বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি অস্বস্তিকর চিত্র এখন নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসারিত হচ্ছে এবং লেনদেনের পরিমাণও বাড়ছে। তবে এই গতিকে কর-রাজস্বে রূপান্তর করতে রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
বহু বছর ধরে বাংলাদেশের কর ও জিডিপির অনুপাত ৬ দশমিক ২ থেকে ৭ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে, যা বিশ্বজুড়ে সর্বনিম্ন পর্যায়গুলোর একটি। প্রতি বছরই বাজেটে রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে অর্থবছর শেষে দেখা যায় সেই চেনা চিত্র-আকাঙ্ক্ষা এবং অর্জনের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান।
সাম্প্রতিক তথ্য থেকে এই অমিল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সরকার আদায় করতে পেরেছে ৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এমনকি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৩ লাখ এক হাজার কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম।
একই ধারা ২০২৬ অর্থবছরেও বজায় রয়েছে। জুলাই থেকে মার্চ মাসের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। তবে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে বছরের শেষ প্রান্তিকে রাজস্ব আদায়ে ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশের এক অবিশ্বাস্য প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। সরকারি কর্মকর্তারাও ব্যক্তিগত আলাপে স্বীকার করেন, এই গতি অর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়।
তাই এখন মূল প্রশ্নটি আর কেবল লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া নিয়ে নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, এই ঘাটতি কেন বছরের পর বছর ধরে থেকেই যাচ্ছে।
নীতিমালা সংক্রান্ত আলোচনায় একটি ব্যাখ্যা বারবার উঠে আসে-বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় করের আওতা বা পরিধি অত্যন্ত ছোট।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ একে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখছেন। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তা প্রচলিত কর ব্যবস্থার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। এমনকি আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির মধ্যেও কর দেওয়ার প্রবণতা সমান নয়। অনেক করদাতা সনাক্তকরণ নম্বর (টিন) ধারী নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন না। নিয়মিত কর দেন এমন মানুষের সংখ্যা আরও কম।
তবে করদাতাদের এই আচরণের পেছনে কেবল কাঠামোগত কারণই দায়ী নয়। তিনি এমন একটি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন যা হয়রানি ও ভীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। করদাতারা সাধারণত হয়রানি, অনিশ্চিত আইন প্রয়োগ এবং বৈষম্যের আশঙ্কায় থাকেন। তাদের ধারণা, নিয়ম মেনে কর দিলে ন্যায়বিচার পাওয়ার বদলে উল্টো বেশি নজরদারির মধ্যে পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতিতে কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা একটি বাস্তবতায় রূপ নেয়।
এই সংকীর্ণ কর কাঠামোর ওপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি নীতিগত সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগ এবং কৌশলগত খাতগুলোকে সহায়তা করার জন্য শুরুতে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, যা এখন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, এই কর অব্যাহতি সুনির্দিষ্ট এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে এটিকে ঢালাও এবং অস্পষ্ট করে তোলায় প্রকৃতপক্ষে করের আওতা কমে গেছে। এর ফলে পুরো ব্যবস্থাটি নিজের রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা কমিয়ে ফেলছে, যারা ইতোমধ্যে কর দিচ্ছেন তাদের ওপর আরও বেশি করের চাপ তৈরি করছে।
উপাত্তের অভাবের কারণে এই ভারসাম্যহীনতা আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক শাহাদাত সিদ্দিকী একে সুশাসনের সীমাবদ্ধতা হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, রাষ্ট্র আসলে যে অর্থনীতির ওপর কর আরোপ করতে চাইছে, সেই অর্থনীতিকে পুরোপুরি দেখতেই পাচ্ছে না।
তাত্ত্বিকভাবে ভ্যাট ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনীতির সিংহভাগ লেনদেন নথিবদ্ধ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশই হিসাবের বাইরে, অকাট্য প্রমাণহীন অথবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগহীন অবস্থায় থেকে যায়।
