জামিনে সদ্য কারামুক্ত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সরাসরি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ছুটে গেছেন—এমন একটি দাবি সহকারে একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। দাবি করা হচ্ছে, এটি ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে কোনো শীর্ষ সারির আওয়ামী লীগ নেতার প্রথম প্রকাশ্য সফর। তবে তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং প্রচারিত ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা।
প্রেক্ষাপট ও ভাইরাল দাবি
‘বেঙ্গলি জার্নাল’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে গত ৬ জুন (২০২৬) একটি প্রতিবেদন সহকারে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। কার্ডে লেখা ছিল— “কারামুক্তির পরদিনই ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সাবেক মেয়র আইভী”। ছবিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে সাবেক মেয়র আইভীকে হাসিমুখে বিজয় সংকেত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মী ও অনুসারীদের সামনে আইভী বলেছেন, “এই ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ধ্বংস করলেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে কখনো শেষ করে দেওয়া যাবে না। ‘রিভোল্ট নামে এক এক্স অ্যাকাউন্ট ছবিটি পোস্ট করে লিখেছে, “ধন্যবাদ বিএনপি সরকারকে আওয়ামী লীগের পা চাটার জন্য। বিএনপি আইভিরে মুক্তি দিয়েছে, আর মুক্তি পেয়েই সে ৩২ নাম্বারে গিয়ে বিজয় চিহ্ন দেখাচ্ছে।’

অনুসন্ধান ও এআই শনাক্তকরণ পরীক্ষা
ছড়িয়ে পড়া ছবিটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রথমত এর ভিজ্যুয়াল এলিমেন্টগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে ছবির আলো ও ছায়ার কৃত্রিম তারতম্য এবং ডা. আইভীর হাতের আঙুলের কাঠামোতে এআই-জনিত অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া ছবির নিচের ডান পাশে গুগল জেমিনির (Gemini) লোগোর জলছাপ স্পষ্ট ছিল। মূলত জেমিনির “ন্যানো বানানা” নামক মডেল ব্যবহার করে ছবি সম্পাদনা করলে এমন জলছাপ তৈরি হয়।

ছবিটির প্রযুক্তিগত সত্যতা সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই করতে একাধিক এআই (AI) টুল ব্যবহার করা হয়। গুগলের নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ‘সিন্থ-আইডি’ (SynthID)-এর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ছবিটির সিংহভাগ গুগল এআই-এর মাধ্যমে তৈরি কিংবা সুক্ষ্মভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে। এছাড়া, এই ডিজিটাল কারসাজি আরও নিখুঁতভাবে প্রমাণ করতে এআই কনটেন্ট ডিটেক্টর ‘এআই অর নট’ (AI or Not) এবং ‘হাইভ মডারেশন’ (Hive Moderation) দিয়েও ছবিটির ডেটা বিশ্লেষণ করা হয়। উভয় ফরেনসিক টুলের চূড়ান্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ছবিটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯.৯%—যা শতভাগের কাছাকাছি।

মূল ছবির আসল উৎস
অনুসন্ধানে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর মূল ছবিটিও খুঁজে পাওয়া গেছে। মূলত এটি ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তার বিজয়ের মুহূর্তের ছবি। তৎকালীন মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২২ সালের সেই বিজয়ের দিনে আইভীর পরিহিত পোশাক, তার রঙ এবং হাতের অঙ্গভঙ্গি হুবহু নকল করে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
আইভীর প্রকৃত অবস্থান ও বর্তমান পরিস্থিতি
সাবেক মেয়র আইভীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর পরিদর্শন বা সেখানে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার কোনো খবর দেশের কোনো নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি। উল্টো গণমাধ্যম ও জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কারামুক্তির পর বাড়ি ফেরার পর তার বাসভবন ঘিরে নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। জেলা পুলিশ জানিয়েছে, তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তিনি যেন নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত না হন কিংবা তার পক্ষে কেউ উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করতে পারে, সেটি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

এছাড়া, জামিনে মুক্ত হওয়ার পর আইভীর একমাত্র আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছিল: “আমি চাই সবাইকে নিয়ে মানবিক সরকার গঠিত হোক। আমার মতো আরও অনেক নিরপরাধ মায়েরা আছেন, আশা করি সরকার তাদের প্রতিও সদয় হবে।” এর বাইরে তিনি কোনো রাজনৈতিক বা উসকানিমূলক মন্তব্য করেননি।

সামগ্রিক প্রমাণ এবং তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এটি শতভাগ প্রমাণিত যে, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর শ্রদ্ধা জানানোর দাবিটি সম্পূর্ণ বানোয়াট। ২০২২ সালের একটি পুরোনো বিজয় উদযাপনের ছবিকে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিকৃত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই রাজনৈতিক অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে।