হামের টিকা গ্রহণের দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু টিকাদান শুরুর ৯ সপ্তাহ পরও সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। এ পরিস্থিতিতে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদরা।
টিকা পাওয়া শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, যাচাই করতে বারবার পরামর্শ দেওয়া হলেও সরকার তা কানে তুলছে না বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।
দেশব্যাপী হামের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার পর গত ৫ এপ্রিল উচ্চ সংক্রমিত উপজেলাগুলোতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। ১৮ জেলার ৩০ উপজেলা ও পৌরসভায় প্রথম দফায় টিকা দেওয়া হয়। দুই সপ্তাহ পর ২০ এপ্রিল শুরু হয় দেশব্যাপী কার্যক্রম।
সরকার ছয় থেকে নয় মাস বয়সি এক কোটি ৯০ লাখ পাঁচ হাজার ৯৫০ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ মে শতভাগ কাভারেজ অর্জিত হয়।
২০ মে পর্যন্ত চলা এই কার্যক্রমে মোট দুই কোটি ২৪ হাজার ১১৭ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ছয় শতাংশ বেশি। তবে এত বেশি কাভারেজের পরও সংক্রমণ কমেনি। এখনও প্রতিদিন হাজারও শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৩৪ শিশু। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে তিন শিশুর।
মে মাসে দিনে গড়ে ১০ শিশুর মৃত্যু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু মে মাসেই হামে আক্রান্ত হয়েছে ৩৭ হাজার ৮২৬ শিশু। প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ২০০-এরও বেশি শিশু সংক্রমিত হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মাসজুড়ে মৃতের সংখ্যা ৩০৫।
চলতি জুনের প্রথম আট দিনে আক্রান্ত হয়েছে ৯ হাজার ৯৩৮ জন, মারা গেছে ৪৩ শিশু। শুরু থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা নিয়েছে ৮৯ হাজার ৮৮৩ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৬২৮ জনের।
টিকার মান ও সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন
লক্ষ্যমাত্রার বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও আক্রান্ত ও মৃত্যু শূন্যে না নামায় টিকার কার্যকারিতা ও সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, টিকার কার্যকারিতা নির্ভর করে শিশুর বয়স, পুষ্টি ও মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর। বয়স যত কম, টিকার কার্যকারিতা তত কম।
সরকারের ইপিআই ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশে (আইসিডিডিআর,বি) দীর্ঘদিন কাজ করেছেন টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তাজুল ইসলাম এ বারী। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘টিকাদানের দুই মাস হয়ে গেল, এখনও উচ্চ সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। এই মুহূর্তে জরুরি হলো বয়সভিত্তিক ছয় থেকে নয় মাস, নয় মাসের পর থেকে দুই বছর এবং পাঁচ বছরের নিচের টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করে দেখা যে, আসলে হামের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি হয়েছে কি না। একই সঙ্গে কিছু অ্যান্টিবডি তৈরি হলেও সেটি রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতার পর্যায়ে রয়েছে কি না, তা-ও দেখতে হবে। কিন্তু সরকার সে ব্যাপারে কোনো পরামর্শই কানে তুলছে না।’
বয়সভেদে হামের টিকার কার্যকারিতার হার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সাধারণত ছয় থেকে নয় মাসের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে টিকার কার্যকারিতার হার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ। ৯ মাস থেকে দেড় বছরের মধ্যে ৮৫ শতাংশ এবং চার থেকে ছয় বছরের শিশুদের ক্ষেত্রে কার্যকারিতার সম্ভাবনা ৯৭ শতাংশ। কাজেই টিকার সঙ্গে বয়সের একটা বিরাট সম্পর্ক রয়েছে।’
কার্যকারিতা যাচাইয়ের দাবি
টিকার কার্যকারিতা যাচাইয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ চান ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী। তিনি বলেন, ‘এখন টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন ন্যাশনাল কন্ট্রোল ল্যাবরেটরিতে (এনসিএল) টিকা পরীক্ষা করা দরকার। পরিবহনে কোথাও কোল্ড চেইনে (সংরক্ষণ) সমস্যা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত। এজন্য সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে (আইইডিসিআর) কাজে লাগানো যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে টিকার মান যাচাইয়ে পরীক্ষার জন্য কিট দিতে বলতে হবে। কিন্তু সরকার এগুলোতে গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফলে এখনও শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে, আর আমরা চেয়ে চেয়ে দেখছি।’
একই রকমের মত দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এখনও প্রতিনিয়ত সংক্রমণ হচ্ছে। অথচ টিকাদানের ৯ সপ্তাহ হয়ে গেছে। কাজেই আদৌ শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, তা দেখা দরকার।’
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. আহমেদ নওশের আলম বলেন, ‘টিকার কাভারেজ শতভাগ হলেও হয়তো দেখা যাবে কোনো একটা জনগোষ্ঠী বাদ গেছে। সেখান থেকে ছড়াতে পারে। টিকা নিয়ে ইপিআই, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও আইইডিসিআর কাজ করে। এখন টিকার কার্যকারিতা আদৌ রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা না করলে বোঝা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে যেহেতু আলোচনা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে ভেবে দেখা যেতে পারে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ডা. হালিমুর রশিদ বলেন, ‘বিষয়টি ভাবনায় আছে। কিন্তু এখনও কিছু করা যায়নি। সংক্রমণ কমে আসবে এটাই চিন্তা ছিল। যেহেতু তা হয়নি, তাই বিষয়টি নিয়ে মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলব।’
অবস্থার উন্নতির আশা সরকারের
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকার ভাবছে না এমন নয়। ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর একজন বিশেষ সহকারীকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেন টিকা দেওয়ার পরও আক্রান্ত হচ্ছে, সেটি নিয়ে কাজ চলছে।’
তিনি বলেন, ‘অ্যান্টিবডি তৈরিতে আগামী ২০ জুনের দিকে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন করার কথা ভাবছে সরকার। এতে করে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি।’