এর ফলে কেবল রাজস্বেরই ক্ষতি হচ্ছে না, বরং অর্থনীতিতে এক ধরনের কাঠামোগত অদৃশ্যতা তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে আয়, মালিকানা এবং লেনদেন ঠিকই বিদ্যমান, কিন্তু রাষ্ট্রের কর মানচিত্রে সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই।
এই অদৃশ্যতার কারণেই বাংলাদেশ কর আদায়ের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক মানদণ্ড থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কর ও জিডিপির গড় অনুপাত যেখানে ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা ৭ শতাংশের নিচে।
শাহাদাত সিদ্দিকী মনে করেন, এই ব্যবধান অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাবের জন্য নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে তৈরি হয়েছে।
বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতে, এই সমস্যার মূল কারণ তথ্যের অভাব। পরিবার, সম্পদ এবং ব্যবসার সমন্বিত তথ্য না থাকায় রাষ্ট্র কর আদায়ের প্রকৃত সক্ষমতা বুঝতে পারছে না। এমনকি তথ্য থাকলেও তা বিভিন্ন সংস্থার কাছে বিচ্ছিন্নভাবে থাকে। এর ফলে এক তথ্যের সঙ্গে অন্য তথ্য মিলিয়ে দেখার সুযোগ থাকে না, এতে কর ফাঁকির পথ তৈরি হয়।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট স্নেহাশিষ বড়ুয়া এই প্রযুক্তিগত ঘাটতির ওপর জোর দেন। তিনি মনে করেন, করের আওতা বাড়ানো কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় নয়, বরং এটি সমন্বয়ের বিষয়। ভ্যাট, আয়কর এবং শুল্ক বিভাগের তথ্য একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন যেন যেকোনো অসংগতি তাৎক্ষণিকভাবে সনাক্ত করা যায়।
তিনি কর অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান। তার মতে, এই সুবিধাগুলো পরিমাপযোগ্য কর্মক্ষমতার সাথে যুক্ত হতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা বাতিলের নিয়ম থাকতে হবে। তা না হলে কর অব্যাহতিগুলো সাময়িক নীতিগত সুবিধা না হয়ে স্থায়ীভাবে করের ভিত্তি নষ্ট করার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াবে।
রাজস্ব আদায়ের এই বিতর্কের একদিকে যদি নীতি ও তথ্যের অভাব থাকে, তবে অন্যদিকে রয়েছে শৃঙ্খলার অভাব। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ মনে করেন, সমস্যাটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে নয়, বরং তা বাস্তবায়নে।
তিনি বলেন, উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা প্রয়োজন কারণ এটি প্রাতিষ্ঠানিক চাপ তৈরি করে। লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে দিলে সংস্কারের তাগিদ কমে যায়।
তবে তিনি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত বৈষম্যের কথা স্বীকার করেন। যারা নিয়ম মেনে কর দেন তারা প্রায়শই কঠোর নজরদারির মুখোমুখি হন।
অন্যদিকে, প্রভাবশালীরা নজরদারির অভাবের সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যান। একইসঙ্গে বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী কর বিরোধের কারণে বিশাল পরিমাণের রাজস্ব আটকে আছে, যা আদায় করতে বছরের পর বছর দেরি হচ্ছে।
আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তবায়নের এই দ্বন্দ্বের কথা উঠে এসেছে খোদ কর প্রশাসনের ভেতর থেকেও। এনবিআরের সাবেক সদস্য (ভ্যাট নীতি) ফরিদ উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়া নতুন কিছু নয়, এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। দেশের অর্থনীতিতে কর আদায় করার মতো যথেষ্ট কর্মকাণ্ড ঘটছে, কিন্তু মূল চ্যালেঞ্জ হলো তা সঠিকভাবে করের আওতায় নিয়ে আসা।
তিনি অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের ধীরগতির কথা উল্লেখ করে বলেন, কর প্রশাসন এখনো বহুলাংশে কাগজের ফাইল ও বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
এ বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না হলে অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাজস্ব আদায়ের ফলাফলের মধ্যে এই ব্যবধান চলতেই থাকবে।
সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য চলতি অর্থবছরের আনুমানিক প্রকৃত আদায়ের চেয়ে ৪২ শতাংশ বেশি রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সাধারণ বিন্দুতেই একমত হয়েছেন। বাংলাদেশের রাজস্ব সমস্যাটি কেবল বেশি টাকা আদায়ের বিষয় নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয় যা বর্তমান অর্থনীতিকে সঠিকভাবে দেখতে, বুঝতে এবং ন্যায্যভাবে করের আওতায় আনতে সক্ষম হবে।
যতক্ষণ না এই ব্যবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত উচ্চ লক্ষ্যমাত্রাগুলো কেবলই এক বছরের কাগুজে ইচ্ছা হিসেবে থেকে যাবে, যা রাজস্বের প্রকৃত বাস্তবতার সঙ্গে মিলবে না।