জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বড় ধরনের প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল পুলিশবাহিনী। জনরোষ ও হামলার শিকার হয়ে এ বাহিনীর শীর্ষ কর্তাসহ অনেকেই তখন আত্মগোপনে চলে যান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেতৃত্বে পরিবর্তন এনে ঢেলে সাজানো হয় পুলিশবাহিনীকে। চলতি বছর বিএনপি সরকার গঠন করার পর পুলিশের নেতৃত্বে আরেক দফা পরিবর্তন আসে। দ্বিতীয় দফায় পুলিশকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে এসব উদ্যোগের পরও পুলিশের মনোবল এখনো পুরোপুরি চাঙা হয়নি। আলোচনা আছে, ৫ আগস্টের ট্রমা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি পুলিশ। সরকারের অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও ফেরেনি পূর্ণ মনোবলও। একসময় পুলিশকে দেখলে অপরাধীরা দৌড়ে পালাত। অথচ এখন সেই পুলিশই বিভিন্ন জায়গায় হামলার শিকার হচ্ছে।
যানবাহনের চালকরা একসময় ট্রাফিক পুলিশ দেখলেই সমীহ করতে বাধ্য হলেও এখন একধরনের ‘ড্যামকেয়ার’ ভাব তাদের। দু-একটি ঘটনায় উলটো ট্রাফিক পুলিশের ওপর হামলা; এমনকি কোথাও কোথাও তাদের গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনাও আছে। অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের আজকাল প্রায়ই সড়কে পুলিশের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে; যা আগে ছিল কল্পনারও বাইরে। এছাড়া ৫ আগস্টের পর তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েক জায়গায় থানা ঘেরাওয়ের মতো ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ রোববার রাতেও নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন কিছু এলাকাবাসী।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে সারা দেশে পুলিশের ওপর ২৮৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় আহত হয়েছেন বহু পুলিশ সদস্য। অনেকের মতে, এসব কারণে পুলিশ অনেক ভেবেচিন্তে পা ফেলছে। পরবর্তী পরিস্থিতি কী হতে পারে, এটি বিবেচনায় নিয়েই এ বাহিনীর সদস্যরা এখন কাজ করছেন। একান্ত বাধ্য না হলে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এখন অনেকেই এড়িয়ে চলছেন। এ কারণে মাঠ পর্যায়ে কর্মরতদের অনেকের মাঝে এক ধরনের ‘গাছাড়া ভাব’ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
জানা যায়, বাধ্যতামূলক অবসর আতঙ্কও আছে পুলিশের মধ্যে। আছে চাকরি হারানোর ভয়ও। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। পুলিশের ‘চেইন অব কমান্ড; প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশে কয়েক দফা বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার ঘটনা ঘটে। নতুন সরকারের সময়েও এ ধারা অব্যাহত আছে। ফলে চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়েও পুলিশের একটি অংশ ভয়ে আছে। এর প্রভাব পড়ছে দায়িত্ব পালনসহ পুলিশের বিভিন্ন কার্যক্রমে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ নানা সূত্র থেকে জানা যায়, এসব সমস্যার সঙ্গে নতুন সংকট হিসাবে যুক্ত হয়েছে পুলিশের ভেতরকার গ্রুপিং। কিছু দক্ষ কর্মকর্তা গ্রুপিংয়ের বলি হয়ে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে কোণঠাসা করার চেষ্টায় তৎপর রয়েছে-এমন দাবি খোদ পুলিশ কর্মকর্তাদেরই। এর প্রভাব পড়ছে মাঠের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমে। সার্বিক পরিস্থিতিতে অপরাধীরা দিনদিন বেপরোয়া হচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানায়, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সারা দেশে ৬০৫টি খুন এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশের সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, ‘আগের মনোবলে শুধু পুলিশ নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্য কেউই যেতে পারছে না। পুলিশকে আরও শক্তিশালী হতে হবে। ফার্ম-আপ (কোনো কিছুকে আরও দৃঢ়, স্থিতিশীল বা মজবুত করা) করতে হবে। তাছাড়া উপায় নেই। এখানে কম্প্রোমাইজের কোনো সুযোগ নেই।