প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক চাণক্যের একটি উদ্ধৃতি আছে-‘মৌমাছি যেমন ফুলের ক্ষতি না করে মধু সংগ্রহ করে, তেমনি শাসকেরও উচিত প্রজাদের অযথা কষ্ট না দিয়ে কর আদায় করা।’ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী হয়তো চাণক্যের সেই দর্শন অবলম্বন করেছেন। নিত্যপণ্য ও ওষুধে কর ছাড় দিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে স্বস্তি দিতে চেয়েছেন। আবার রাজস্ব আদায়ের চিন্তা মাথায় রেখে কর রেয়াতের সীমা কমিয়ে, স্বর্ণ বিক্রিতে মূলধনি কর বসিয়ে কঠোর হয়েছেন।
প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। শিশু খাদ্য প্রস্তুত সামগ্রীর আমদানি শুল্ক ও রান্নার প্রধান উপকরণ মসলার রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে এলাচ, দারুচিনিসহ সব ধরনের মসলার দাম কমবে। এসব পদক্ষেপের ফলে বিগত বছরগুলোতে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে যে নাভিশ্বাস উঠেছিল, তা থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি মিলবে। ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জিংক সালফেট, ম্যাগনেশিয়াম সালফেটসহ ৫ ধরনের সারের ভ্যাট ও কীটনাশক-বালাই নাশকের শুল্ক-কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করবে।
বাসা ভাড়া ও যাতায়াতের পর মধ্যবিত্তের আয়ের বড় একটি অংশ খরচ হয় ওষুধ কিনতে। সেদিকেও নজর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী। হার্টের রিং এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্স সরবরাহে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রতিটি হার্টের রিং বা স্টেন্টের মূল্য প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। চোখের প্রতিটি ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের মূল্য প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।
কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার্য ব্লাড টিউব সেট আমদানিতে আগাম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাবে। ক্যানসারের ওষুধ তৈরির ৯টি উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এছাড়া অন্য ওষুধ তৈরির নতুন ৬৮টি মৌলিক কাঁচামাল আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এতে বাজারে ওষুধের দাম কমবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে গৃহিণীদেরও খুশি করার চেষ্টা রয়েছে। কর ছাড় দেওয়ায় অঙ্গসজ্জায় ব্যবহৃত স্বর্ণালংকার, ত্বক ফর্সাকারী প্রসাধনী যেমন পাউডার; লিপস্টিক; আইলাইনারের দাম কমবে। গৃহসজ্জায় ব্যবহৃত ফ্রিজ-রেফ্রিজারেটর, কম্পিউটার মনিটর, প্রিন্টার, মোবাইল ফোন, সিমের দাম কমতে পারে।
অবশ্য মুদ্রার ওপিঠে লুকিয়ে আছে মধ্যবিত্তের অস্বস্তি। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয় সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছিল। তখন করের স্ল্যাবেও পরিবর্তন আনা হয়। নতুন সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে সেটি বহাল রেখেছে। করের স্ল্যাবে পরিবর্তন আনায় মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ বাড়বে। কেননা ৫ শতাংশ কর হারের স্তরটি বাতিল করে সেখানে ১০ শতাংশ কর ধার্য করা হয়।
এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত সুবিধা সংকুচিত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অনুমোদিত বিনিয়োগ সীমা ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকা করা হয়েছে। এ হিসাবে, প্রতি এক লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে ৫ হাজার টাকা কম ছাড় পাবেন করদাতা।
অবশ্য অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রিটার্ন জমা দিলে রেয়াতের পাশাপাশি প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে যারা রিটার্ন জমা দেবেন, তারা পরিশোধিত করের ৫ শতাংশ অথবা ২৫ হাজার টাকার মধ্যে যেটি কম-সেই হারে কর ছাড় পাবেন। তাছাড়া রিটার্নে উল্লিখিত স্বর্ণ বিক্রি করলে ১৫ শতাংশ হারে গেইন ট্যাক্স বা মূলধনি কর দিতে হবে। যা মধ্যবিত্তের করের বোঝা বাড়িয়ে দেবে। প্রস্তাবিত বাজেটের একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে-২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা কত হবে, সেটিও প্রস্তাবিত বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে করদাতারা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও কর পরিকল্পনা সাজাতে পারবেন।
বাজেট আলোচনার শুরুতে এনবিআর মধ্যবিত্তের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের ওপর ১-৫ হাজার টাকা উৎসে কর আরোপ করতে চেয়েছিল। সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী সেই প্রস্তাবটি বাতিল করেন। তাছাড়া রাজস্ব আয় বাড়াতে উচ্চবিত্তের গাড়ির অগ্রিম আয়কর বাড়ালেও মধ্যবিত্তের কম সিসির গাড়িতে নজর দেয়নি। মেট্রোরেলে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে গণপরিবহণ অগ্রিম আয়কর বাড়ানোয় বাস ভাড়া বাড়তে পারে। দিন শেষে সব মধ্যবিত্তের স্বপ্ন থাকে জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে একটি বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কেনার। প্রস্তাবিত বাজেটে ইট ও রডে ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানোয় সেই স্বপ্ন ফিঁকে হয়ে যাবে। কেননা বাজেটে ইট-রডের দাম বাড়বে। সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস থাকলে খরচ বাড়াবে প্রস্তাবিত বাজেট।