Image description

সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সর্বনিম্নে নেমেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে। রপ্তানি খাতের কর্মকাণ্ড হ্রাস পাচ্ছে। পর্যাপ্ত ডলারের জোগান থাকলেও আমদানি বাণিজ্যি স্বাভাবিক হচ্ছে না। এর ফলে শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব অব্যাহত রয়েছে। এসবের কারণে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিও হচ্ছে নিম্নমুখী।

রোববার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দশ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে ৩ দশমিক ২০ শতাংশ। যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্নে। গত মার্চে একই খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছিল ৩ দশমিক ০২ শতাংশ। এ হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে মাত্র দশমিক ১৮ শতাংশ। এই বৃদ্ধির মধ্যে নতুন ঋণ বিতরণ খুবই কম। বেশির ভাগই চলমান ঋণের সুদ যোগ হয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছে। এছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার যে অবমূল্যায়ন হয়েছে সে তুলনায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বলতে বাড়েনি, বরং উলটো কমেছে।

এদিকে গত এক বছরের হিসাবে অর্থাৎ গত বছরের এপ্রিলের শেষের দিকে তুলনায় চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ঋণ প্রবাহ বেড়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। গত পুরো অর্থবছরে ঋণ প্রবাহ বেড়েছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই এপ্রিল সময়ে ঋণ প্রবাহ বেড়েছিল ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছিল ৭ দশমিক ১৯ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ঋণ প্রবাহ বেড়েছিল ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছিল ১০ দশমিক ১৬ শতাংশ।

প্রাপ্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, করোনার সময় থেকেই বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমছে। করোনার পর ২০২২ সালে বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবেও কমেছে। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র জনতার আন্দোলনের প্রভাবেও কমেছে। ওই বছরের ৫ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরই শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ। এর প্রভাবে দেশের পাশাপাশি বৈশ্বিকভাবেও অস্থিরতা দেখা দেয়। ফলে গত সাড়ে তিন মাসেও সরকার বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর মতো তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

উদ্যোক্তারা বলেছেন, আমদানির জন্য ব্যাংকগুলো থেকে পর্যাপ্ত ডলারের জোগান পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংক এলসি খোলার আগে ডলারের সংস্থান করে। তারপর এলসি খুলে। ডলারের আগাম সংস্থান না করতে পারায় ব্যাংক এলসি খোলা বিলম্বিত করছে। ফলে আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্পের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরচ্ছিন্ন জোগান মিলছে না। ফলে অনেক কারখানার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে। কিন্তু গ্যাসের অভাবে চালু করাও সম্ভবত হচ্ছে না। শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের জোগান দেওয়ার সরকারের কোনো স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও দেখা যাচ্ছে না। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে যেসব কারখানা রয়েছে সেগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুতের আপডাউনের ফলে কারখানার যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। এ জন্য অনেক কারখানায় নিজস্ব উদ্যোগে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে এ খাতেও ব্যয় বেড়েছে। এসব কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে বসে আছেন।

প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করা হয় ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে। চলতি অর্থবছরের জুলাই মার্চে এ খাতে এলসি খোলা কমেছে ১০ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং আমদানি কমেছে ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের পুরো সময় ধরেই এ খাতে এলসি খোলার পাশাপাশি আমদানি কমছে। ফলে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত অর্থবছরে এ খাতে আমদানি বেড়েছিল ১৮ দশমিক ৬২ শতাংশ। শিল্পের অন্যান্য খাতে আমদানিও কমছে। ফলে সার্বিকভাবে শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।