Image description
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচ পয়েন্ট

মাটিখেকোদের ভয়াবহ থাবায় লন্ডভন্ড পদ্মা। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা বিরতিহীনভাবে মাটিদস্যুরা লুট করছে পদ্মাগর্ভের উর্বর পলিমাটি। এই মাটি যাচ্ছে অর্ধশতাধিক ইটভাটায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দুটি ইউনিয়নের পদ্মা বাঁধের পাঁচটি পয়েন্টে নদীর বুক ফাঁকা করে দিচ্ছে শক্তিশালী এই সিন্ডিকেট। চরবাগডাঙা এবং সুন্দরপুর ইউনিয়নের সাত কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রকাশ্যেই এক্সকেভেটর (মাটি খননকারী যন্ত্র) দিয়ে উত্তোলন করা হচ্ছে মাটি।

পদ্মার বাঁধ দিয়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিকট শব্দে চলছে ট্রাক্টর। ওই এলাকার বাসিন্দারা ধুলার রাজ্যে বসবাস করছে। সারা রাত ট্রাক্টরের শব্দে ঘুমাতে পারছে না। এ এলাকা থেকে দিনরাতে উঠছে অন্তত দেড় হাজার ট্রাক্টর মাটি। জমির মালিকদের মাটির দাম, এক্সকেভেটর ও ট্রাক্টর ভাড়া এবং প্রশাসন ‘ম্যানেজ’সহ সব খরচ বাদ দিয়ে মাটি সিন্ডিকেট প্রতিদিন অবৈধভাবে পকেটে পুরছে অন্তত ৯ লাখ টাকা। প্রতিমাসে পৌনে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা।

এসব মাটি নদীসংলগ্ন চারটি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক ইটভাটায় যাচ্ছে। নদীর বাঁধের নিচেই পদ্মাগর্ভে রয়েছে অন্তত ১০টি ভাটা। নদী থেকে অবাধে মাটি তুলে এসব ভাটায় স্বল্প খরচে তৈরি করা হচ্ছে ইট। মাটি উত্তোলনের ফলে নদী রক্ষা বাঁধ এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। মাটি বহনকারী ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে নষ্ট হচ্ছে বাঁধ ও স্থানীয় সড়ক।

সরকারকে রাজস্ব না দিয়ে ক্ষমতার দাপটে পদ্মাগর্ভের মাটি উত্তোলনে প্রভাবশালী এ সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সুন্দরপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান মতি এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সাবেক এমপি আব্দুল ওদুদের ডানহাত হিসাবে খ্যাত আওয়ামী লীগ কর্মী আজিজুল ইসলাম।

স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসন ও পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করার নামে ট্রাক্টরপ্রতি মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আজিজুল। প্রশাসনের অভিযান এড়াতে ট্রাক্টরচালকদের দেওয়া হচ্ছে বিশেষ স্লিপ। এটি দেখালে ট্রাক্টর চলাচলে বাধা দেওয়া হয় না। নির্বিঘ্নে ট্রাক্টরগুলো ইটভাটাতে পৌঁছে দিচ্ছে নদীগর্ভের উর্বর পলিমাটি।

সাবেক চেয়ারম্যান মতি ও আজিজুল ছাড়াও বিশাল এ সিন্ডিকেটে তাদের সহযোগী হিসাবে কাজ করছেন-মুশফুল, সাদরুল, আসাদুল, জাহাঙ্গীর, আকবর ও জিয়া। যুগান্তরের সরেজমিন অনুসন্ধান এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে এসেছে পদ্মাগর্ভের মাটি লুটের চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য।

সরেজমিন : সরেজমিন দেখা যায়, ১ জুন সোমবার বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পদ্মাগর্ভে চলছে মাটি লুটের মহোৎসব। চরবাগডাঙা ইউনিয়নের আলিমনগরে বাঁধের নিচেই কাটা হচ্ছে মাটি। এর পাশে আট নম্বর বাঁধের নিচেও চলছে মাটি কাটার মহাযজ্ঞ। সাত নম্বর বাঁধের শিবিরের মোড় এলাকায় পৌঁছেই দেখা যায়, মার্টিভর্তি ট্রাক্টর নদী থেকে উঠছে। ছয় ও পাঁচ নম্বর বাঁধের নিচ থেকেও দেদার তোলা হচ্ছে মাটি।

অর্ধশতাধিক ইটভাটায় যাচ্ছে নদীর মাটি : সুন্দরপুর, রাণীহাটি, ইসলামপুর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার ইটভাটায় যাচ্ছে নদীর মাটি। রাণীহাটি ইউনিয়নের বাবুপুর এলাকার ইটভাটার একজন মালিক নাম প্রকাশ না শর্তে বলেন, ‘নদীর পলি মাটি ইট তৈরির জন্য বিশেষ উপযোগী। পাশেই নদীর জন্য ঝামেলা ছাড়া মাটি সংগ্রহ করা যায়। এক ট্রাক্টর মাটির দাম দিতে হয় আড়াই হাজার টাকা।’

এছাড়া আট থেকে চার নম্বর বাঁধের নিচে পদ্মাগর্ভেই রয়েছে অন্তত ১০টি ভাটা। এসব ভাটার পাশে মাটি বিশাল স্তূপাকারে রাখা হয়েছে। এরকম একটি ভাটার মালিক সুন্দরপুর ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য রফিকুল ইসলাম। সরেজমিন দেখা হলে তিনি বলেন, ‘মাটি সহজলভ্য হওয়ার কারণেই বাঁধের নিচেই ভাটা করেছি। খুব কম খরচেই ইট তৈরি সম্ভব হচ্ছে।’

মুখ খুলতে চান না ট্রাক্টর মালিকরা : পাঁচটি পয়েন্টে দিনরাতে অন্তত দেড় হাজার ট্রাক্টরে মাটি বহন করা হচ্ছে। ট্রাক্টরপ্রতি ভাড়া কত নেওয়া হচ্ছে, জিজ্ঞেস করলে চালকরা মুখ খুলতে চাননি। নবাবজায়গির এলাকার বজলু কালু এবং সেলিম নামের দুই ট্রাক্টর মালিকের ফোন নম্বর সংগ্রহ করা হয়। ফোনে কল করলে তারা কোনো কথা বলতে চাননি।

মাটি লুটের কর্মযজ্ঞে বিভিন্ন খাতে ব্যয় ও মোট আয় : বাঁধের নিচে নদীগর্ভে রয়েছে ওই এলাকার মানুষের নিজস্ব মালিকানাধীন জমি। এগুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব জমির মালিক ট্রাক্টরপ্রতি মাটির দাম নেন ৪০০ টাকা। ইটভাটায় পৌঁছাতে ট্রাক্টর ভাড়া দিতে হয় এক হাজার টাকা। প্রতি ট্রাক্টর মাটি উঠানোর জন্য এস্ককেভেটর ভাড়া ২৫০ টাকা। আর প্রশাসন ও পুলিশ ‘ম্যানেজ’ বাবদ খরচ ২৫০ টাকা। সবমিলিয়ে এক ট্রাক্টর মাটি ভাটায় পৌঁছাতে খরচ হয় ১ হাজার ৯০০ টাকা।

ভাটার মালিকরা ট্রাক্টর প্রতি দুই হাজার ৫০০ টাকা দাম দেওয়ায় লাভ হয় ৬০০ টাকা। প্রতিদিন দেড় হাজার ট্রাক্টরে লাভ আসে ৯ লাখ টাকা। এভাবে প্রতিমাসে চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আর প্রতিদিন পুলিশ ও প্রশাসন ম্যানেজের নামে চাঁদাবাজি হচ্ছে প্রায় পৌনে চার লাখ টাকা। এর পরিমাণ মাসে কোটি টাকারও অধিক।

সিন্ডিকেটের মূলহোতা সাবেক চেয়ারম্যান মতি ও আজিজুল : পদ্মার মাটি লুটের বিষয়ে পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন সিন্ডিকেটের মূল দুই হোতা মতি ও আজিজুল। তবে মাটি উত্তোলনের বিষয়টি আংশিক স্বীকার করে মতি বলেন, প্রতিদিন দেড় হাজার না, খুব বেশি হলে ৫০ থেকে ৬০ ট্রাক্টর মাটি ওঠে। আমি এসবের সঙ্গে যুক্ত না। পদ্মার মাটি আজিজুল এবং তার সহযোগীরা তুলছেন।

অভিযোগ অস্বীকার করে আজিজুল বলেন, ‘সাবেক চেয়ারম্যান মতি সঠিক বলেননি। আমি মাটি উত্তোলনের সঙ্গে আগে যুক্ত ছিলাম। প্রশাসনকে ম্যানেজের নামে টাকা উত্তোলনের বিষয়টি ভিত্তিহীন।’

প্রশাসন ও পুলিশের বক্তব্য : চাঁপাইনবাগঞ্জ সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইকরামুল হক নাহিদ মাটি উত্তোলন হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা প্রায়ই অভিযান চালাচ্ছি। শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। আগে দিনে মাটি কাটা হলেও এখন রাতে কাটার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অভিযান চালালে দু-চারদিন বন্ধ রেখে আবারও শুরু হয়। আর প্রশাসনের টাকা নেওয়ার অভিযোগটি পুরোপুরি ভিত্তিহীন।’ এ ব্যাপারে বক্তব্যের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার ওসি একরামুল হোসাইনকে মোবাইলফোনে কল করা হয়। তবে কল ধরেন ওসি (তদন্ত) আব্দুর রউফ তালুকদার। তিনি বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে আমার জানা নেই।’