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, ৫ আগস্টের ঘটনার সূত্র ধরে পুলিশের যে মানসিক ক্ষত হয়েছে, তা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি পুলিশ। আইন প্রয়োগ বা অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে পুলিশের সেই মানসিক মনোবল এবং পেশাগত নৈপুণ্য কিংবা পেশাগত দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ৫ আগস্টের সূত্র ধরে পুলিশে একধরনের ছন্দপতন ঘটেছে। পুলিশের সেই ছন্দপতনটা এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, দেশে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো আছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেছেন, ‘ডিএমপির পুলিশ পূর্ণোদ্যমে কাজে ফিরেছে।’ সাম্প্রতিক সময়ের কিছু অপরাধের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এগুলো যুগ যুগ ছিল, থাকবে, আগামী দিনেও থাকবে। একদম ১০০% ক্রাইম কোনোদিন ফ্রি করা যাবে না।’
পুলিশ এখনো শক্ত অবস্থনে দাঁড়াতে পারেনি-এমন আলোচনা খোদ পুলিশবাহিনীর মধ্যেই রয়েছে। সারা দেশে খোঁজ নিয়েও পুলিশে এমন পরিস্থিতির কথা জানা গেছে। পুলিশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) অপরাধ দমনে কতখানি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ, প্রকাশ্যে ছিনতাই, খুন ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে চলছে প্রায় প্রতিদিনই। ডিএমপির গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) অপরাধ দমনে আগাম পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে; যার প্রভাব পড়ছে মাঠের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে।
সর্বশেষ রোববার বিকালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখার সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৭ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ছিনতাইকারীদের গুলিতে মো. লোকমান নামের ‘মানি এক্সচেঞ্জ’ ব্যবসায়ী আহত হয়েছেন। তার হাত ও পায়ে দুটি গুলি লাগে। আদাবর, বসিলাসহ পুরো মোহাম্মদপুর এলাকা এখন অপরাধীদের এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। ছিনতাই ও খুনখারাবি ছাড়াও সেখানে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতে সাধারণ মানুষ একরকম জিম্মি। সাধারণ মানুষ দিনেও চলাফেরা করতে ভয় পাচ্ছেন। রাত নামলেই অপরাধীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। গভীর রাতেও ছিনতাইকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মোহাম্মদপুর এলাকার এক বাসিন্দা যুগান্তরকে বলেন, রাত ১টার পরও কিশোর গ্যাং-এর সদস্য, ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিরা সড়কে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। তাদের ঠেকানোর কেউ নেই।
রাজধানীর মগবাজার এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, অফিসের লেটনাইট শেষে রাত ২টার দিকে হাতিরঝিল হয়ে বাসায় ফিরি। সর্বশেষ শুক্রবার রাতেও দেখেছি হাতিরঝিলের সড়কের বিভিন্ন স্থানে কিশোর, যুবক দল বেঁধে ঘুরছে। এত রাতে তাদের এখানে কাজ কী, তা দেখার কেউ নেই।
২৮ এপ্রিল রাতে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন নামে এক সন্ত্রাসীকে হত্যা করে প্রতিপক্ষ গ্রুপ। পুলিশের টহল গাড়ি থাকলেও দুই কিলার নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
ডিএমপির অপরাধসংক্রান্ত মামলার পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে ৫৭টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে দস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনা ৯০টি এবং অপহরণের ৫৪টি ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া মোট চুরির (গাড়ি, সিঁধেল ও সাধারণ চুরি) ঘটনায় ৪২৮টি মামলা হয়েছে।
বিভিন্ন অপরাধের ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে মানুষ। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিভিন্ন অপরাধের ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের মনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। নিরাপত্তা নিয়ে তাদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অনেকে সন্ধ্যার পর বাসা থেকে বের হতে চান না। আবার বাসায় ফিরতেও কেউ কেউ আতঙ্কে থাকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান যুগান্তরকে বলেন, অপরাধের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি হয়। নেতিবাচক খবরের কারণে অনেকের মনস্তাত্ত্বিক উদাসীনতা তৈরি হয়।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশ পুরোপুরি সক্রিয় না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। বরং মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকবে। হত্যা, ধর্ষণ, খুনসহ নানা অপরাধ প্রতিনিয়ত সংঘটিত হলে এবং ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হবে। এর প্রভাব পড়বে সব ক্ষেত্রে। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে-সরকার এ ধরনের বক্তব্য দিলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্নকথা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে না পারলে সরকারকেই কঠিন চ্যা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বড় ধরনের প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল পুলিশবাহিনী। জনরোষ ও হামলার শিকার হয়ে এ বাহিনীর শীর্ষ কর্তাসহ অনেকেই তখন আত্মগোপনে চলে যান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেতৃত্বে পরিবর্তন এনে ঢেলে সাজানো হয় পুলিশবাহিনীকে। চলতি বছর বিএনপি সরকার গঠন করার পর পুলিশের নেতৃত্বে আরেক দফা পরিবর্তন আসে। দ্বিতীয় দফায় পুলিশকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে এসব উদ্যোগের পরও পুলিশের মনোবল এখনো পুরোপুরি চাঙা হয়নি। আলোচনা আছে, ৫ আগস্টের ট্রমা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি পুলিশ। সরকারের অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও ফেরেনি পূর্ণ মনোবলও। একসময় পুলিশকে দেখলে অপরাধীরা দৌড়ে পালাত। অথচ এখন সেই পুলিশই বিভিন্ন জায়গায় হামলার শিকার হচ্ছে।
যানবাহনের চালকরা একসময় ট্রাফিক পুলিশ দেখলেই সমীহ করতে বাধ্য হলেও এখন একধরনের ‘ড্যামকেয়ার’ ভাব তাদের। দু-একটি ঘটনায় উলটো ট্রাফিক পুলিশের ওপর হামলা; এমনকি কোথাও কোথাও তাদের গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনাও আছে। অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের আজকাল প্রায়ই সড়কে পুলিশের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে; যা আগে ছিল কল্পনারও বাইরে। এছাড়া ৫ আগস্টের পর তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েক জায়গায় থানা ঘেরাওয়ের মতো ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ রোববার রাতেও নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন কিছু এলাকাবাসী।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে সারা দেশে পুলিশের ওপর ২৮৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় আহত হয়েছেন বহু পুলিশ সদস্য। অনেকের মতে, এসব কারণে পুলিশ অনেক ভেবেচিন্তে পা ফেলছে। পরবর্তী পরিস্থিতি কী হতে পারে, এটি বিবেচনায় নিয়েই এ বাহিনীর সদস্যরা এখন কাজ করছেন। একান্ত বাধ্য না হলে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এখন অনেকেই এড়িয়ে চলছেন। এ কারণে মাঠ পর্যায়ে কর্মরতদের অনেকের মাঝে এক ধরনের ‘গাছাড়া ভাব’ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
জানা যায়, বাধ্যতামূলক অবসর আতঙ্কও আছে পুলিশের মধ্যে। আছে চাকরি হারানোর ভয়ও। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। পুলিশের ‘চেইন অব কমান্ড; প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশে কয়েক দফা বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার ঘটনা ঘটে। নতুন সরকারের সময়েও এ ধারা অব্যাহত আছে। ফলে চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়েও পুলিশের একটি অংশ ভয়ে আছে। এর প্রভাব পড়ছে দায়িত্ব পালনসহ পুলিশের বিভিন্ন কার্যক্রমে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ নানা সূত্র থেকে জানা যায়, এসব সমস্যার সঙ্গে নতুন সংকট হিসাবে যুক্ত হয়েছে পুলিশের ভেতরকার গ্রুপিং। কিছু দক্ষ কর্মকর্তা গ্রুপিংয়ের বলি হয়ে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে কোণঠাসা করার চেষ্টায় তৎপর রয়েছে-এমন দাবি খোদ পুলিশ কর্মকর্তাদেরই। এর প্রভাব পড়ছে মাঠের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমে। সার্বিক পরিস্থিতিতে অপরাধীরা দিনদিন বেপরোয়া হচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানায়, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সারা দেশে ৬০৫টি খুন এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশের সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, ‘আগের মনোবলে শুধু পুলিশ নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্য কেউই যেতে পারছে না। পুলিশকে আরও শক্তিশালী হতে হবে। ফার্ম-আপ (কোনো কিছুকে আরও দৃঢ়, স্থিতিশীল বা মজবুত করা) করতে হবে। তাছাড়া উপায় নেই। এখানে কম্প্রোমাইজের কোনো সুযোগ নেই।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, ৫ আগস্টের ঘটনার সূত্র ধরে পুলিশের যে মানসিক ক্ষত হয়েছে, তা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি পুলিশ। আইন প্রয়োগ বা অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে পুলিশের সেই মানসিক মনোবল এবং পেশাগত নৈপুণ্য কিংবা পেশাগত দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ৫ আগস্টের সূত্র ধরে পুলিশে একধরনের ছন্দপতন ঘটেছে। পুলিশের সেই ছন্দপতনটা এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, দেশে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো আছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেছেন, ‘ডিএমপির পুলিশ পূর্ণোদ্যমে কাজে ফিরেছে।’ সাম্প্রতিক সময়ের কিছু অপরাধের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এগুলো যুগ যুগ ছিল, থাকবে, আগামী দিনেও থাকবে। একদম ১০০% ক্রাইম কোনোদিন ফ্রি করা যাবে না।’
পুলিশ এখনো শক্ত অবস্থনে দাঁড়াতে পারেনি-এমন আলোচনা খোদ পুলিশবাহিনীর মধ্যেই রয়েছে। সারা দেশে খোঁজ নিয়েও পুলিশে এমন পরিস্থিতির কথা জানা গেছে। পুলিশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) অপরাধ দমনে কতখানি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ, প্রকাশ্যে ছিনতাই, খুন ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে চলছে প্রায় প্রতিদিনই। ডিএমপির গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) অপরাধ দমনে আগাম পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে; যার প্রভাব পড়ছে মাঠের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে।
সর্বশেষ রোববার বিকালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখার সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৭ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ছিনতাইকারীদের গুলিতে মো. লোকমান নামের ‘মানি এক্সচেঞ্জ’ ব্যবসায়ী আহত হয়েছেন। তার হাত ও পায়ে দুটি গুলি লাগে। আদাবর, বসিলাসহ পুরো মোহাম্মদপুর এলাকা এখন অপরাধীদের এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। ছিনতাই ও খুনখারাবি ছাড়াও সেখানে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতে সাধারণ মানুষ একরকম জিম্মি। সাধারণ মানুষ দিনেও চলাফেরা করতে ভয় পাচ্ছেন। রাত নামলেই অপরাধীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। গভীর রাতেও ছিনতাইকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মোহাম্মদপুর এলাকার এক বাসিন্দা যুগান্তরকে বলেন, রাত ১টার পরও কিশোর গ্যাং-এর সদস্য, ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিরা সড়কে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। তাদের ঠেকানোর কেউ নেই।
রাজধানীর মগবাজার এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, অফিসের লেটনাইট শেষে রাত ২টার দিকে হাতিরঝিল হয়ে বাসায় ফিরি। সর্বশেষ শুক্রবার রাতেও দেখেছি হাতিরঝিলের সড়কের বিভিন্ন স্থানে কিশোর, যুবক দল বেঁধে ঘুরছে। এত রাতে তাদের এখানে কাজ কী, তা দেখার কেউ নেই।
২৮ এপ্রিল রাতে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন নামে এক সন্ত্রাসীকে হত্যা করে প্রতিপক্ষ গ্রুপ। পুলিশের টহল গাড়ি থাকলেও দুই কিলার নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
ডিএমপির অপরাধসংক্রান্ত মামলার পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে ৫৭টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে দস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনা ৯০টি এবং অপহরণের ৫৪টি ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া মোট চুরির (গাড়ি, সিঁধেল ও সাধারণ চুরি) ঘটনায় ৪২৮টি মামলা হয়েছে।
বিভিন্ন অপরাধের ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে মানুষ। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিভিন্ন অপরাধের ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের মনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। নিরাপত্তা নিয়ে তাদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অনেকে সন্ধ্যার পর বাসা থেকে বের হতে চান না। আবার বাসায় ফিরতেও কেউ কেউ আতঙ্কে থাকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান যুগান্তরকে বলেন, অপরাধের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি হয়। নেতিবাচক খবরের কারণে অনেকের মনস্তাত্ত্বিক উদাসীনতা তৈরি হয়।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশ পুরোপুরি সক্রিয় না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। বরং মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকবে। হত্যা, ধর্ষণ, খুনসহ নানা অপরাধ প্রতিনিয়ত সংঘটিত হলে এবং ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হবে। এর প্রভাব পড়বে সব ক্ষেত্রে। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে-সরকার এ ধরনের বক্তব্য দিলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্নকথা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে না পারলে সরকারকেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
তাদের মতে, পুলিশ কোথাও আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে বাধার মুখোমুখি বা আক্রমণের শিকার হলে তাদের মনোবলে চিড় ধরে। এর ফলে অপরাধীরা সুযোগ নেয়। এক্ষেত্রে পুলিশের কাজে বাধা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে যে কথা বলা হয়, এই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, একই ধরনের কথা বলে। আরেকটা বড় বিষয় হচ্ছে-পুলিশের মধ্যে একটা সমন্বয়ের ঘাটতি আছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পুলিশে নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে যারা ছিল, যারা হুকুম দিয়ে পুলিশকে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে, তাদের বড় একটা অংশ দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও অবস্থান করছে অথবা আত্মগোপনে আছে। কিন্তু আইনের মুখোমুখি হতে হয়েছে মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করেন তাদের। তিনি বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই বলেছি পুলিশের পরিপূর্ণ মাত্রায় বা শক্তিতে ফিরে আসতে সময় লাগবে। এটি রাতারাতি হবে না। কেননা আমাদের মতো দেশে সবাই পুলিশকে ব্যবহার করতে চায়, ব্যবহার করে নিজের স্বার্থে পরিস্থিতি তৈরি করা বা বিরোধী মতকে নিয়ন্ত্রণে রাখাসহ নানা কাজ করতে চায়।
লেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
তাদের মতে, পুলিশ কোথাও আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে বাধার মুখোমুখি বা আক্রমণের শিকার হলে তাদের মনোবলে চিড় ধরে। এর ফলে অপরাধীরা সুযোগ নেয়। এক্ষেত্রে পুলিশের কাজে বাধা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে যে কথা বলা হয়, এই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, একই ধরনের কথা বলে। আরেকটা বড় বিষয় হচ্ছে-পুলিশের মধ্যে একটা সমন্বয়ের ঘাটতি আছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পুলিশে নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে যারা ছিল, যারা হুকুম দিয়ে পুলিশকে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে, তাদের বড় একটা অংশ দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও অবস্থান করছে অথবা আত্মগোপনে আছে। কিন্তু আইনের মুখোমুখি হতে হয়েছে মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করেন তাদের। তিনি বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই বলেছি পুলিশের পরিপূর্ণ মাত্রায় বা শক্তিতে ফিরে আসতে সময় লাগবে। এটি রাতারাতি হবে না। কেননা আমাদের মতো দেশে সবাই পুলিশকে ব্যবহার করতে চায়, ব্যবহার করে নিজের স্বার্থে পরিস্থিতি তৈরি করা বা বিরোধী মতকে নিয়ন্ত্রণে রাখাসহ নানা কাজ করতে চায়।