রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপর তার বাসায় ছুটে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২১ মে রাতে তিনি রামিসার বাবা-মায়ের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্রনা দেন। সমবেদনা প্রকাশ করেন। তিনি রামিসার মা-বাবা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। বর্বরোচিত এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুঃখ প্রকাশ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানসহ পদস্থ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রামিসার পরিবারকে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সঠিক বিচার নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তিনি রামিসার বড় বোনের পড়াশোনা ও সার্বিক দায়িত্ব নেয়ার আশ্বাস দেন। এ সময় পল্লবীর স্থানীয় মানুষ এবং সারা দেশে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। এই ক্ষোভকে পুঁজি করে সরকারবিরোধী শক্তি ইস্যু সৃষ্টির চেষ্টা করে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তারা সঙ্গে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগানও দেন। প্রধানমন্ত্রীকে বিদ্রুপ ও উপহাস করে ধুয়ো-ধ্বনি দেয়া হয়। রামিসার পরিবার এবং দেশবাসীকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ঘটেছে রামিসা হত্যা মামলায় ধর্ষক ও খুনি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদ- ঘোষণার মধ্য দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী সেদিন দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার এবং দোষীদের আইনানুগ শাস্তি প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি এক মাসের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বিচারিক আদালতে রায় ঘোষিত হলো ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায়। যা দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীন এবং মাইলফলক। প্রধানমন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতির পর প্রশাসন ও বিচার বিভাগ অত্যন্ত তৎপর হয়ে ওঠে। নারায়ণগঞ্জ থেকে আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয় ঘটনার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন এবং চাঞ্চল্যকর রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মাত্র ছয় কার্যদিবসে মধ্যে রায় ঘোষণাকে দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও দ্রুততম দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, উচ্চ আদালতেও এই রায় বহাল থাকবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে আসামিদের শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব হবে।
গতকাল রোববার দুপুরে আইনমন্ত্রী তার নিজ দফতরে রামিসা হত্যা মামলার রায়ের পর এ কথা বলেন। মামলার দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার বিবরণ দিয়ে বলেন, গত ১৯ মে হত্যাকা-ের পর ২৪ মের মধ্যেই পুলিশ চার্জশিট দাখিল করে। এরপর ঈদের ছুটি শুরু হয়ে যায়। ছুটি শেষে ২৪ তারিখ আসামিদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স (আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী) নিয়োগ দেয় সরকার। ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় ঘোষণা করা হলো এই রায়। সব মিলিয়ে মাত্র ছয় কার্যদিবসে এই মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে রায় ঘোষণার রেকর্ড।
অতীতে আছিয়া বা রাজনের মতো আলোচিত মামলার রায় উচ্চ আদালতে গিয়ে আটকে যাওয়ার নজির রয়েছে। রামিসা মামলার ক্ষেত্রেও তেমন কোনো আশঙ্কা রয়েছে কি-না জানতে চাইলে আইন, বিচার ও সংসদ-বিষয়কমন্ত্রী এটিকে বিচার ব্যবস্থার একটি সীমাবদ্ধতা হিসেবে স্বীকার করেন। তবে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, এ বিষয়টি যাতে উচ্চ আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সে জন্য আমরা প্রয়োজনে বিশেষভাবে লেগে থাকব।
বিচার কার্যকরের দীর্ঘসূত্রতার কারণেই দেশে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, বিচার কার্যকরের দীর্ঘসূত্রতা এ ধরনের অপরাধ ঘটার একটি কারণ হতে পারে। তবে এটিই একমাত্র কারণ বলে আমি মনে করি না।
বিচারিক আদালতে রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে জনমনে থাকা আকাক্সক্ষার বিষয়ে আইনমন্ত্রী আইনি প্রক্রিয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আইনের নির্ধারিত স্তরগুলো অতিক্রম না করে কোনো রায় কার্যকর করতে গেলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গেলে সবগুলো আইনি সব ধাপ অতিক্রম করেই আসতে হয়।
এদিকে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পরবর্তী ধাপ (পেপারবুক তৈরি এবং ডেথ রেফারেন্স শুনানি) সম্পাদনের জন্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হবেÑ মর্মে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রূহুল কুদ্দুস কাজল। আগামি রোববার থেকেই প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী এই বিশেষ বেঞ্চ গঠনের কথা বলেছেন, মর্মে জানান সরকারের প্রধান এই আইন কর্মকর্তা।
গতকাল রোববার তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ জানিয়েছিলাম। এ সময় সিনিয়র আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী ও অ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দিন দোলন আমার বক্তব্য সমর্থন করেন। তখন প্রধান বিচারপতি বিশেষ বেঞ্চ গঠনের আশ্বাস দিয়েছেন।
মানুষের শঙ্কা ও প্রত্যাশা : প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত রায় ঘোষিত হওয়ায় প্রশংসায় ভাসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি মানুষের প্রত্যাশাকেও বাড়িয়ে দিয়েছে। রামিসার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ দেশের মানুষ মনে করছেন রায় কার্যকরের পরবর্তী ধাপগুলোও দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পাদিত হবে। কারণ, রায় ঘোষিত হলেও মৃত্যুদ- কার্যকরের পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়াগুলোকে সম্পাদন প্রশ্নে মানুষের রয়েছে হতাশাব্যঞ্জক অভিজ্ঞতা। অতীতের বহু চাঞ্চল্যকর মামলা কার্যকরে হাইকোর্ট বিভাগে ডেথ রেফারেন্স এবং আপিল পর্যায়ে এসে স্তিমিত হয়ে পড়ে। পেপারবুক তৈরির নামে বছরের পর বছর পড়ে থাকছে হাইকোর্ট বিভাগে। বিচারিক আদালতের রায় হাইকোর্ট বহাল থাকলেও আপিলে গিয়ে ঝুলে থাকছে অনন্তকালের জন্য। এ রকম দৃষ্টান্ত রয়েছে ভূরিভূরি।
মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলা, সিলেটের শিশু রাজন ও খুলনার রকিব হত্যা মামলাসহ এক হাজারের বেশি চাঞ্চল্যকর মামলা হাইকোর্টে (ডেথ রেফারেন্স) শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
বিচারিক আদালতে (নিম্ন আদালত) আসামিদের মৃত্যুদণ্ড হয় বটে। কিন্তু এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রাথমিক রায়। এ রায় কার্যকর করতে হলে উচ্চ আদালতে আইনি দীর্ঘসূত্রতা এবং পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত) তৈরিতে রয়েছে ধীরগতি। এসব মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি থমকে গেছে। বিচারিক আদালত কোনো অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দিলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী সেটি কার্যকরে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এটিই ‘ডেথ রেফারেন্স’। ডেথ রেফারেন্স প্রক্রিয়ায় এসে ধমকে গেছে ২০১৯ সালে সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার রায়। সাত বছর ধরে এটি পড়ে আছে হাইকোর্টে।
২০১৫ সালে সিলেটে শিশু রাজন এবং খুলনায় শিশু রাকিবকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় বিচারিক আদালত অপরাধীদের মৃত্যুদ- দেয়। এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও হাইকোর্টে থমকে আছে ডেথ রেফারেন্স শুনানি। আপিল বিভাগের সর্বশেষ ধাপ তো রয়েছেই। হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার পরও আপিল বিভাগে এসে শুনানির জন্য আটকে আছে নারায়ণগঞ্জ চাঞ্চল্যকর সেভের মার্ডার মামলা, দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ হত্যা মামলা, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা। এর মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগ বহাল রাখার পর আপিল বিভাগে সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে মেজর সিনহা এবং আছিয়া হত্যা মামলা। এ মামলাগুলো নিষ্পত্তি না করে কীভাবে রামিসা হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দণ্ড কার্যকর করা হবে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে এটি। এখন মানুষের জিজ্ঞাসা-শুধু বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণার মধ্য দিয়েই ‘অপরাধী শাস্তি পেয়েছে’ মর্মে তুষ্টি লাভের কারণ নেই। রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির রায় কবে কার্যকর হবে, সেটি বরং দেখার বিষয়। ঘটনার চাঞ্চল্য দিয়ে বিচার চলে না। অপরাধ কতটা রোমহর্ষকÑ সেটি ধারণায় নিয়ে আপিল বিভাগে মামলা অগ্রাধিকার পায় না; বরং আালোচিত-অনালোচিত সব মামলাই আপিল বিভাগে সমান গুরুত্বপূর্ণ। জনতুষ্টিমূলক কথাবার্তার চেয়ে বাস্তবতার নিরিখে প্রতিশ্রুতি প্রদান এবং সেটি বাস্তবায়নই সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা।