Image description
অপারেশন ‌'জঙ্গল সলিমপুর' (১)

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। খাতা-কলমে সরকারি খাসজমি হলেও তিন দশক ধরে এটি ছিল অপরাধীদের ‘অভয়ারণ্য’ আর প্রভাবশালীদের ‘টাকা ছাপানোর মেশিন’। এই অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল নিয়ন্ত্রক শীর্ষ সন্ত্রাসী মুহাম্মদ ইয়াসিনকে ২০২২ সালে গ্রেফতার করে পদে টিকতে পারেননি খোদ তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মমিনুর রহমান। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে হত্যার হুমকির মুখে পড়া ডিসিকে শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামই ছাড়তে হয়েছিল। তবে ইয়াসিনকে গ্রেফতারের পর তার নেপথ্যের প্রভাবশালী গডফাদাররা যখন তাকে জামিনে ছাড়িয়ে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে, তখন তাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। তার কঠোর নির্দেশে আটকে যায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের জামিন প্রক্রিয়া।

পাহাড় দখল, বিদ্যুৎ, পানি, মাদক আর জমির প্লট বেচে এই জঙ্গল থেকে বছরে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি শক্তিশালী চক্র। ইয়াসিনের নেপথ্যে ‘গডফাদার’ হিসাবে কাজ করেছেন চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিনসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। যুগান্তরের মাসব্যাপী অনুসন্ধানে জঙ্গল সলিমপুরের এই চাঞ্চল্যকর অপরাধ সাম্রাজ্যের আদ্যোপান্ত বেরিয়ে এসেছে।

সরেজমিন দেখা যায়, জঙ্গল সলিমপুর ভৌগোলিকভাবে চট্টগ্রাম শহরসংলগ্ন। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী লিংক রোডের উত্তর পাশে প্রায় ৩ হাজার ১শ একর পাহাড়ি এলাকা সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নে পড়েছে। ভূমি অফিসের রেকর্ডপত্রে ইউনিয়নের নামের সঙ্গে মিল রেখে ‘জঙ্গল সলিমপুর’ নামেই এলাকাটি পরিচিতি পায়। প্রায় তিন দশক ধরে এই সরকারি খাসজমি দখল করে গড়ে উঠেছে বিশালাকার অবৈধ জনবসতি। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন ভূ-প্রকৃতির কারণে এটি এক সময় দেশের ভেতর আরেক দেশ এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। শহরের নিকটবর্তী হওয়ায় প্রতি শতক জমির দাম ১০ থেকে ১১ লাখ টাকা। সে হিসাবে এই সরকারি খাসজমির বর্তমান দাম প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এ কারণে আওয়ামী লীগ আমলের প্রভাবশালীদের একটি চোখ এখানেই ছিল। এখানে বারবার অভিযান ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু আবার প্রভাবশালীদের তদবিরে জোড়া লাগে বিদ্যুতের তার। সব কিছুর পেছনে ছিল অবৈধ টাকার মহড়া। আর অবৈধ আয়ের উৎস জিইয়ে রাখে বিদ্যুৎ বিভাগ, ওয়াসা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। ইয়াসিনকে গ্রেফতার করতে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন জানতে চাইলে চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ মমিনুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আমি চট্টগ্রামে দুই বছর ডিসি ছিলাম। এ সময়ের মধ্যে জঙ্গল সলিমপুরে ২৭টি অভিযান পরিচালনা করি। সবচেয়ে বড় অভিযানটি ছিল ২০২২ সালের জুলাই মাসে। অভিযানের দিন আমার এডিসি, এসিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন আহত হয়েছিলেন। তারপরও সেদিন ইয়াসিনের দুর্গ ভেঙে তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হই। এরপর প্রভাবশালী চক্র থেকে তাকে জামিনে মুক্ত করতে গোপনে তদবির শুরুর বিষয়টি জানতে পারি।

তিনি বলেন, ইয়াসিনের বিষয়টি সরকারের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তারাও জানতেন। এরপর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর সঙ্গে হয়তো কেউ একজন দেখা করেন। তাকে বিষয়টি জানান। পরবর্তীতে তিনি (হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী) সংশ্লিষ্ট বিচারকদের তার (ইয়াসিন) জামিনের ব্যাপারে সতর্ক করেন।

সাবেক এই ডিসি আরও বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে ৩১শ একর খাস জমি উদ্ধার করে এলাকার সার্বিক উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যানও করা হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ২০২২ সালেই জঙ্গলে গড়ে উঠা অবৈধ আয়ের সব পথ করে দেওয়া হয়। সেখানে প্রথমেই বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। একদিক খোলা রেখে জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশের তিনটি সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর আমি নিজেই নিরাপত্তহীনতায় পড়ে যাই। ডিসি থাকাবস্থায়ই আদালতে আমার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা হতে দেখে রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে যাই। আমার বাসায় ফোন করে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসীরা। টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে ছেলের স্কুল বন্ধ করে দিই। এই আতঙ্কে এখনো আমার স্ত্রী শয্যাশায়ী।

জানা যায়, তারপরও ইয়াসিনকে বেশি দিন আটকে রাখা যায়নি। এক বছর কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পায় সে। এরপর স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে জঙ্গল সলিমপুরে তার অবস্থান আরও শক্ত করে। ২৫ মে র‌্যাবের ওপর হামলা করে ইয়াসিন আবারও তার শক্তির জানান দেয়। বর্তমানে এই শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাতক থাকলেও গোপন অবস্থান থেকে এই অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে।

