প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। গতকাল জাতীয় সংসদে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর প্রথম বাজেট বক্তৃতায় এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে এডিপিতে বরাদ্দের প্রস্তাব করছি ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ থেকে আসবে।’
প্রস্তাবিত বাজেটের বড় একটি অংশ—প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা খাতে থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। ফলে প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের বাইরে রাখা এ ধরনের থোক বরাদ্দ বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই এসব অর্থ অব্যবহৃত থেকে যায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষাসহ একাধিক খাতে প্রকল্প বরাদ্দের তুলনায় থোক বরাদ্দ কয়েক গুণ বেশি রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে যেখানে প্রকল্প বরাদ্দ ৬ হাজার ৮ কোটি টাকা, সেখানে থোক বরাদ্দ ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। একইভাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প বরাদ্দ ৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকার বিপরীতে থোক বরাদ্দ ১৬ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে প্রকল্প বরাদ্দ ৩০ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা হলেও থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৩ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার খাতসহ বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা খাতে মোট ৩৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
মোট বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষা খাতে ৪৮ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা, স্থানীয় সরকারে ৩৬ হাজার ২২৮ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে ৩৫ হাজার ২৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এই তিন খাতে বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ২১ হাজার ৩০৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা, যা মোট উন্নয়ন বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বড় অংশই অননুমোদিত প্রকল্পে রাখা হয়েছে। শিক্ষা খাতে অনুমোদিত প্রকল্পে বরাদ্দ ১৭ হাজার ৪২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা হলেও অননুমোদিত প্রকল্পে রাখা হয়েছে ৩০ হাজার ৮৭৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতে অনুমোদিত প্রকল্পে বরাদ্দ ৭ হাজার ৬৫২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, বিপরীতে অননুমোদিত প্রকল্পে ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার বিভাগে তুলনামূলকভাবে অনুমোদিত প্রকল্পে বরাদ্দ বেশি—২৮ হাজার ৬৬৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। তবে এখানেও অননুমোদিত প্রকল্পে রয়েছে ৭ হাজার ৫৬২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
এরপর যথাক্রমে শীর্ষ ১০-এ থাকা খাতগুলোর মধ্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩১ হাজার ৬৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগের ১৯ হাজার ২৮৫ কোটি ৬৫ লাখ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ১৭ হাজার ৩১৫ কোটি ৭৪ লাখ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ১০ হাজার ৯৬৮ কোটি ৮৮ লাখ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৭৯০৩ কোটি ১৩ লাখ, রেলপথ মন্ত্রণালয় ৭ হাজার ৫৪৭ কোটি ৮ লাখ টাকা এবং সেতু বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৩৯৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
এডিপির বরাদ্দের তথ্য অনুসারে, মেগা ১৫টি বৃহৎ প্রকল্পের জন্য মোট ৫৩ হাজার ৬২২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা এডিপির মোট আকারের প্রায় ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে। বরাদ্দের পরিমাণ ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পটিতে বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ১১ কোটি টাকা।
এডিপিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এমআরটি-১ প্রকল্পে, যা দেশের প্রথম পাতাল রেল প্রকল্প। এ প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বরাদ্দ ছিল মাত্র ৮০১ কোটি টাকা।
আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের। দ্রুততম সময়ে প্রকল্পের সেবা উৎপাদনের জন্য বড় বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে চায় সরকার। এই বিবেচনায় আগামী এডিপিতে তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প। প্রকল্পটিতে আগামী অর্থবছরের জন্য ৪ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের ১ হাজার ৭৮ কোটি টাকার বরাদ্দের চেয়ে ৪ গুণের বেশি।
আগামী এডিপিতে চতুর্থ সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত রুট নিয়ে এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর); প্রকল্পটি ঢাকার পশ্চিম অংশের সঙ্গে পূর্ব অংশের পরিবহন যোগাযোগ সহজ করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরের এডিপিতে প্রকল্পটির বরাদ্দ প্রায় ৫ গুণ করে ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা করা হয়েছে; চলতি অর্থবছরে যা ছিল মাত্র ৮৬৩ কোটি টাকা।
উত্তরা থেকে মতিঝিল দেশের প্রথম মেট্রোরেল ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৬ নামে প্রকল্পটির কাজ এখনো শেষ হয়নি। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের কাজ চলছে। সরকার দ্রুত এই কাজ শেষ করতে চায়। এ জন্য আগামী অর্থবছরের এডিপিতে প্রকল্পটিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা; চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে যা ছিল ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা।