Image description

সরকারের নির্দেশে স্বল্প আয়ের মানুষের হাতে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য তুলে দিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। নিজস্ব তহবিল না থাকায় ব্যাংকঋণ নিয়ে পণ্য কিনে প্রতিষ্ঠানটি স্বল্পমূল্যে নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনা করে। এতে কম দামে পণ্য বিক্রির ভর্তুকির পাশাপাশি ভর্তুকির একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে ব্যাংকঋণের সুদ পরিশোধে। চড়া সুদে ব্যাংকঋণ এবং ভর্তুকিমূল্যে পণ্য বিক্রির ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টিসিবির লোকসান প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে সরকার প্রতিষ্ঠানটির ভর্তুকি ও লোকসান কমানোর নির্দেশ দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি টিসিবি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিলে সেটাও নাকচ করে দিয়েছে।

বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে টিসিবি। গতকাল বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে দেখা করে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছেন টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সাল আজাদ পিএসসি। এতে বলা হয়, সরকারের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটির ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম সম্প্রসারণ হয়েছে। প্রায় এক কোটি লোকের হাতে ভর্তুকিমূল্যে পণ্য তুলে দিচ্ছে টিসিবি। কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। নিজস্ব তহবিল না থাকায় উচ্চ সুদে অর্থায়ন এবং বেশি দামে পণ্য কিনে কম দামে বিক্রি করায় টিসিবির রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির বোঝা প্রতি বছর বাড়ছে।

জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান টিসিবির ভর্তুকি ও লোকসান কমাতে ভোজ্য তেল, চিনিসহ কিছু পণ্যের দাম বাড়ানো, পরিচালন ব্যয় হ্রাস করা, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পণ্য (সাবান, ডিটারজেন্ট, লবণ) বিক্রি কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা, ব্যাংকঋণের সুদের হার কমাতে সরকারের ভর্তুকির অর্থ সময়মতো ছাড় করা এবং বিভিন্ন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আরোপিত ট্যাক্স কমানোর প্রস্তাব তুলে ধরেন।

সরকারকে টিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কোনো স্থায়ী তহবিল নেই। ফলে পণ্য কেনার জন্য সংস্থাটিকে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির বিপরীতে ব্যাংক থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ সুদে এলটিআর ঋণ নিতে হয়। আবার ভর্তুকির অর্থ ছাড়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভর্তুকির একটি বড় অংশ চলে যায় ব্যাংকঋণের সুদ পরিশোধে। একদিকে ক্রয়মূল্যের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি, অন্যদিকে ঋণের উচ্চ সুদ পরিশোধের কারণে প্রতিষ্ঠানটির ভর্তুকির বোঝা ও লোকসানের চাপ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সময় অর্থ মন্ত্রণালয় সময়মতো অর্থ ছাড় করলে টিসিবির ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ ভর্তুকির অর্থ হ্রাস পাবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

টিসিবি থেকে আরও জানানো হয়, টিসিবির কার্ডধারী পরিবারের বাইরেও নিম্ন আয়ের জনসাধারণের জন্য দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেল কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এখান থেকে ভর্তুকিমূল্যে নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল, চিনি, ডালসহ অন্যান্য পণ্য কেনা যায়। এসব পণ্য সংগ্রহ, আমদানির ওপর আরোপিত ট্যাক্স পরিশোধেও টিসিবির পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। তবে নতুন ডিলারশিপ নীতিমালা করার পাশাপাশি ডিলারশিপ ব্যবস্থাপনা উন্নত করায় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ ২ হাজার ৭০০ কোটি থেকে প্রায় ২০০ কোটি কমিয়ে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ ছাড়া সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে আগামী অর্থবছরে মোট ভর্তুকি ২ হাজার ১০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলেও জানায় টিসিবি।

সূত্র জানায়, পরিচালন ব্যয় কমিয়ে ভর্তুকি কমানোর বিষয়টি সমর্থন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে টিসিবির ওপর থেকে ব্যাংকঋণে সুদের হারের চাপ কমাতে দ্রুত ভর্তুকির অর্থ ছাড়ে তাঁর মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানোসহ বিভিন্ন পর্যায়ে আরোপিত শুল্ক কমাতে এনবিআরে চিঠি পাঠাতে উদ্যোগ নেবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে লোকসান কমানো ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পণ্য বিক্রয় কার্যক্রমের প্রস্তাব নাকচ করে দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিসহ উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে দেশের মানুষ চাপে আছে। এ পরিস্থিতিতে টিসিবির পণ্যের দাম বাড়ালে স্বল্প আয়ের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করেন তিনি। তবে টিসিবির বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম সম্প্রসারণ করার বিষয়টি সরকারি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এতে ব্যবসাবাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।

এসব প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ পিএসসি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ভর্তুকি কমাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আমরা কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করেছি। এগুলো নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’