ভয়ংকর চিত্র সর্বোচ্চ ফোরামে : ২০২২ সালে জঙ্গল সলিমপুরের খাসজমি অবৈধ দখলমুক্ত করে সার্বিক উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যান করা হয়। এ বিষয়ে প্রকল্প তৈরি করতে ৫ কোটি টাকা খরচ করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে এক সভায় সেখানে ২২টি প্রতিষ্ঠান করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। সভায় চট্টগ্রামের তৎকালীন ডিসি মোহাম্মদ মমিনুর রহমান জঙ্গল সলিমপুরের ভয়ংকর চিত্র উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, কতিপয় পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী নির্বিচারে পাহাড় কেটে প্লট বিক্রির কারণে চট্টগ্রামের পরিবেশ-প্রতিবেশ আর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

তখন তিনি আরও বলেন, ২০০২-০৩ সালের দিকে দেশের বিভিন্ন এলাকার সন্ত্রাসী, ভূমিদস্যু ও দাগি আসামিরা এসব খাস পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি স্থাপন শুরু করে। তখন এলাকাটি অতি দুর্গম ছিল। পরবর্তীতে ওই এলাকার প্রায় মাঝ বরাবর সিডিএ (চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) ‘বায়েজিদ লিংক রোড’ নামে একটি ৪ লেনবিশিষ্ট সড়ক তৈরি করে। ফলে এটি চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে সুন্দর ও দামি জায়গায় পরিণত হয়। সবশেষ জনশুমারি অনুযায়ী এ এলাকায় প্রায় ২০ হাজার (২০১৮ সাল, বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার) লোক বসবাস করছেন। ২০১৩-১৪ সালে বায়েজিদ লিংক রোড চালু হওয়ার পর পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা বিভিন্ন ছিন্নমূল সমিতির নামে একের পর এক পাহাড়/টিলা কেটে প্লট আকারে বিক্রি শুরু করে। পাশাপাশি মাদক, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, অবৈধ স্বর্ণ ব্যবসা, মুক্তিপণ আদায়, খুন, দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ হেন কোনো অপরাধ নেই যা এখানে সংঘটিত হয় না।

অস্ত্র কারখানার ভয়ংকর তথ্য : সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ওই সভায় আরও বলা হয়, এখানে অস্ত্র তৈরির কারখানাও গড়ে উঠেছিল। সন্ত্রাসী মশিউরকে এ এলাকা থেকে গ্রেফতার করার সময় র‌্যাব-৭ কে ১৪০ রাউন্ড গুলি করতে হয়েছিল। এলাকাটির জায়গায় জায়গায় সন্ত্রাসী, ভূমিদস্যু, অপরাধীদের চেকপোস্ট রয়েছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সেখানে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া যেতে পারে না। কোনো আসামি বা সন্ত্রাসীকে এ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান প্রতিহত করতে মহিলা এবং শিশুদের মানব-ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালীদের পকেটে শতকোটি টাকা : তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, জঙ্গল সলিপুরে আয়ের বড় উৎস ছিল বিদ্যুৎ। এখানে ২০টি মিটারের অনুকূলে অন্তত ৩০ হাজার অবৈধ বসতিতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। সাবমিটার পেতে গ্রাহককে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা ইয়াসিনকে দিতে হতো। এরপর প্রতি মাসে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হতো সে পরিমাণ টাকা ইয়াসিনের নিজস্ব ‘মিনি ব্যাংকে’ জমা দিতে হতো। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে পাঠানো বিলের কপি নিজের হাতে রেখে ইয়াসিন নিজেই বিল জমা নেওয়ার কার্যালয় খুলে বসে। ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’র নামে ভাউচার ছাপিয়ে ইচ্ছামতো এই বিল আদায় করা হতো। যুগান্তরের অনুসন্ধানে বিদ্যুৎ বিলের অনুকূলে ব্যবহৃত ভাউচার প্যাড পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছিন্নমূল বস্তির একজন বাসিন্দা যুগান্তরকে বলেন, বিদ্যুৎ বিল কিভাবে আসে জানি না। আগে দেখতাম কম্পিউটারে টাইপ করা বিল আসত। এখন দেখি হাতে লেখা সংগ্রাম পরিষদের নামে প্যাডে বিল করা হচ্ছে। বিল যদি আসে ৩শ টাকা সেটার সামনে আরেকটি ১ বসিয়ে করা হয় ১৩শ টাকা। এভাবেই হাজার হাজার গ্রাহকের গলা কেটে কোটি কোটি তুলে নেওয়া হয়। এ নিয়ে ভয়ে কেউ কথা বলতেও পারে না। কথা বললেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এরপর পানির লাইন, মোবাইল টাওয়ার, অটোরিকশা চার্জ, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাত থেকে অন্তত শতকোটি টাকার অবৈধ আয় রয়েছে।

এই অপরাধ সাম্রাজ্যের আয়ের একটি বড় অংশ যেত পুলিশ, জেলা প্রশাসন, বিদ্যুৎ বিভাগ ও ওয়াসার কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার কাছে। তারা টাকার বিনিময়ে সেখানকার সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতেন।