Image description

দীর্ঘ বিরতির পর কার্যকর সংসদের সুযোগ এসেছিল এবারের নির্বাচনে। ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের সঙ্গে বিরোধী দলের তুমুল বিতর্ক ও গঠনমূলক সমালোচনা দেখতে চেয়েছিল দেশবাসী। সেই প্রত্যাশায় জামায়াতে ইসলামী আশা জাগাতে পারেনি বলে রয়েছে সমালোচনা। রাজপথের লড়াইয়ের তুলনায় বিভিন্ন অধিবেশনে দলটির প্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

তবে সেই সমালোচনা বেশিদিন বয়ে বেড়াতে চায় না প্রধান বিরোধী দল। রাজপথের পাশাপাশি জামায়াত সংসদ কাঁপাতেও নানা কৌশলে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছে কয়েকটি সূত্র।

দলটির মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, চলতি বাজেট অধিবেশন থেকেই সংসদে আরও জোরালো ও সংগঠিত ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে জামায়াত। সংসদ সদস্যদের আইন প্রণয়ন, বাজেট বিশ্লেষণ, সংসদীয় কার্যপ্রণালি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ বিষয়ে দেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রশিক্ষণ। দক্ষতা বাড়াতে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, সাবেক আমলা ও নীতি বিশ্লেষকদের থেকে নেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান ও কৌশল।

‘নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অনেকেই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদে প্রতিনিধিত্বে কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতাও নেই। ফলে সংসদীয় কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়াতে নেওয়া হয়েছে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। এসব কর্মশালায় প্রশ্ন উত্থাপন, সম্পূরক প্রশ্ন, মুলতবি প্রস্তাব, মনোযোগ আকর্ষণ নোটিস এবং বিভিন্ন সংসদীয় কৌশল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে’— গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করে অনভিজ্ঞতার কথা স্বীকার করলেন জামায়াতের একাধিক নেতা।

সরকারের বিভিন্ন নীতি, বাজেট ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে তথ্যভিত্তিক সমালোচনা করতে পারলে সংসদে বিরোধী দলের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা দলের নীতিনির্ধারকদের।

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরুর আগে গত ৫ ও ৬ জুন রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘বাজেট, অর্থনীতি ও জননীতি: সংসদ সদস্যদের সক্ষমতা উন্নয়ন’ শীর্ষক কর্মশালা আয়োজন করে জামায়াত। অংশ নেন জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলটির ৭৭ এমপি।

ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন

শুধু সংসদেই নয়, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য ছায়া মন্ত্রিসভাও গঠন করেছে জামায়াত। দলটির শীর্ষ নেতাদের দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন খাতের দায়িত্ব। তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রকল্প বাস্তবায়ন, ব্যয় ও জনস্বার্থের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে নিয়মিত বানাবেন মূল্যায়ন প্রতিবেদন।

ছায়া মন্ত্রিসভার মধ্য দিয়ে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে সরকারকে। একই সঙ্গে করা হবে পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি। কোন মন্ত্রণালয় কী অনিয়ম বা কী দুর্নীতি করছে, তাও তুলে ধরা হবে— উদ্দেশ্য স্পষ্ট করলেন জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতা।

কার্যকর বিরোধী দলের অন্যতম দায়িত্ব সরকারের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা উল্লেখ করে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছি। তবে তা এখনই প্রকাশ করা হবে না। এই মন্ত্রিসভায় সংসদ সদস্য ছাড়াও রাখা হয়েছে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ও বিশেষজ্ঞদের। মূলত সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে এই পদক্ষেপ।’

শিক্ষার্থীদেরও রাজনীতি সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছে জামায়াত। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির অংশ হিসেবে ছাত্রদের নিয়েও নতুন পরিকল্পনা করছে দলটি। সূত্র বলছে, তরুণ নেতৃত্বকে নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচিত করতে ‘ছাত্র মন্ত্রিসভা’ ধরনের একটি কাঠামো গঠনের বিষয়েও চলছে আলোচনা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে নীতি গবেষণা, জননীতি বিশ্লেষণ এবং নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

রাজপথেও সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা

সংসদের পাশাপাশি রাজপথের রাজনীতিতেও আরও সক্রিয় হতে চায় জামায়াত। দলটির নেতারা মনে করছেন, শুধু সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতি দিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করা সম্ভব নয় বিরোধী দলের দায়িত্ব। এজন্য বাড়ানো হবে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি। বিশেষ করে জুলাই মাস কেন্দ্র করে বড় ধরনের কর্মসূচির প্রস্তুতি চলছে। ‘জুলাই সনদ’ ও গণভোটের ফল বাস্তবায়নের দাবিতে রাজধানীতে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে বড় সমাবেশ। পাশাপাশি জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ এবং প্রচার কর্মসূচি পালনের চিন্তা করছে দলটি।

জুলাই সনদ ও গণভোটের ফল নিয়ে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদের।

‘শক্তিশালী বিরোধী দল ও জনগণের কণ্ঠস্বর হতে সব ধরনের প্রস্তুতি, কর্মসূচি ও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে জামায়াত। জনগণ ও অভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রতারণা করছে সরকার। সেই জায়গা থেকে আমরা জনগণের হয়েই সংসদ এবং সংসদের বাইরে সমানতালে ভূমিকা রাখব। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেই কাজের ফল দেখা যাবে’— আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরলেন তিনি।