গতকাল সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের ঋণখেলাপের প্রসঙ্গে বলেন তিনি ব্যাংক থেকে লোন নিয়েছেন, খেলাপী না (যদিও খুরশীদ আলমের স্ত্রী ঋণখেলাপী)। এর পরে আগ বাড়িয়ে আমীর খসরু জামায়াতের সাংসদদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেন- আমাদের সবারই ব্যাংক লোন আছে। লোন কার না থাকে? আপনাদের লোন নাই?
জামায়াতের বেশ কয়েকজন সাংসদ তখন সজোরে সমস্বরে বলে ওঠেন নাই, নাই। তখন অর্থমন্ত্রী প্রশ্ন করেন- লোনই যদি না নেন, ব্যাংক বানালেন কেন?
এই যায়গাতেই জামায়াতকে রিড করতে সবাই ভুল করে। আওয়ামীলীগও করেছে, এখন বিএনপিও একই রাস্তায় হাটছে। এই ভুল রিডিং এর কারণে এরা ক্ষতি করতে চায় জামায়াতের, কিন্তু ক্ষতি করে দেশ ও জনগনের।
জামায়াতপন্থী কয়েকজন উদ্যোক্তা এবং জামায়াতের নেতারা নব্বইয়ের দশকে যখন দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীদের একত্রিত করে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাদের উদ্দেশ্য লোন নেওয়া ছিলো না। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো সুদের থাবা থেকে দেশের মানুষকে বাঁচিয়ে ইসলামী অর্থনীতির একটা বাস্তব কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা এবং এর সুফল মানুষকে ভোগ করার সুযোগ করে দেওয়া।
যুগের পরিক্রমায় সেই ব্যাংক এখন লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার যায়গা হয়েছে। পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতির বিশাল এক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এই একটা ব্যাংকের উপরে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, হারাম সুদভিত্তিক লেনদেন থেকে যারা বেঁচে থাকতে চায় তাদের জন্য শরীয়া ভিত্তিক ব্যাংকিং এর একটা আস্থার যায়গা হয়েছে।
হ্যাঁ, এই পথ পরিক্রমায় দলীয়ভাবে জামায়াত নিশ্চয়ই লাভবান হয়েছে। কিন্তু এই লাভ কখনোই সালাহউদ্দিন আহমেদের অভিযোগ অনুযায়ী সরাসরি ব্যাংকের টাকা জামায়াতের দলীয় ফান্ডে আসার মাধ্যমে হয় নি। এটা খুবই সিম্পল লজিক যেভাবে এভাবে শত শত কোটি টাকা দলীয় ফান্ডে খরচ করলে কখনোই এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান দাড় করাতে পারতো না।
ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে জামায়াত লাভবান হয়েছে তার নেতা-কর্মীদের কর্মসংস্থানের মধ্য দিয়ে। জামায়াতের কর্মীরা নিজেরাই টাকা দিয়ে সংগঠন চালায় এটা এখন মোটামুটি সর্বজনবিদিত। ফলে তাদের কর্মসংস্থানের কারণে বেতনের একটা অংশ জামায়াতের ফান্ডে গিয়েছে। আবার এখানেও এই নেতা কর্মীদের নিয়োগ দিয়ে তাদের তুলনামূলক সততার কারণে প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংক এবং দল হিসেবে জামায়াত- দুই জনেরই উইন উইন সিচুয়েশন হয়েছে।
এর বাইরে ইসলামী ব্যাংক জামায়াতের ব্যাংক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় এর সুনামের সুফল জামায়াত পেয়েছে। জামায়াত দেশ চালানোর জন্য যোগ্য এমন একটা ন্যারেটিভ এই ব্যাংক পরিচালনার মধ্য দিয়ে প্রচার পেয়েছে। এরকম কিছু ব্র্যান্ডিং এর সুফল জামায়াত নিজের ঘরে তুলেছে।
এখন ইসলামী ব্যাংক দখলের মাধ্যমে বিএনপি যদি ভেবে থাকে তারা জামায়াতের অর্থনৈতিক ভিত্তি দূর্বল করে দেবে তাহলে সেটা ভুল করবে। যদিও জামায়াতমুক্ত করার প্রোজেক্ট যে দিনশেষে নিজেদের পকেট ভর্তি করা এবং অর্থ পাচারের প্রোজেক্টে গিয়ে শেষ হয় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এখন যদি ধরেও নেই জামায়াতমুক্ত করা ছাড়া বিএনপির অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই তাহলেও সেই উদ্দেশ্য কতটুকু সফল হবে?
শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত যদি জামায়াতের কিছু লোকজনকে ছাটাই এবং নতুন রিক্রুটমেন্ট বন্ধ করে দেয় এতে করে সাময়িকভাবে জামায়াতের লোকজন একটু চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে এটা ঠিক। কিন্তু এর ফলে ব্যাপকভাবে জামায়াতের ক্ষতি করার কোন সম্ভবনাই নেই। বরং জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীর যে বিশাল অংশ ইসলামী ব্যাংকে চাকরি পাওয়ার আশায় থাকতো, তারা এই প্রতিযোগিতার বাজারে নিজেদের আরও কম্পিটেন্ট হিসেবে গড়ে তুলতে বাধ্য হবে। জামায়াত ঘরানার ইসলামী ব্যাংকে ঢুকে তারা একটা বলয়ের মধ্যে আটকে না গিয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়লে বরং জামায়াতের সোশ্যাল মোবিলিটি বেড়ে যাবে।
এই নেতা কর্মীরা যেখানেই যাক, জামায়াতকে ফান্ড দিবেই। সেটা ইসলামী ব্যাংকে চাকরি করলেও দিবে, অন্য কোন ব্যাংকে বা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও দিবে কিংবা রিক্সা চালালেও দিবে।
কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের উপরে আবারও লুটেরাদের চোখ পড়েছে কিংবা খুরশীদ আলমের মতো লোকজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় এই ব্যাংক এখন আসলে আর ঠিকমতো ইসলামী শরীয়া ফলো করতেছে কিনা এই সব আশংকা তৈরি হলে লিগাল ব্যাংকিং প্রোসেসে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স যাওয়া কমে যাবে বা গ্রাহকেরা টাকা উত্তোলন করে ফেলতে পারে যার কিছুটা প্রতিফলন ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। এতে করে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ইসলামী ব্যাংক জামায়াতের ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর অগ্রযাত্রায় কিছুটা নেতিবাচক প্রভাবও পড়েছে৷ এত বিশাল একটা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে জনগণ নিজেদের ন্যাশনাল প্রাইড হিসেবে নিতে পারে নি৷ এর চেয়ে কয়েকগুন ছোট প্রতিষ্ঠান গ্রামীন ব্যাংককে মানুষ প্রাইড হিসেবে নিয়েছে।
একই সময়ে প্রতিষ্ঠান তৈরির পরেও ড. ইউনূস নিজেকে যেই ফিগার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন, ইসলামী ব্যাংকের মতো এত বিশাল একটা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বা চেয়ারম্যানদের একজনও তার ধারে কাছেও যেতে পারেন নি। ড. ইউনূস নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা/চেয়ারম্যানদের কেউ একজন অন্তত বাদশাহ ফয়সাল পুরস্কার পেতে পারতো, সেটাও পায় নি। এমনকি জাতীয় পর্যায়ে বড় অর্থনীতিবিদ বা ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ হিসেবে পর্যন্ত কারো কোন পরিচিতি তৈরি হয় নি। জামায়াতের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় এই চেষ্টাও হয়তো তারা কখনো করার প্রয়োজন বোধ করেন নি।
যাইহোক, ইসলামী ব্যাংক দখল করে জামায়াতকে অর্থনৈতিক ভাবে দূর্বল করা গেলে হাসিনার আমলেই জামায়াত শেষ হয়ে যেতো। তবে ব্যাংক লোন নিয়ে আমীর খসরুর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অর্থনীতি এবং ব্যাংকিং নিয়ে কার নিয়তটা কেমন, সেটা আমরা বুঝতে পারলাম।