সির স্মরণানুষ্ঠান। ওই অনুষ্ঠানের ব্যানারে উকিল মুন্সির ছবি মনে করে যে ছবি ব্যবহৃত হয়েছিল, তা ছিল সুনামগঞ্জের বাউলশিল্পী কামাল পাশার। এ নিয়ে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন আয়োজকেরা। তখনই মূলত উকিল মুন্সীর যে ছবি নেই, তা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি হয়।
যেভাবে আঁকা হলো
ঢাকার কুন ক্রিয়েটিভ স্টুডিওর উদ্যোগে সম্প্রতি একদল চিত্রশিল্পী নেত্রকোনায় ঘুরে উকিল মুন্সীর পরিবার এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে একটি মুখাবয়ব এঁকেছেন। এই দলটির কিউরেটর হিসেবে কাজ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষক ইমাম হোসেন সুমন। মুখাবয়ব এঁকেছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন জয়। উকিল মুন্সীর ছবি উদঘাটনের এই দলে আরো ছিলেন শিমুল কুম্ভকার, ফাবিয়া তামান্না, রিফাতুজ্জামান জয়।
ইমাম হোসেন সুমন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা উকিল মুন্সীর পরিবারসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। নানা মাধ্যম থেকে তথ্য নিয়েছি। যত রকমভাবে বিষয়টি নিয়ে কাজ করা যায়, চেষ্টা করেছি। ১০/১২টা স্ক্যাচ আঁকার পর ফাইনালি একটি মুখাবয়ব পেয়েছি, যা দেখে পরিবারের সদস্য এবং উকিল মুন্সীকে দেখেছেন এমন স্বজনেরা নিশ্চিত করেছেন যে এটা হয়েছে।’
উকিল মুন্সীর নাতি কুলকুল আহমেদ বলেছেন, তার সঙ্গে এই দলটির আলাপ হয়েছে। তিনি তাদের সহযোগিতা করেছেন। যে ছবিটি আঁকা হয়েছে, তা পুরোপুরি হয়নি। তবে নাক, চোখ কিছুটা মিলেছে বলে স্থানীয়রা তাকে বলেছেন। এজন্য তিনি ছবিটি প্রদর্শনের জন্য সম্মতি দিয়েছেন।
কুন ক্রিয়েটিভ স্টুডিওর আঁকা ছবিটির দলে ছিলেন শিমুল কুম্ভকার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের একজন সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘নানা রকমভাবে গবেষণার মধ্যদিয়েই চিত্রকর্মটি আঁকা হয়েছে। শতভাগ হয়েছে বলবো না, তবে অনেকটাই কাছাকাছি আঁকা হয়েছে বলে মনে করি।’
উকিল মুন্সীর জন্মবার্ষিকী স্মরণে আজ শুক্রবার হাজারীবাগে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে কুন ক্রিয়েটিভ স্টুডিও। ‘বিচ্ছেদের বাজার: বিরহের ঐতিহ্য এবং সমকালীন বিচ্ছিন্নতার পুনর্পাঠ’ শীর্ষক এই আয়োজনে থাকবে প্রদর্শনী, আলাপ ও গান। এই অনুষ্ঠানেই উকিল মুন্সীকে আঁকা পোট্রেটেরও উদ্বোধন করা হবে।
যে উকিল মুন্সীকে দেখা গেল
উকিল মুন্সীর জন্মবার্ষিকী ছিল গতকাল বৃহস্পতিবার। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে তার জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী হয়। সেখানে দেখানো হয় প্রামাণ্যচিত্র ‘একতারার ইমাম’। চলচ্চিত্রটি রচনা ও পরিচালনা করেছেন গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা অনার্য মুর্শিদ।
