Image description

বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর ব্যাংকটিতে অস্থিরতা আরও বেড়েছে। এই নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনকারীদের আহ্বানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্ণপাত না করায় আমানতকারীরা তাদের জমাকৃত অর্থ তুলে নিতে শুরু করেছেন।

 

ইসলামী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, রোববার (৭ জুন) ব্যাংকটি থেকে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার আমানত তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। এর আগে গত সপ্তাহেও সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার আমানত উত্তোলন করেছেন গ্রাহকরা।

 

সন্ধ্যায় ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ আলতাফ হোসাইন গণমাধ্যমে দেওয়া ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘কিছু গ্রাহক আতঙ্কিত হয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরে বিভ্রান্ত হয়ে টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের উদ্দেশে একটাই কথা, আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত। তারল্য সংকট তেমন নেই।
তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পাশে রয়েছে।’

 

এদিন টানা বিক্ষোভ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের এখনো ব্যাংকে ঢুকতে না পারা চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের পদত্যাগ এবং জোর করে পদত্যাগ করানো এমডি মো. ওমর ফারুক খাঁনের পুনর্বহালের দাবিতে ব্যাংকের সামনে আন্দোলন শুরু করে গ্রাহক ফোরাম।

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী বেলা ১১টায় মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হয়। এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সতর্ক অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ, প্রস্তুত রাখা হয় জলকামান ও সাঁজোয়া যান।

এর মধ্যেই আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে যান এবং সেখানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়া খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাই তার নিয়োগ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।

ইসলামী ব্যাংক
রোববার আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে যান এবং সেখানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। ছবি: সংগৃহীত

কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক নুর নবী মানিক। তিনি বলেন, আন্দোলনের অংশ হিসেবে সোমবার (৮ জুন) ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি বা কলমবিরতি পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। দাবি আদায়ে ভবিষ্যতে আরও কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে বলেও তিনি জানান।

এর আগে গত ৪ জুন চেয়ারম্যানের পদত্যাগ কার্যকরের দাবিতে আন্দোলনে নামেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেদিন এক ঘণ্টার প্রতীকী কর্মবিরতি পালন করেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তবে ব্যাংকের পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত এমডি গণমাধ্যমকে জানান, এ ধরনের কোনো কর্মসূচি ব্যাংকের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি এবং কোথাও তা পালনও হয়নি।

তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় এক ঘণ্টার কলমবিরতি কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কোথাও সকাল ১০টা থেকে ১১টা, আবার কোথাও বেলা ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত এই কর্মসূচি পালন করেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

এরপর এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসাইনকে ফোন করে ইসলামী ব্যাংকের জামায়াত-শিবিরপন্থী কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম।

এছাড়া ইসলামী ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে কারা এই আন্দোলনে সহযোগিতা করছেন, তাদেরও খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তবে এতে আন্দোলন থামেনি। বরং রোববার বিশাল মিছিল করেছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম।

এর আগে গত ১ জুন ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ জলকামান, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে ২৪-২৫ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

সেদিন আন্দোলনের মধ্যেও ইসলামী ব্যাংক কোনো নোটিশ ছাড়াই পর্ষদ সভা করার চেষ্টা করে। স্বশরীরে পর্ষদ সভা করতে না পেরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ভার্চুয়াল সভার জন্য মৌখিক অনুমোদন নেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তবে ভারপ্রাপ্ত এমডি ও কোম্পানি সচিব অবরুদ্ধ থাকায় তাদের ছাড়াই রাত ৯টার পর চেয়ারম্যানসহ পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক অনলাইনে সভা করেন বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়। পরের দিন ইসলামী ব্যাংক থেকেও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পর্ষদ সভার কথা জানানো হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ১ জুন রাতে সাংবাদিকদের জানান, ভার্চুয়াল সভায় ইসলামী ব্যাংকের এমডি ওমর ফারুক খাঁনের দেওয়া পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন এমডি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত আলতাফ হোসাইনকে ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে।

গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি ওমর ফারুক খাঁনকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করেন চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান। এর প্রতিবাদে কর্মীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে চেয়ারম্যান জুবায়দুর রহমানও পদত্যাগ করেন। এরপর রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে চিঠি ইস্যু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপরই খুরশীদ আলমের আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সখ্য থাকার প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতের সঙ্গে তার ছবি এবং রংপুরে জেনারেল ম্যানেজার থাকাকালীন আর্থিক কেলেঙ্কারির সংবাদ ক্লিপিংস সামনে আসে। এতে তার নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক বিরোধিতা দেখা দেয়।

ঈদের ছুটির পর প্রথম কর্মদিবসে (১ জুন) খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকে ঢুকতে দেওয়া হবে না—এমন কর্মসূচি আগেই ঘোষণা করা হয়। তবে অনেক চেষ্টা করেও তিনি ব্যাংকে প্রবেশ করতে পারেননি। ব্যাংকের টানা উত্তেজনার কারণে নিজের নিরাপত্তায় খুরশীদ আলমের বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসভবনে পুলিশি পাহারা বসানো হয়।

এতসবের মধ্যেও ব্যাংকটিতে জোর করে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন খুরশীদ আলমের স্ত্রীর নামে বড় অঙ্কের ঋণখেলাপির তথ্য সামনে আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বে থাকাকালে একটি গোষ্ঠীর দেওয়া ‘গিফট’ হিসেবে এই ঋণ নেওয়া হয়েছিল বলে ব্যাংক খাতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।

এত কিছুর পরও খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল না করায় রোববার (৭ জুন) আবারও আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে গ্রাহক ফোরাম।

এসময় দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে ব্যাংকটিকে মুক্ত করতে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

তবে সন্ধ্যায় একটি সূত্র জানায়, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে উপযুক্ত একজন প্রার্থী খুঁজতে শুরু করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রার্থী খোঁজা হচ্ছে বলে জানা গেছে।