দেশের স্বাস্থ্য খাতের চরম অব্যবস্থাপনা দূরীকরণ, নজিরবিহীন বাজেট বৈষম্যের অবসান এবং ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসনের অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই খাতে মোট জাতীয় বাজেটের অন্তত ৮ শতাংশের বেশি বরাদ্দ রাখার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
রোববার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে এই আহবান জানানো হয়। জামায়াতের মেডিকেল শাখার উদ্যোগে ‘স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনা ও ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসনের অপচেষ্টার প্রতিবাদে’ এই মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।
এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটে অন্তত ৮ শতাংশের বেশি বরাদ্দ রাখার আহ্বান জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, স্বাস্থ্য খাতের লাগামহীন দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়। এছাড়া সরকারি হাসপাতালের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ফার্মেসিতে চলে যাওয়ায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ প্রাপ্য ওষুধ থেকে বঞ্চিত হয়।
তিনি আরো অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় চিকিৎসকদের বদলি করা হয় এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্য চলে আসছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এসব অনিয়ম দূর করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে সেলিম উদ্দিন বলেন, জামায়াতে ইসলামীর লড়াই দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করে সেলিম উদ্দিন বলেন, আপনার মূল দায়িত্ব বাদ দিয়ে স্বাস্থ্য খাতে রাজনীতি করবেন, তা হতে দেওয়া যাবে না। যোগ্য ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের অবমূল্যায়ন করে দুর্নীতিবাজ ও অযোগ্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে, যা স্পষ্টত ফ্যাসিবাদের নীতি। এই ফ্যাসিবাদী নীতি নিয়ে আপনারা স্বাস্থ্য খাত চালাতে পারবেন না। শহীদদের রক্ত আর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসনের অপচেষ্টা বরদাশত করা হবে না।
তিনি বর্তমান প্রশাসনকে হুঁশিয়ার করে বলেন, যারা অতীতে জনগণের ওপর জুলুম করেছে এবং স্বাস্থ্য খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে, তাদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। নতুন বাংলাদেশে জনগণ একটি বৈষম্যহীন ও স্বচ্ছ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রত্যাশা করে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মহানগর উত্তর মেডিকেল বিভাগের আমির ডা. এস এম খালিদুজ্জামান দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও বাজেট বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে মোট বাজেটের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। অথচ আমাদের দেশে এই সংবেদনশীল খাতে বরাদ্দ মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ, যা জিডিপির তুলনায় ১ শতাংশেরও নিচে। একটি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী জাতি গঠন করতে হলে সবার আগে মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা প্রয়োজন। দেশে চলমান অস্থিরতা ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে মুক্তি পেতে স্বাস্থ্য খাতকে সবার আগে সঠিক ও দুর্নীতিমুক্ত পথে ফিরিয়ে আনা জরুরি।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অন্যান্য চিকিৎসক ও নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলের অনিয়ম ও দুর্নীতির ধারা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। চিকিৎসকদের এককভাবে দায়ী না করে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সরকারের ভূমিকা জোরদার করতে হবে। একই সাথে স্বাস্থ্য খাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান তারা।
মানববন্ধনে বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসক ও জামায়াত নেতারা উপস্থিত ছিলেন।