এই আয়োজনের আমন্ত্রণপত্রে ব্যবহৃত হয় একটি আঁকা প্রতিকৃতি। যেখানে সাদা দাড়িতে শুভ্র উকিল মুন্সীকে দেখা যায়। নির্মাতা অনার্য মুর্শিদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘প্রামাণ্যচিত্রটির কাজ করতে গিয়ে চিত্রশিল্পী এ জেড শিমুল একটি প্রতিকৃতি এঁকেছেন। উকিল মুন্সীর কোনো প্রকৃত আলোকচিত্র না থাকায় তার বেঁচে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের বর্ণনার ভিত্তিতে এটি আঁকা হয়েছে।’
শিল্পী এ জেড শিমুল আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘একতারার ইমাম প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সময় নির্মাতা অনার্য মুর্শিদের সঙ্গে প্রতিকৃতিটি আঁকার ব্যাপারে আলাপ হয়। সেটি প্রায় তিন বছর আগে আমরা পরিকল্পনা করি। এবার সেটি করা সম্ভব হলো। এটি করতে গিয়ে আমার একটি অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি যেহেতু ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগে পড়েছি এবং বিমূর্ত ধারার চিত্রকলার চর্চা করি। এই কাজটি আমাকে ভীষণ সমৃদ্ধ করেছে।’
কাজটি কীভাবে সম্পন্ন হলো, প্রশ্নে শিমুল বলেছেন, “আমি যে পরিবারে জন্মেছি, সেটি একটি সুফি ঘরানার পরিবার। ফলে ছোটবেলা থেকে এই ভাবধারার মানুষের সঙ্গে আমার সখ্যতা আছে। ২০১৭ সালে ‘সুফি সংগীতের ভাব’ শিরোনামে আমার শিল্পকর্ম প্রদর্শনী হয়েছে। যেখানে তেলরং, অ্যাক্রিলিক ও মিশ্র মাধ্যমে এঁকেছি জালালুদ্দিন রুমি, লালন, বাউলদের ও সুফি সংগীতের সঙ্গে নৃত্যরত শিল্পীদের ছবি। সেই অভিজ্ঞতা এখানে কাজে লেগেছে। উকিল মুন্সীকে যারা দেখেছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। সেই এলাকা নিয়ে গবেষণা করে উকিল মুন্সীর মুখাবয়ব এঁকেছি।”
কতটা উকিল মুন্সীকে দৃশ্যমান করতে পেরেছেন, জানতে চাইলে শিমুল বলেছেন, “এটা বলা মুশকিল। যারা উকিল মুন্সীকে দেখেছেন, তারা দেখে বিচার করতে পারবেন। উকিল মুন্সী শেষ জীবনে পারুল মিয়া নামে তার এক নাতির সান্নিধ্যে ছিলেন। পারুল মিয়া আমাকে বলেছেন, আমি উকিল মুন্সীকে অনেকটাই আঁকতে পেরেছি।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পারুল মিয়া আগামীর সময়কে বলেন, “যে ছবিটা আঁকা হইছে, সেটা কিছুটা হইছে। পুরোপুরি হয় নাই। তবে ছবি দেখে তারে চেনা যাচ্ছে।”
গবেষক ও শিল্প সমালোচকদের ভাষ্য
উকিল মুন্সী যে সময়ের মানুষ, সেই সময়ের অনেক শিল্পী-সাহিত্যিকেরই ছবি থাকলেও উকিল মুন্সীর কোনো ছবি নেই, এ বিষয়টি অবিশাস্য মনে করছেন শিল্প সমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ। তিনি মনে করেন উকিল মুন্সীকে নিয়ে বড় পরিসরে গবেষণা হলে ছবি খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।
তবে উকিল মুন্সীর পরিবারের একাধিক সদস্য আগামীর সময়কে বলেছেন, তাদের জানামতে উকিল মুন্সীর কোনো ছবি কোথাও নেই।
