অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত আর্থিক ঝুঁকি বিবৃতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অর্থনীতির বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ উভয় উৎস থেকেই ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর আর্থিক দুর্বলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের মূল নথির চেয়ে আর্থিক ঝুকি বিবৃতি অনেক সময় অর্থনীতির প্রকৃত ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরে। এবারের নথিও তার ব্যতিক্রম নয়। এই প্রতিবেদনটি আজ বাজেট নথির সঙ্গে বিতরণ করা হতে পারে।
যুদ্ধের অভিঘাত, তেলের দাম বাড়লে বাড়বে ঘাটতি : সরকারি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আমদানি ব্যয়, ভর্তুকি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ একসঙ্গে বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে পৌঁছালে দেশের মূল্যস্ফীতি, চলতি হিসাবের ভারসাম্য এবং রাজস্ব পরিস্থিতি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখনও জ্বালানি আমদানি নির্ভর অর্থনীতি। ফলে বৈশ্বিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাজেটের ভর্তুকি ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দায় সরকারের জন্য নীরব ঝুঁকি : আর্থিক ঝুকি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর আর্থিক দায়। নথি অনুযায়ী, বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ ঋণ ও দায় বহন করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার অবনতি হলে শেষ পর্যন্ত দায়ভার সরকারের ওপর বর্তাতে পারে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এগুলো অনেকটা ‘কনটিনজেন্ট লায়াবিলিটি’ বা সম্ভাব্য দায়, যা সরাসরি বাজেটে দৃশ্যমান না হলেও ভবিষ্যতে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতের কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হলে সরকারের অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে, যা বাজেট ঘাটতি আরও বাড়িয়ে দেবে।
বন্যা ও জলবায়ু ঝুঁকি, বাড়ছে ব্যয়ের চাপ : বিবৃতিতে জলবায়ু পরিবর্তনকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বড় ধরনের বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে, অবকাঠামোর ক্ষতি করতে পারে এবং পুনর্বাসন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে একদিকে সরকারের ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ায় রাজস্ব আদায় কমে যেতে পারে। এতে বাজেট ঘাটতি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ু অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে জলবায়ু ঝুঁকি শুধু পরিবেশগত নয়, সরাসরি আর্থিক ঝুঁকিতেও পরিণত হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও ঋণের দ্বৈত চাপ : নথিতে মূল্যস্ফীতিকেও অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারি প্রকল্প ব্যয় বাড়বে, সুদের হার বৃদ্ধি পাবে এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। বর্তমানে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ এবং সুদ পরিশোধ ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। নতুন বাজেটেও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব আহরণ কাঙ্খিত মাত্রায় না বাড়লে সরকারকে আরও বেশি ঋণনির্ভর হতে হবে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক ঝুঁকি আরও বাড়াবে। আর্থিক ঝুকি বিৃবতিতে উল্লেখিত ঝুঁকি মোকাবিলায় কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে : রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও করজাল সম্প্রসারণ; রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুশাসন নিশ্চিত করা; বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা; জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সমন্বিত নীতি বাস্তবায়ন।
বড় অর্থনীতির পথে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা : সরকার আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে আর্থিক ঝুকি বিবৃতির বিশ্লেষণ বলছে, সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দায় এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন ব্যয়, রাজস্ব আয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়তে পারে, যা উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।