সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকায় বানানো হয়েছে লালখানবাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার উড়ালসড়ক; যাকে বলা হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। দুই বছর আগে কাজ শেষ হলেও নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে ওঠানামার পথ বা র্যাম্প নির্মাণের কাজ থমকে থাকায় পুরোদমে চালু করা যাচ্ছে না এটি। ফলে প্রতিদিন ৬৬ হাজার গাড়ি চলার কথা থাকলেও চলছে মাত্র ৮ হাজার।
কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ উড়ালসড়ক পূর্ণমাত্রায় কেন ব্যবহার হচ্ছে না, সে ব্যাপারে কারোরই যেন মাথাব্যথা নেই। অথচ গাড়ি কম চলার কারণে এ খাত থেকে দুই বছরে সম্ভাব্য ১৬০ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। ২০১৭ সালে সরকারি টাকায় এই উড়ালসড়কের কাজ শুরু করে সিডিএ। এই উন্নয়ন সংস্থাই এখন টোল আদায় ও রক্ষণাবেক্ষণ করছে উড়ালসড়কের।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরীর এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প কেন কার্যকর করা যাচ্ছে না, আসল ঘটনা কী?
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, কাজ শেষ হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে। কিন্তু এখনো বর্ধিত বিল ও জামানতের ৩৩২ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়নি ঠিকাদারকে। ফলে অর্থসংকটে ঝুলে আছে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে ওঠানামার পথ বা র্যাম্প নির্মাণের কাজ।
গত ২১ মে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের চট্টগ্রাম সফরে এলে তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় আগামীর সময়ের পক্ষ থেকে। তিনি সরাসরি জবাব না দিলেও বলেছিলেন, ‘ছোট ছোট কিছু জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষ প্রকল্পটির শতভাগ সুফল পাচ্ছে না। জটিলতাগুলো দ্রুত নিরসন করে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’ এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরানের ভাষ্য, ‘প্রকল্পের প্রস্তাব (ডিপিপি) যথাযথভাবে তৈরি করা না হলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে এমন জটিলতা দেখা দেয়, যা আমাদের দেশের পুরনো রীতি। প্রকল্পটিতে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। সব র্যাম্প দ্রুত নির্মাণ করা না হলে এই পুরো বিনিয়োগই গচ্চা যাবে।’
উড়ালসড়ক নির্মাণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, ২০২৫ সালে এই উড়ালসড়ক দিয়ে প্রতিদিন গড়ে যানবাহন চলবে ৬৬ হাজার ৩২৩টি। কিন্তু বাস্তবে ওই বছর চলেছে মাত্র ৮ হাজার ১২১টি। একইভাবে বছরে যেখানে টোল আদায় হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা, সেখানে আয় হয়েছে মাত্র ২০ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে গাড়ি যাতায়াত করেছে প্রতিদিন ৭ হাজার ৮৮০টি। আর টোল আদায় হয়েছে ৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা। অথচ আলোচ্য সময়ে দিনে গড়ে ৬৯ হাজার গাড়ি চলাচল করার কথা ছিল। আর পাঁচ মাসে আয় হওয়ার কথা ছিল ৪৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ যে গতিতে উড়ালসড়কে বিপুল যানবাহন চলার কথা ছিল, বাস্তবে সেভাবে চলছে না।
সিডিএর কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর এই উড়ালসড়কের উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট উড়াল র্যাম্প ছাড়া সড়কের কাজ শেষ করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। পরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে নিহত ছাত্রদল নেতা শহীদ ওয়াসিম আকরামের নামে নামকরণ হয় উড়ালসড়কটির। আর কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে এখন মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার প্রকৌশলী সাইফুর রহমান বললেন, বিপুল পরিমাণ টাকা আটকে থাকায় তারা অর্থসংকটে পড়েছেন। ফলে পুরোদমে কাজ চালানো যাচ্ছে না। অবশ্য এর মধ্যেই তারা চেষ্টা করছেন কাজটি যথাসময়ে শেষ করার।
সাইফুর রহমান জানালেন, প্রকল্পের বর্ধিত ১৬৪ কোটি টাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে করা হয় একটি তদন্ত কমিটি। কমিটি গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ভেরিয়েশনের প্রস্তাবটিকে ‘যথাযথ’ বলে প্রতিবেদন দিলেও মন্ত্রণালয় এখনো দেয়নি চূড়ান্ত অনুমোদন। এরপর চলতি বছরের ২ এপ্রিল ফের প্রস্তাব পাঠিয়েও অর্থছাড় মেলেনি।
এ ছাড়া প্রকল্পের কাজের জামানত (রিটেনশন মানি) বাবদ আরও ১৬৮ কোটি টাকা সিডিএর হাতে জমা রয়েছে। বারবার চিঠি দিয়েও সেই অর্থ ফেরত পাচ্ছে না ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আটকে থাকা টাকার অঙ্ক ৩৩২ কোটি।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম বলেছেন, ‘কাজ শেষ হওয়ার আগেই বর্ধিত ব্যয় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়। অনুমোদন ছাড়া পুরো কাজের চূড়ান্ত সনদ (কমপ্লিশন সার্টিফিকেট) নিলে ঠিকাদার হয়তো জামানতের টাকা দ্রুত পেয়ে যেতেন। কিন্তু বর্ধিত ১৬৪ কোটি টাকা পাওয়ার আইনি পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত।’
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, উড়ালসড়কে ওঠানামার জন্য প্রথমে ১৫টি র্যাম্প নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু নগর পরিকল্পনাবিদদের আপত্তির মুখে ছয়টি বাদ দেওয়া হয়। বর্তমানে ৯টি র্যাম্প ও টোল বক্স নির্মাণের কাজ চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জিইসি মোড়ে ওঠার র্যাম্পটির কাজ আটকে আছে মাঝপথে। টাইগারপাসে নামার র্যাম্পটি তৈরি হলেও সংযোগ সড়কের জটিলতায় রয়েছে বন্ধ। আগ্রাবাদ থেকে ওঠার র্যাম্পের কাজ শুরুই হয়নি এখনো। নিমতলা মোড়ের দুটি র্যাম্পের কাজ শেষ হলেও টোল বক্স না থাকায় চালু করা যাচ্ছে না। ফকিরহাটে নামার র্যাম্পের মুখে বন্দর থানার জেটি পুলিশ ফাঁড়িটি সরিয়ে না নেওয়ায় আটকে আছে কাজ। এ ছাড়া সিইপিজেড ও কর্ণফুলী ইপিজেড এলাকার র্যাম্পগুলোর কাজ চলছে নামমাত্র গতিতে।
জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক মাহফুজুর রহমান বললেন, ‘নকশা জটিলতাসহ নানা কারণে কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছিল। যার কারণে কাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কাজ শেষ করতে বারবার তাগাদা দিচ্ছি। কিছু সমস্যা আছে। সেগুলো মন্ত্রী প্রকল্প পরিদর্শনের পর সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’