বাংলা একাডেমি থেকে লোকসংস্কৃতি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে যে কাজ হয়েছে, সেখানে অনেক প্রান্তিক লোকশিল্পীদের ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সেখানেও উকিল মুন্সীর কোনো ছবি নেই বলে জানিয়েছেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক ও গবেষক সাইমন জাকারিয়া।
বাংলাদেশের পোট্রেট আলোকচিত্রের পথিকৃৎ নাসির আলী মামুন। তাঁর ক্যামেরায় বন্দি হয়েছেন দেশের খ্যাতিমান প্রায় অনেক শিল্পী ও সাহিত্যিক। উকিল মুন্সীর কোনো আলোকচিত্র কেউ তুলেছিলেন কিনা, জানতে চাইলে নাসির আলী মামুন আগামীর সময়কে বলেন, “উকিল মুন্সীর কোনো আলোকচিত্র আছে বলে আমার জানা নেই।”
‘উকিল মুন্সী প্রামাণ্যপাঠের সন্ধানে’ নামে বই লিখেছেন সাংবাদিক ও গবেষক মুহম্মদ আকবর। তিনিও বলছেন, ‘উকিল মুন্সীর কোনো ছবি পাওয়া যায়নি’।
গবেষক সাইমন জাকারিয়া বলেছেন, “বাউল সাধকদের অনেকের মধ্যেই এখনো ছবি তোলা নিয়ে অনাগ্রহ আছে। কারণ তারা তো নিজেকে বিলীন করেই সাধনা করেন এবং ভাবদর্শনকে ছড়িয়ে দেন। সেখানে নিজের ছবি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।”
চিত্রশিল্পীরা যে ছবি এঁকেছেন, তা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করেন না সাইমন জাকারিয়া। তিনি বলেছেন, “যার ছবি নেই, তার ছবি আঁকা একটা অপ্রাসঙ্গিক কাজ। বরং উকিল মুন্সীর ভাবদর্শনকে ছড়িয়ে দিতে আমরা কী করেছি, তা জরুরি। ছবির মধ্য দিয়ে তাঁকে সম্মান জানানোর কিছু নেই। তাঁর দর্শনকে অনুভব করার মধ্য দিয়েই তাঁকে সম্মান জানানো যায়।”
সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মীয় কোনো দ্বন্দ্ব নেই, তার উদাহারণ উকিল মুন্সী উল্লেখ করে সাইমন জাকারিয়া বলেন, উকিল মুন্সী ছিলেন মসজিদের ইমাম, আবার সঙ্গীত সাধক। তিনি তো কেবল বিনোদনের জন্য গান লিখেন নি, লোকশিক্ষার জায়গা থেকে গান করেছেন। তার ছবি না থাকলেও কিছুই যায় আসে না। ভাবদর্শনটাই জরুরি। যা তার সঙ্গীত এবং জীবনদর্শনকে চর্চার মধ্য দিয়ে করতে হবে। উকিল মুন্সীর গান সংরক্ষণ, তাঁর জীবন নিয়ে আরো বেশি গবেষণা জরুরি।”
শিল্প সমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ আগামীর সময়কে বলেছেন, “কোনো সিনেমা বা ফিকশন ধরনের কাজের জন্য ইলাস্ট্রেশন বা ছবি আঁকা যেতে পারে। কিন্তু ডক্যুমেন্ট প্রতিকৃতি এঁকে হয় না। লালন ফকিরেরও কোনো ছবি নেই। কিন্তু তার প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি তো লালনকে কাছ থেকে দেখে এঁকেছেন। এমন যদি হয় যে কেউ উকিল মুন্সীর একটা প্রতিকৃতি আগে এঁকেছেন। সেটা থেকে অন্য কেউ প্রতিকৃতি আঁকছেন বা কোনো আলোকচিত্র আছে, সেটা থেকে আঁকছেন। কারো মুখের বর্ণনা শুনে উকিল মুন্সীকে সঠিকভাবে আঁকা সম্ভব নয়। আর সেটা যদি ডকুমেন্ট হিসেবে ব্যবহার হয়, সেটা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”